ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং সম্প্রীতির অপূর্ব সমন্বয়ে সমৃদ্ধ সিলেট বিভাগ। সিলেটের রয়েছে অনিন্দ্য সব দর্শনীয় স্থান ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র। তাই প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসেন সিলেটের রুপে বিমোহিত হতে। সিলেটের দর্শনীয় স্থান গুলো নিয়ে আমাদের এই দ্বিতীয় পর্বে আজ আছে আরও ১৫টি স্থানের তথ্য। প্রথম পর্বের ১৫টি জায়গা সম্পর্কে জানতে পড়ুন  সিলেটের দর্শনীয় স্থান পর্ব (১)

১৬। হামহাম জলপ্রপাত

হামহাম ঝর্ণা সিলেট
Photo Credit: Asikul Islam Himel

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গভীরে ২০১০ সালের শেষের দিকে পর্যটন গাইড শ্যামল দেববর্মাকে সাথে একদল পর্যটক এই অনিন্দ্য সুন্দর হামহাম জলপ্রপাতটি (Hum Hum Waterfall) আবিষ্কার করেন। স্থানীয়দের কাছে ঝর্ণা চিতা ঝর্ণা হিসাবে পরিচিত এই জলপ্রপাতটি প্রায় ১৪০ ফিট উঁচু। হামহামের বুনো সৌন্দর্য দেখার জন্যে বর্ষাকালে অনেক কষ্ট স্বীকার করে প্রচুর পর্যটক এখানে ছুটে আসেন।

১৭। বিছানাকান্দি

বিছানাকান্দি সিলেট


সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত বিছনাকান্দি (Bisnakandi) হচ্ছে একটি পাথর কোয়ারী। পর্যটকদের কাছে বিছানাকান্দির মূল আকর্ষন হচ্ছে পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলা স্বচ্ছ জলধারা আর পাহাড়ে পাহাড়ে শুভ্র মেঘের উড়াউড়ি। এ যেন পাহাড়, নদী, ঝর্ণা আর পাথর মিলিয়ে প্রাকৃতিক মায়াজাল বিছিয়ে রেখেছে বিছানাকান্দি।

১৮। রাতারগুল

রাতারগুল জলাবন সিলেট
Photo Credit: Mission Mozumder

রাতারগুল বাংলাদেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট (Ratargul Swamp Forest)। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত রাতারগুল বনটি প্রায় ৩০,৩২৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। রাতারগুল জলাবন বছরে চার থেকে পাঁচ মাস পানির নিচে তলিয়ে থাকা। তখন জলে ডুবে থাকা বনের গাছগুলো দেখতে সমগ্র বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পর্যটকরা এসে ভিড় জমায়। এছাড়াও শীতকালে এখানকার জলাশয়ে বসে হাজারো অতিথি পাখির মেলা।

১৯। সাতছড়ি অভয়ারণ্য

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান সিলেট


২০০৫ সালে প্রায় ২৪৩ হেক্টর জায়গা নিয়ে সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় রঘুনন্দন পাহাড়ে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান (Satchari National Park) প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে উঠা সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে অবস্থিত সাতটি পাহাড়ি ছড়া বা ঝর্ণা থেকে এই স্থানের নামকরণ করা হয় সাতছড়ি। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে রয়েছে প্রায় ১৪৫ প্রজাতির বৃক্ষ, ৪৮ প্রজাতির বিভিন্ন প্রাণী এবং ১৪৯ প্রজাতির পাখি রয়েছে।

২০। ইস্পাহানী মির্জাপুর চা বাগান

ইস্পাহানি মির্জাপুর চা বাগান সিলেট


ইস্পাহানি বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো শিল্প ও উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান। ইস্পাহানি গ্রুপের বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক বিনিয়োগ থাকলেও চা ব্যবসায়ের জন্যে ইস্পাহানি পরিবারের সুখ্যাতি আজ বিশ্বব্যাপী। ইস্পাহানি গ্রুপের সাজানো গুছানো চা বাগান (Ispahani Mirzapore Tea Garden) দেখতে তাই ছুটে আসেন অনেক ভ্রমণ প্রিয় মানুষ।

২১। বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট

বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট সিলেট
Photo Credit: Moheen Reeyad

সিলেটের শ্রীমঙ্গলে রয়েছে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (Bangladesh Tea Research Institute) এর প্রধান কার্যালয়। ১৯৫৭ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত এই ইনস্টিটিউট বৈজ্ঞানিক গবেষনার মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীলতা ও গুনগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া চা শিল্পের উন্নয়নে বিজ্ঞান ভিত্তিক পরামর্শ ও সহায়তা করে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট।

২২। নীল কন্ঠ কেবিন (৭ রংঙের চা)

সাত রংঙের চা শ্রীমঙ্গল


সাত রং চা খ্যাত জনপ্রিয় এই উষ্ণ পানীয়ের স্বাদ নিতে সারা দেশ থেকে চা প্রেমীরা ছুটে আসেন নীল কন্ঠ কেবিনে (Nilkantha Tea Cabin)। সাত স্তর বিশিষ্ট এই চায়ের প্রতিটি স্তরের স্বাদ ও বর্ণ আলাদা আলাদা। সিলেটের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত নীল কন্ঠ কেবিনের সাত রঙের চায়ের উদ্ভাবক হচ্ছেন রমেশ রাম গৌড়।

