বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার চিলা ইউনিয়নের জয়মনিরঘোল গ্রামে গড়ে উঠেছে ‘সুন্দরবন জাদুঘর ও তথ্য কেন্দ্র’ (Sundarban Museum and Information Centre)। এটি বাংলাদেশের প্রথম বিশেষায়িত ও পরিকল্পিত ম্যানগ্রোভ তথ্য কেন্দ্র। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (IUCN) ‘ইন্টিগ্রেটেড টাইগার হ্যাবিট্যাট কনজারভেশন প্রোগ্রাম’ (ITHCP)-এর অংশ হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

জার্মান কো-অপারেশন (KfW-German Cooperation) এবং বাংলাদেশ বন বিভাগ যৌথভাবে এই নির্মাণকাজে অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তা দিয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চলে দীর্ঘ দুই দশক ধরে বাঘ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নিয়োজিত বেসরকারি সংস্থা ‘ওয়াইল্ডটিম’ (WildTeam) এটি পরিচালনা করছে। বনের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, লোকগাথা এবং ইতিহাস এক ছাদের নিচে তুলে ধরার লক্ষ্যে কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লটজ আনুষ্ঠানিকভাবে এটি উদ্বোধন করেন।

ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস সুন্দরবন অঞ্চল ভ্রমণ ও এই জাদুঘর পরিদর্শনের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক। পর্যটকেরা সকালে মোংলা থেকে ট্রলার বা বোটে করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র ঘুরে, দুপুরের পর জয়মনিরঘোল মিউজিয়ামে আসতে পারেন। একই সাথে কাছাকাছি অবস্থিত হারবাড়িয়া ইকো ট্যুরিজম সেন্টারও ঘুরে দেখা সম্ভব।

প্রধান আকর্ষণ ও গ্যালারির প্রদর্শনী

জাদুঘরের ভেতরটিকে মূলত চারটি প্রধান থিমেটিক জোন ও বিভিন্ন শিক্ষণীয় উপাদানে ভাগ করা হয়েছে:

  • মৎস্য বৈচিত্র্য গ্যালারি (Ichthyology Zone): সুন্দরবনের নদী ও খালের ৩৮০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ২১০ প্রজাতির মাছের ফরমালিন-সংরক্ষিত নমুনা এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে বনের লবণাক্ত ও মিষ্টি পানির ইকোসিস্টেমের পার্থক্য সহজে বোঝা যায়।
  • বাঘ ও স্তন্যপায়ী জোন: রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ট্যাক্সিডার্মি, কঙ্কালের গঠন, বাঘের পায়ের ছাপের ছাঁচ এবং মানব-বাঘ দ্বন্দ্ব প্রশমনের বৈজ্ঞানিক উপায়গুলো এখানে সাজানো রয়েছে।
  • ম্যানগ্রোভ ও উদ্ভিদ জোন: সুন্দরী, গেওয়া, গরান ও গোলপাতার মতো উদ্ভিদের শ্বাসমূলের (Pneumatophores) লাইভ ও কৃত্রিম মডেল এবং বনের লবণাক্ততা বৃদ্ধির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সংক্রান্ত তথ্য স্থান পেয়েছে। এছাড়া বনের পরিচয় বহনকারী ২৪ প্রজাতির ‘ট্রু ম্যানগ্রোভ’ ও ৯ প্রজাতির দুর্লভ অর্কিড এখানে রয়েছে।
  • লোকগাথা ও সমাজ-সংস্কৃতি: সুন্দরবনের রক্ষক বলে খ্যাত ‘বনবিবি’ ও ‘গাজী পীর’-এর লোকগাথা এবং সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল বাওয়ালী ও মৌয়ালীদের ঐতিহ্যবাহী মধু সংগ্রহের সরঞ্জাম, ত্রিমাত্রিক (3D) মানচিত্র ও মিনিয়েচার মডেল প্রদর্শিত হচ্ছে।
  • কিডস জোন: শিশুদের জন্য তৈরি এই জোনে ছবি আঁকার সুব্যবস্থা রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সুন্দরবন কীভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য একটি প্রাকৃতিক ‘ঢাল’ হিসেবে কাজ করে, তাও এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

