ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং সম্প্রীতির অপূর্ব সমন্বয়ে সমৃদ্ধ সিলেট বিভাগ। সিলেটের রয়েছে অনিন্দ্য সব দর্শনীয় স্থান ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র। তাই প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসেন সিলেটের রুপে বিমোহিত হতে। চলুন জেনে নেয়া যাক সিলেটের সকল দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে। সিলেট এর দর্শনীয় স্থানের আজকের প্রথম পর্বে থাকছে ১৫টি জায়গা সম্পর্কে।

১। জাফলং (জিরো পয়েন্ট, মারি নদী, চা বাগান, খাসীয়া পল্লী, সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা):
জাফলং (Jaflong) প্রকৃতির কন্যা হিসাবে পরিচিত। পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ পানির ধারা, ঝুলন্ত ডাউকি ব্রিজ, উঁচু উঁচু পাহাড়ে সাদা মেঘের খেলা জাফলংকে করেছে অনন্য। একেক ঋতুতে জাফলং একেক রকম রুপের প্রকাশ ঘটায় যা পর্যটকদেরকে ভ্রমণের জন্য সারাবছরই আগ্রহী করে রাখে। জাফলং এর অনন্য প্রকৃতি, জিরো পয়েন্ট, মারি নদী, চা বাগান, খাসীয়া পল্লী ছাড়াও জাফলং জিরো পয়েন্ট থেকে পায়ে হাটা দুরত্বে ভারত সীমান্তে দেখা মেলে অপূর্ব সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা।

২। হযরত শাহজালাল (রঃ) এর মাজার শরীফ:
৩৬০ আউলিয়ার সিলেট নগরী পূন্যভূমি হিসাবে খ্যাত। সিলেটের মাটিতে যেসব পীর, দরবেশ শায়িত আছেন এদের মধ্যে হযরত শাহজালাল (রঃ) অন্যতম, এজন্য তাঁকে ওলিকুল শিরোমণি বলা হয়। হযরত শাহ জালাল (রঃ) সকল ধর্মের মানুষের কাছে সমাদৃত ছিলেন। তাই প্রতি বছর হযরত শাহজালাল (রঃ) মাজার (Hazrat Shahjalal (RA) Mazar Sharif) জিয়ারতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের ঢল দেখা করা যায়।

লোভাছরা, কানাইঘাট, সিলেট
ছবিঃ দুলাল খান

৩। হযরত শাহ পরাণ (রঃ) এর মাজার শরীফ:
হযরত শাহ পরাণ (রঃ) ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সুদূর মধ্যপ্রাচ্য হতে ইসলাম ধর্ম প্রচারক হিসাবে হযরত শাহ জালাল (রঃ) এর অন্যতম সঙ্গী হয়ে বাংলাদেশে আসেন। হযরত শাহ পরাণ (রঃ) এর মাজার (Hazrat Shah Paran (RA) Mazar) শরীফটি সিলেট শহরের পূর্ব দিকে খাদিম নগর নামক এলাকায় অবস্থিত। শাহ জালাল (রঃ) এবং শাহ পরাণ (রঃ) এর মাজার দুইটির মধবর্তী দূরত্ব ৮ কিলোমিটার। সিলেট বিভাগ এবং ভারতের বিভিন্ন এলাকায় মুসলিম ধর্ম বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে হযরত শাহ পরাণের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

৪। জৈন্তাপূর (পুরানো রাজবাড়ী, ডিবির হাওর):
সিলেট-তামাবিল সড়কের জৈন্তাপুর (Jaintiapur) বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় জৈন্তেশ্বরী বাড়ীর অবস্থান। জৈন্তেশ্বরী বাড়ীটি বর্তমানে অনেকের কাছে জৈন্তাপুর রাজবাড়ী হিসেবে পরিচিত হলেও এটি হচ্ছে সিন্টেং বা জৈন্তা রাজাদের দেবতার বাড়ী। প্রাচীন আমলে নির্মিত বিশাল উঁচু দেয়াল ঘেরা জৈন্তেশ্বরী বাড়িটি বহু ঘটনার নিরব সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে। জাফলং, লালাখাল এবং শ্রীপুরে বেড়াতে আসা পর্যটকরা হরহামেশাই এই ঐতিহাসিক বাড়ীটি দেখতে ছুটে আসেন।

