চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (CVASU) ক্যাম্পাসের ভেতরে ইউসুফ চৌধুরী ভবনের নিচতলায় প্রায় ৩ হাজার বর্গফুট জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে দেশের প্রথম ও একমাত্র অ্যানাটমি জাদুঘর (Anatomy Museum)। পোশাকি নাম অ্যানাটমি মিউজিয়াম হলেও স্থানীয়দের কাছে এবং ভ্রমণপিয়াসী মানুষের কাছে এটি পরিচিত এক বিস্ময়কর কঙ্কালপুরি নামে। চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র খুলশীর মনোরম পরিবেশের মাঝে অবস্থিত এই জাদুঘরের নীরবতার ভেতরে লুকিয়ে আছে হাজারো প্রাণের গল্প যে প্রাণগুলো একসময় চষে বেড়াত বন-জঙ্গল, সমুদ্রের নীচে ও মুক্ত আকাশে।
কাচের দরজা পেরিয়ে নির্দিষ্ট খোপে জুতো রেখে ভেতরে পা রাখলেই চোখ আটকে যাবে লাল গালিচায়। প্রবেশ করতেই বিশাল উঁচু গলার একটি জিরাফের পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল আপনার নজর কাড়বে। এছাড়া চারিপাশে হাতি, উট, বাঘ ও কুমিরসহ ছোট-বড় অসংখ্য প্রাণীর কঙ্কাল সাজানো রয়েছে। কাচের বয়ামে সংরক্ষিত আছে হাজারো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও ট্যাক্সিডার্মি বা স্ট্যাফড অবয়ব। বইয়ের পাতায় পড়ে আসা প্রাণীবিজ্ঞানের জটিল তত্ত্বগুলো যেখানে জীবন্ত হয়ে ওঠে, সেখানে এক রোমাঞ্চকর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পেতে প্রতিদিন ছুটে আসেন শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ পর্যটকেরা।
অ্যানাটমি জাদুঘরের মূল আকর্ষণ ও সংগ্রহ
জাদুঘরে পা রাখার পর প্রথম দর্শনেই আপনার নজর কাড়বে বিশাল আকারের জিরাফের পূর্ণাঙ্গ কঙ্কালটি। ২০১৯ সালে জাতীয় চিড়িয়াখানায় মারা যাওয়া একটি জিরাফের দেহাবশেষ মাটি থেকে তুলে প্রায় দেড় বছর ধরে রাসায়নিক প্রক্রিয়াকরণ এবং হাড় জোড়া দেওয়ার পর এই অবয়ব তৈরি করা হয়। অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বজুড়ে এটি মাত্র ৩য় কোনো জিরাফের সংরক্ষিত কঙ্কাল।
- বিশাল প্রাণীদের কঙ্কাল: কক্সবাজারের চকরিয়া সাফারি পার্কের দীর্ঘদেহী হাতি, ঢাকা চিড়িয়াখানার উট, ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে আনা বিশাল কুমির এবং সীতাকুণ্ড ইকোপার্কের ১৩ ফুট লম্বা অজগর সাপের কঙ্কাল সাজানো রয়েছে কাচের বাক্সে। এর পাশাপাশি বাঘ, সিংহ, হরিণ, ঘোড়া ও মানুষের কঙ্কালও সংরক্ষিত আছে এবং ২,০০০টিরও বেশি বিভিন্ন প্রকারের হাড় সংরক্ষিত আছে।
- ট্যাক্সিডার্মি ও স্ট্যাফড অবয়ব: মিসরের প্রাচীন মমি তৈরির পদ্ধতি থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে বিশেষ রাসায়নিক, তুলা, রড ও তারের ফ্রেম ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে প্রায় ৩০টি স্ট্যাফড প্রাণী। হাঁ করে শিকারের জন্য উদ্যত বিশাল হাঙর, বনবিড়াল, হনুমান, রাজহাঁস, পেঁচা, গোখরা সাপসহ নানা পশুপাখি দেখলে মনে হবে তারা এখনও জীবন্ত!