তরুণদের সম্পৃক্ততা ও সামাজিক কার্যক্রম

জাদুঘরটি কেবল পর্যটন প্রদর্শনী কেন্দ্র নয়, বরং একটি সক্রিয় ফিল্ড স্টেশন হিসেবেও ব্যবহৃত হয়:

  • আর্থ-স্কাউটস (EarthScouts): স্থানীয় স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এখানে নিয়মিত পরিবেশ কর্মশালা আয়োজন করা হয়, যার উদ্দেশ্য উপকূলীয় তরুণদের বন সুরক্ষায় সচেতন ও সক্রিয় করা।
  • ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম (VTRT): সুন্দরবনের বাঘ লোকালয়ে চলে এলে কীভাবে তাদের অক্ষত অবস্থায় বনে ফেরত পাঠানো যায়, তার জন্য নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবক বা ‘বাঘ বন্ধুদের’ দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ এই কেন্দ্র থেকেই পরিচালনা করা হয়।

কীভাবে যাবেন

বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলার চিলা ইউনিয়নের জয়মনিরঘোল গ্রামে, শেলা নদীর তীরে এবং সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের সীমানায় জাদুঘরটি অবস্থিত।

  • সড়ক ও রেলপথ: ঢাকা থেকে সরাসরি মোংলাগামী বাসে আসা যায়। এছাড়া ট্রেনে খুলনা পৌঁছে সেখান থেকে বাস বা লোকাল যানবাহনে মোংলা ফেরিঘাট বা বাসস্ট্যান্ডে আসা সম্ভব।
  • সড়কপথে জয়মনিরঘোল: মোংলা ফেরিঘাট বা বাসস্ট্যান্ড থেকে স্থানীয় অটো রিকশা, সিএনজি বা মোটরসাইকেল নিয়ে চিলা ইউনিয়ন হয়ে জয়মনিরঘোল গ্রামে পৌঁছানো যায়।
  • বিকল্প নদীপথ: মোংলা নদী বন্দর থেকে ট্রলার বা ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করে পশুর ও শেলা নদী হয়ে সরাসরি জয়মনিরঘোল যাওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন ও খাবেন

কোথায় থাকবেন: মোংলা বন্দর ও তার আশপাশে থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের ‘পর্যটন মোটেল পশুর’-এ মানসম্মত ও নিরাপদ পরিবেশে থাকা যায়। এছাড়া মোংলা পৌর শহরে সাশ্রয়ী আবাসিক হোটেল এবং চিলা এলাকার আশপাশে কিছু ইকো কটেজ বা স্থানীয় রিসোর্ট রয়েছে।

কোথায় খাবেন: মোংলা বাজার ও ফেরিঘাট এলাকার রেস্তোরাঁগুলোতে দেশীয় খাবার পাওয়া যায়। এছাড়া জয়মনিরঘোল ও নদীর আশপাশের দোকানে স্থানীয় নদী ও সাগরের বাগদা, গলদা চিংড়ি এবং বিভিন্ন তাজা মাছের স্বাদ নেওয়া যায়।

ভ্রমণ সংক্রান্ত যে কোন তথ্য ও আপডেট জানতে ফলো করুন আমাদের ফেসবুক পেইজ এবং জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

শেয়ার করুন সবার সাথে

দৃষ্টি আকর্ষণ: যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের দেশের সম্পদ। প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন। অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল নাও থাকতে পারে। অনুগ্রহ করে আপনি কোথাও ভ্রমণে যাওয়ার পূর্বে বর্তমান তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে নিয়ে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এইসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই বাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।
ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।