৫। মাধব কুন্ড ও পরীকুন্ড জলপ্রপাত:
মাধবকুন্ড জলপ্রপাত (Madhabkunda Waterfall) মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলায় অবস্থিত। সরকারী উদ্যোগে এখানে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের রেস্টহাউজ ও রেস্টুরেন্ট আর সম্পূর্ন এলাকাকে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে মাধবকুন্ড ইকোপার্ক। অনিন্দ্য সুন্দর মাধবকুন্ড ঝর্ণা থেকে ১৫-২০ মিনিট হাটলে পরিকুন্ড ঝর্ণা নামে আরেকটি ঝর্ণা চোখে পড়ে।

৬। শ্রীমঙ্গল (চা বাগান, লাওয়াছরা বন, মাধব পুর লেক):
সিলেটের শ্রীমঙ্গল (Sreemangal) একটি সমৃদ্ধ উপজেলা। এখানে রয়েছে প্রায় অর্ধশত চা বাগান, লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, খাসিয়া পুঞ্জি, বাংলাদেশ চা গবেষনা ইনস্টিটিউট এবং মাধবপুর লেক। এছাড়া পর্যটনের কথা ভেবে এখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য আবাসিক হোটেল ও রেস্তোরা, এদের মধ্যে গ্রান্ড সুলতান টি রিসোর্ট এন্ড গলফ ক্লাব নামে একটি পাঁচ তারকা মানের হোটেল রয়েছে।

৭। লালাখাল:
লালাখাল (Lalakhal) বিভাগীয় সিলেট জৈন্তাপুর উপজেলায় অবস্থিত। সিলেট থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই লালাখাল নদী ভারতের চেরাপুঞ্জি পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদী, পাহাড়ি বন, চা-বাগান এবং নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজি লালাখালের ভূপ্রকৃতিকে দিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য। ভরা পূর্ণিমায় জ্যোৎস্না ধোয়া নদী কিংবা মেঘ পাহাড় আর নদীর মিতালী দেখতে আপনাকে লালাখাল ঘুরে আসতে হবে। বর্ষাকালে লালাখালের পানি খুব ঘোলা থাকে তাই নভেম্বর থেকে মার্চ অর্থাৎ শীতকাল হচ্ছে লালাখাল ভ্রমণের উপযুক্ত সময়।

লালাখাল সিলেট ভ্রমণ
ছবিঃ ইমতিয়াজ জামান

৮। তামাবিল:
সিলেট থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে সিলেট-শিলং সড়কের পাশে চমৎকার ভূ-প্রাকৃতি এবং অপূর্ব সৌন্দর্য্যে আচ্ছাদিত তামাবিল (Tamabil) বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেষা এলাকা। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ার কারণে তামাবিল থেকেই ভারতের বেশকিছু পাহাড় এবং জলপ্রপাত দেখা যায়। পাহাড়, ঝর্ণা এবং নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করতে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী ভিড় করে তামাবিলের এই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে।

৯। হাকালুকি হাওড়:
হাকালুকি হাওর ((Hakalui Haor)) সিলেট ও মৌলভীবাজারের ৫টি উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ মিঠা পানির জলাভূমি। হাকালুকি হাওর প্রায় ২৩৮ টি বিল ও ১০ টি নদীর সমন্বয়ে গঠিত এবং বর্ষাকালে এই হাওরের আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ২০ হাজার হেক্টর। মাছের জন্য প্রসিদ্ধ হাকালুকি হাওরে শীতকালে অতিথি পাখিদের আগমনে মুখরিত হয়ে উঠে। এছাড়াও এখানে প্রায় ১০০ প্রজাতির স্থানীয় পাখি দেখা মিলে। হাওরের বিস্তির্ন ভূমি, বিল নির্ভর মানুষের জীবনযাত্রা এবং অথিতি পাখির আহ্বানে ভ্রমনপিয়াসীরা হাকালুকি হাওরে ছুটে আসে।

১০। ক্বীন ব্রীজ:
ক্বীন ব্রীজ (Keane Bridge) স্থাপত্যশৈলী ও নান্দনিকতায় সিলেট নগরীর ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ হয়ে উঠেছে। সুরমা নদীর উপর বয়সের ভারে নূহ্য হয়ে পড়া ক্বীন ব্রীজ বর্তমানেও পর্যটকদের কাছে সমানভাবে আকর্ষনীয়। তাই প্রতিদিন হাজারো পর্যটক এই ব্রীজের নান্দনিকতা দেখতে আসেন। আসাম প্রদেশের গভর্ণর মাইকেল ক্বীন-এর নামানুসারে নির্মিত এই ব্রীজ ১৯৩৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়।