২৩। আলী আমজাদের ঘড়ি

আলী আমজাদের ঘড়ি সিলেট
Photo Credit: Abdullah Al Amran

সিলেট শহরের সুরমা নদীর তীরে চাঁদনীঘাটে ক্বীন ব্রীজের নিকট আলী আমজাদের ঘড়িটি (Ali Amjad’s Clock) অবস্থিত। ১৮৭৪ সালে নবাব আলী আহমেদ খান ভারতের চাঁদনীচকের অনুকরণে এই ঘড়িটি স্থাপনের পরিকল্পনা করেন। পরবর্তীতে শাহজাদি জাহানারা নামক জনহিতৈষী মহিলা এই ঘড়িটি স্থাপনের জন্য অর্থের যোগান দেন। নবাব আলী আহমেদ তাঁর পুত্র নবাব আলী আমজাদ খানের নামানুসারে ঘড়িটির নামকরন করা হয়।

২৪। শাহী ঈদগাহ

শাহী ঈদগাহ সিলেট
Photo Credit: Sabbir Haider

শাহী ঈদগাহ (Shahi Eidgah) সিলেট সার্কিট হাউজ হতে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব সতেরোশ শতকে এই শাহী ঈদগাহটি নির্মাণ করেন। কেল্লার অনুরূপ নির্মিত এই শাহী ঈদগাহে একসাথে প্রায় এক লাখ মানুষ নামায আদায় করতে পারেন। ২২টি সিঁড়ির ধাপ অতিক্রম করে নিপুণ কারুকার্যখচিত ঈদগাহের মূল ভূখণ্ডটিতে যাওয়া যায়। ১৫ গম্বুজ বিশিষ্ট ঈদগাহের সীমানা প্রাচীরের চারদিকে সর্বমোট ১০ টি গেইট রয়েছে। ঈদগাহের সামনে রয়েছে বিশাল একটি পুকুর।

২৫। বঙ্গবীর ওসমানী শিশু পার্ক

বঙ্গবীর ওসমানী শিশু পার্ক সিলেট
Photo Credit: Samsul Arifin

সিলেটের প্রাণকেন্দ্র ধোপাদিঘি পাড়ে ২০০০ সালে গড়ে তোলা হয়েছে বঙ্গবীর ওসমানী শিশু পার্ক (Bongobir Osmani Shishu Uddan)। প্রায় ৮ একর আয়তনের এই পার্কে বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় রাইড পাশাপাশি রয়েছে একটি মিনি চিড়িয়াখানা। যাপিত জীবনের একটু অবসরে সিলেটবাসী ছুটে আসেন এই বঙ্গবীর ওসমানী শিশু পার্কে।

২৬। জিতু মিয়ার বাড়ি

জিতু মিয়ার বাড়ি সিলেট


সিলেটের জায়গীরদার খান বাহাদুর আবু নছর মোহাম্মদ এহিয়া ওরফে জিতু মিয়ার বাড়ি (Jitu Miah’s House) সিলেটের অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থাপনা। ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি কাজী বাজারের কাছে ১.৩৬৫ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত। চুন ও সুরকি দিয়ে নির্মিত জিতু মিয়ার বাড়িটি মোঘল আমলের মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর অনন্য এক নিদর্শন।

২৭। মণিপুরী রাজবাড়ি

মণিপুর রাজবাড়ী সিলেট

সিলেটের মির্জাজাঙ্গাল ও লামাবাজার এলাকার মাঝামাঝি অবস্থিত মণিপুরী রাজবাড়ি (Manipuri Rajbari)। ঊনবিংশ শতাব্দীতে তৎকালীন মণিপুরী রাজ্যের তিন সহোদর রাজা চৌর্জিৎ সিংহ, মার্জিত সিংহ ও গম্ভীর সিংহ এই রাজবাড়ী তৈরি করে বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে বাংলাদেশে মণিপুরী সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ মণিপুরী রাজবাড়ি এলাকায় বসবাস করেন।

২৮। মণিপুরী মিউজিয়াম

মনিপুরী মিউজিয়াম সিলেট

সিলেটের অন্যতম দর্শনীয় স্থান মণিপুরী জাদুঘরটি (Manipuri Museum) জেলা সদরের সুবিদবাজারে অবস্থিত। সম্পূর্ন বেসরকারি মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত এ জাদুঘরটি প্রায় ২০০ বছর পূর্বে থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়া মণিপুরীদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য লালন করে চলছে। মণিপুরী হস্তশিল্প, নৃত্যকলা, সাহিত্য প্রভৃতির বিভিন্ন নিদর্শন দিয়ে সজ্জিত এই জাদুঘরটি মণিপুরীদের সম্পর্কে জানার একটি অনন্য মাধ্যম।

২৯। রেমা–কালেঙ্গা অভয়ারণ্য

রেমা কালেঙ্গা অভয়ারণ্য সিলেট


সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় রেমা–কালেঙ্গা অভয়ারণ্য (Rema Kalenga Reserved Forest) অবস্থিত। সুন্দরবনের ব্যতিত রেমা–কালেঙ্গা অভয়ারণ্যই হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বনভূমি। বণ্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং উদ্ভিদবৈচিত্র্যে দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ শুকনো ও চিরহরিৎ এই বনের আয়তন ১৭৯৫.৫৪ হেক্টর।

৩০। বানিয়াচং

বানিয়াচং গ্রাম সিলেট
Photo Credit: Shuvo Sutradhar

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক দিয়ে সুপ্রাচীন বানিয়াচং (Baniachong) হচ্ছে এশিয়ার সর্ববৃহৎ গ্রাম। ঐতিহাসিকগণের মতে প্রায় ১২০০ বছর আগে এই বানিয়াচং রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়। বানিয়াচং বর্তমানে উপজেলা সদরে অধিষ্ঠীট হলেও এখানকার বাসিন্দারা একে গ্রাম বলাতেই গর্ববোধ করেন। আবার অনেকের কাছে এই গ্রামটি পল্লীরাজ এবং মহাগ্রাম নামে পরিচিত।

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।