- রাসায়নিকভাবে সংরক্ষিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ: প্রায় ৫০০টি কাচের জারে ফরমালিনে সংরক্ষিত রয়েছে তিমি মাছের অঙ্গ, মানুষের হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, চোখ, ছাগল ও খরগোশের ভ্রূণ। এছাড়া পর্যবেক্ষণের সুবিধার্থে রয়েছে ৭৫টি প্রাণীর বিশেষ মডেল। এমনকি এখানে অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিনেশন প্রযুক্তিতে সংরক্ষিত নমুনাসহ প্রায় ৩,০০০ শিক্ষামূলক স্লাইড রয়েছে।
- মৎস্য জাদুঘর (বোনাস আকর্ষণ): একই ক্যাম্পাসের প্রশাসনিক ভবনে রয়েছে দেশের প্রথম ফিশারিজ মিউজিয়াম। এখানে প্রায় ৩৫০ প্রজাতির দেশীয় স্বাদু পানি ও সামুদ্রিক মাছ (যেমন- হাতুড়ি হাঙর, শাপলাপাতা মাছ, মহাশোল) কাচের বয়ামে সাজানো রয়েছে। সঙ্গে আছে ৬৭০ ঘনফুটের বিশাল এক অ্যাকুয়ারিয়াম।
এডুট্যুরিজম ও ব্যতিক্রমী পর্যটন
সাধারণত ভ্রমণ বলতে আমরা সমুদ্র, পাহাড় কিংবা ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদ বুঝি। কিন্তু পড়াশোনা ও ভ্রমণ যখন একসাথে মিলে যায়, তখন তা রূপ নেয় এডুট্যুরিজম (Edutourism) এ । সিভাসুর এই অ্যানাটমি ও মৎস্য জাদুঘর দেশের এডুট্যুরিজমের ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
প্রতিটি নমুনার পাশে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই স্পষ্ট নাম ও পরিচিতি লেখা আছে। ইংরেজি বিবরণীগুলোতে প্রাণীর বৈজ্ঞানিক নাম এবং অস্থি কাঠামোর বিস্তারিত বিবরন দেওয়া আছে। ফলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, গবেষক কিংবা কৌতূহলী শিশু-কিশোরদের জন্য এটি শুধু ভ্রমণের জায়গা নয়, বরং প্রকৃতির রহস্য বোঝার এক অদ্ভুত মুক্ত পাঠশালা। মৃত শরীরের কাঠামোর মধ্য দিয়েই ভবিষ্যৎ ভেটেরিনারি চিকিৎসকেরা এখানে শিখে নিচ্ছেন জীবনের মূল ভাষা।
প্রবেশমূল্য ও সময়সূচী
অ্যানাটমি মিউজিয়ামে প্রবেশের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো প্রবেশ ফি বা টিকিটের ব্যবস্থা রাখেনি ফলে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পরিদর্শন করা যায়।
- সময়সূচী: প্রতি সপ্তাহের রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৯:০০ টা থেকে বিকেল ৫:০০ টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা থাকে।
- সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটি: শুক্র ও শনিবার এবং সকল সরকারি ছুটির দিনে জাদুঘরটি পুরোপুরি বন্ধ থাকে।
জাদুঘরটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত। তাই প্রবেশের সময় মূল গেটে নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে প্রবেশের সঠিক কারণ বলে প্রবেশ করুন। শিক্ষার্থীরা যেন নির্বিঘ্নে তাদের ল্যাব ও ক্লাস সম্পন্ন করতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রেখে শান্ত পরিবেশ বজায় রাখা দর্শনার্থীদের দায়িত্ব।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে আপনি সড়ক, রেল বা আকাশপথে খুব সহজেই বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পৌঁছে যেতে পারেন।
আরও পড়ুনঃ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার উপায়
চট্টগ্রাম শহরের যেকোনো স্থান থেকে সিএনজি অটোরিকশা বা লোকাল বাসে করে সহজেই খুলশী এলাকায় অবস্থিত সিভাসু (CVASU) ক্যাম্পাসে যেতে পারবেন। পাহাড়তলী ফয়’স লেকগামী পথেই এটি অবস্থিত।
কোথায় খাবেন
বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশেই রয়েছে আধুনিক ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও ফাস্টফুডের দোকান। এছারা ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রামের মেজবানি মাংস ও ভাত খেতে চাইলে নিকটস্থ জিইসি মোড় কিংবা দুই নম্বর গেট এলাকার বিখ্যাত মেজবান হোটেলগুলোতে চলে যেতে পারেন।
কাছাকাছি দর্শনীয় স্থান
অ্যানাটমি মিউজিয়াম ঘুরে দেখার পর আপনার হাতে সময় থাকলে চট্টগ্রামের খুলশী ও আশেপাশের জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানগুলো ভ্রমণ করে নিতে পারেন। জাদুঘরের খুব কাছাকাছি দূরত্বেই রয়েছে ফয়েজ লেক, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা, বায়েজিদ বোস্তামীর দরগাহ ও ওয়ার সিমেট্রি।
ভ্রমণ সংক্রান্ত যে কোন তথ্য ও আপডেট জানতে ফলো করুন আমাদের ফেসবুক পেইজ এবং জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।