১১। ভোলাগঞ্জ:
সিলেট থেকে ৩৩ কিলোমিটার দূরে ভোলাগঞ্জ (Bholaganj) অবস্থিত। ভোলাগঞ্জ একসময় দেশের সর্ববৃহৎ পাথর কোয়ারী হিসাবে সুপরিচিত ছিল। পাথর কোয়ারী থেকে ২০ মিনিটের ইঞ্জিন নৌকা দূরত্বে সীমান্তের অতি নিকটবর্তী এলাকায় রয়েছে ‘বিশেষ কোয়ারী’ নামক স্থান। প্রকৃতির অপরূপ পাহাড়ী সৌরভ প্রাণভরে আহরণের জন্য এই বিশেষ কোয়ারী বেশ জনপ্রিয়।

১২। মহাপ্রভু শ্রী চৈত্যনো দেবের বাড়ি:
ভারতীয় উপমহাদেশের বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য দেবের পৈতৃক বাড়ি (Mohaprovu Sri Chaitanya Dev’s House) সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জের মিশ্রপাড়া গ্রামে। আর এই মিশ্রপাড়া গ্রামেই গড়ে তোলা হয়েছে মন্দির, যা বর্তমানে হিন্দু ধর্মালম্বীদের কাছে তীর্থস্থান হিসেবে সুপরিচিত। প্রতিবছর এই তীর্থস্থান দর্শনে অসংখ্য পর্যটকের সমাগম ঘটে।

১৩। সুনামগঞ্জ (যাদুকাটা নদী, বারেক টিলা, শিমুল বাগান, নীলাদ্রি লেক, টাঙ্গুয়ার হাওর, হাসন রাজা জাদুঘর, শাহ আব্দুল করিমের বাড়ি):
সুরমা নদীর ঘেঁষা শহর সুনামগঞ্জ (Sunamganj) ভাটি অঞ্চল হিসাবে সুপরিচিত। ভাটি জেলা সুনামগঞ্জকে যেন প্রকৃতি আপন মাধুরী দিয়ে সাজিয়েছে। পাশাপাশি সুনামগঞ্জে জন্ম নিয়েছেন দেশের অনেক কৃতি সন্তান যাদের মধ্যে হাসন রাজা ও বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম অধিক জনপ্রিয়। হাসন রাজার জাদুঘর শাহ আব্দুল করিম এর বাড়ি ছাড়াও যাদুকাটা নদী, বারেক টিলা, শিমুল বাগান, নীলাদ্রি লেক, টাঙ্গুয়ার হাওরের বৈচিত্র দেখতে হলে আপনাকে ছুটে আসতে হবে সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলায়।

নীলাদ্রি লাইমস্টোন লেক, টেকেরঘাট
ছবিঃ রায়হান সায়েদ

১৪। মালনীছড়া চা বাগান:
সিলেট জেলায় অবস্থিত মালনীছড়া চা বাগান (Malnicherra Tea Estate) উপমহাদেশের প্রথম এবং সর্ববৃহৎ চা বাগান। ১৮৪৯ সালে ১৫০০ একর জায়গা নিয়ে মালনীছড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠা করেন লর্ড হার্ডসন। সিলেট বিমানবন্দর সড়কের পাশেই গড়ে উঠা মালনীছড়া চা বাগানে আনন্দ ভ্রমণ কিংবা অবসর কাটানোর জন্য ভ্রমণ পাগল মানুষেরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেড়াতে আসেন।

১৫। ড্রিমল্যান্ড পার্ক:
ড্রিমল্যান্ড পার্ক (Dreamland Amusement and Water Park) সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের গোলাপগঞ্জের হিলালপুর গ্রামে অবস্থিত। ড্রিমল্যান্ড পার্কে বিভিন্ন আকর্ষনীয় আধুনিক সব রাইডের পাশাপাশি রয়েছে ওয়াটার পার্কের সমস্ত আয়োজন। ড্রিমল্যান্ড পার্কটিতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের সাথে আধুনিক বিনোদনের সমন্বয় করা হয়েছে যা এই ড্রিমল্যান্ড পার্কটিতে আগত দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। সপ্তাহের সাতদিনই দর্শনার্থীদের জন্য ড্রিমল্যান্ড পার্ক খোলা থাকে।

সিলেটের দর্শনীয় স্থান দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন এইখানেঃ সিলেটের দর্শনীয় স্থান (পর্ব ২)

সিলেট বিভাগের দর্শনীয় জায়গা নিয়ে  আমাদের এই স্থান সংকলন ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। আপনার নিজের অভিজ্ঞতা জানান মন্তব্যের ঘরে।

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।