ইতিহাস, ঐতিহ্য আর বৈচিত্র্যের এক অপরূপ মেলবন্ধন – পুরান ঢাকা। ঢাকা মহানগরীর আদি অঞ্চলটিকে পুরান ঢাকা বলা হয়। পুরান ঢাকা পূর্ব-পশ্চিমে গেন্ডারিয়া ফরিদাবাদ থেকে হাজারীবাগ ট্যানারি মোড় পর্যন্ত এবং দক্ষিণে ঢাকা সদরঘাট থেকে নবাবপুর পর্যন্ত বিস্তৃত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা এই অঞ্চল শুধু একটি নগরের অংশ নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত ইতিহাসের ভাণ্ডার।
মোঘল আমলের স্থাপত্য, ব্রিটিশ উপনিবেশিক ছোঁয়া, ধর্মীয় সহাবস্থানের নিদর্শন, আর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক অনন্য প্রকাশ এখানে প্রতিটি অলিগলি, প্রতিটি ভবনের ইট-পাথরে লুকিয়ে আছে। আজকের ভ্রমণ গাইডে জানাবো পুরান ঢাকার ১৮টি ঐতিহাসিক স্থাপনা সম্পর্কে।
লালবাগ কেল্লা
লালবাগ কেল্লা (Lalbagh Fort) রাজধানী ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকায় অবস্থিত। শুরুতে লালবাগ কেল্লার নাম দেয়া হয়েছিল আওরঙ্গবাদ দূর্গ বা আওরঙ্গবাদ কেল্লা। পরবর্তীতে ১৬৮৪ খিষ্টাব্দে সুবেদার শায়েস্তা খানের কন্যা ইরান দুখত পরীবিবি মারা যাওয়ার পর তিনি দূর্গটি তৈরির কাজ বন্ধ করে দেন। ১৮৪৪ সালে আওরঙ্গবাদ এলাকাটির নাম পরিবর্তন করে লালবাগ রাখেন। এলাকার নামের সাথে সাথে কেল্লাটির নামও পরিবর্তিত হয়ে লালবাগ কেল্লা হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।

আহসান মঞ্জিল
আহসান মঞ্জিল (Ahsan Manzil) পুরান ঢাকার ইসলামপুরে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। আহসান মঞ্জিলের সাথে জড়িয়ে রয়েছে ঢাকার শত বছরের পুরনো ইতিহাস। ঢাকার পুরনো স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় আহসান মঞ্জিলকে। আহসান মঞ্জিলকে ঢাকা শহরের প্রথম ইট-পাথরের তৈরি স্থাপত্য নিদর্শন হিসাবে মনে করা হয়।

রোজ গার্ডেন প্যালেস
রোজ গার্ডেন প্যালেস (Rose Garden Palace) রাজধানী ঢাকার টিকাটুলিতে অবস্থিত। ১৯ শতকে হৃষিকেস দাস নামের এক হিন্দু জমিদার বিনোদনের জন্য রোজ গার্ডেন প্যালেসটি নির্মাণ করেন। তৎকালীন সময় বিত্তবান হিন্দুদের সামাজিক অনুষঙ্গ হিসাবে বলধা গার্ডেনে জলসার আয়োজন করা হত। হৃষিকেস দাস ছিলেন নিন্মবর্ণের ফলে এক জলসায় তিনি অপমানের স্বীকার হন। এরপর হৃষিকেস দাস বিনোদনের জন্য রোজ গার্ডেন প্যালেস তৈরী করেন এবং এখানেই জলসার আয়োজন করতেন। ঐ সময়ে এই বাগানবাড়ির নয়নাভিরাম সাজঘর ছিল মূল আকর্ষণ।

আর্মেনিয়ান চার্চ
আর্মেনিয়ান চার্চ (Armenian Church) পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত। ১৭৮১ সালে নির্মিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই গীর্জাটি। আর্মেনীয় বণিক ও ধর্মযাজকদের মাধ্যমে তৈরি হয় এই গির্জা। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে ঢাকায় আর্মেনীয়রা প্রথম আসতে শুরু করে।

সদরঘাট
সদরঘাট (Sadarghat) বাংলাদেশের ঢাকা শহরের বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে গড়ে ওঠা একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নদী বন্দর। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা সমূহ পটুয়াখালী, বরিশাল, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি, মাদারীপুর, চাঁদপুর, খুলনা, হাতিয়া ও বাগেরহাট সহ প্রায় ৪৫টি পথে লঞ্চ ও স্টিমার চলাচল করে।

হোসেনী দালান
হোসেনী দালান (Hossaini Dalan) বা ইমামবাড়া মূলত কারাবালার প্রান্তরে শাহাদাৎ বরণকারী ঈমাম হোসেনের স্মৃতির স্মরনে নির্মিত শিয়া সম্প্রদায়ের একটি উপসনালয়। পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে অবস্থিত এই স্থাপনাটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরানো। অনুমান করা হয় ১৭শ শতকে মোগল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে হোসেনী দালান ভবনটি নির্মাণ করা হয়।

বিউটি বোর্ডিং
পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিং (Beauty Boarding) বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকদের অনন্য এক আড্ডার স্থান। বাংলাবাজারের বইয়ের মার্কেট ছাড়িয়ে কিছুটা এগিয়ে শ্রীশদাস লেনে দাড়িয়ে আছে “বিউটি বোর্ডিং”। পুরান ঢাকার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানের তুলনায় বিউটি বোর্ডিংকে জীর্ণ মনে হলেও এই বোর্ডিং জুড়ে আছে সময়ের পদচিহ্ন। ১৯৪৯ সালে প্রহ্লাদ সাহা এবং তার ভাই নলিনী মোহন সাহা ১১ কাঠা জমির উপর এই বিউটি বোর্ডিং গড়ে তোলেন। নলিনী মোহনের বড় মেয়ে বিউটির নামানুসারে এই বোর্ডিংয়ের নামকরণ করা হয়।

কার্জন হল
কার্জন হল (Curzon Hall) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত প্রায় ১১৫ বছরের পুরনো একটি ঐতিহাসিক ভবন ও পুরাকীর্তি। বর্তমানে কার্জন হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও জীব বিজ্ঞান অণুষদের পাঠদানে ব্যবহার করা হচ্ছে। ১৯০৪ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি তৎকালীন গভর্ণর জেনারেল জর্জ কার্জন এই ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর থেকে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত কার্জন হল ঢাকা কলেজ ভবন হিসেবে ব্যবহার করা হত।

বলধা গার্ডেন
বলধা গার্ডেন (Baldha Garden) একটি উদ্ভিদ উদ্যান বা বোটানিক্যাল গার্ডেন। পুরান ঢাকার ওয়ারীতে অবস্থিত বলধা গার্ডেনের আয়তন ৩.৩৮ একর। ১৯০৯ সালে ঢাকা জেলার বলধার জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী বিভিন্ন দেশ থেকে ফুল এবং দুর্লভ উদ্ভিদ এনে বলধা গার্ডেন সাজানো শুরু করেন। বর্তমান গাজীপুর জেলাই তৎকালীন সময়ে বলধা নামে পরিচিত ছিল।

রূপলাল হাউজ
রূপলাল হাউস (Ruplal House), যা পূর্বে আরাটুন হাউস নামে পরিচিত ছিল, বাংলাদেশের পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক প্রাসাদ। এটি বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত। একসময় আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ী স্টিফেন আরাতুন এটি নির্মাণ করেন। পরে, রূপলাল দাস ও রঘুনাথ দাস নামের দুই ভাই এটি কিনে নেন এবং মার্টিন কোম্পানি এটিকে পুনর্গঠন করে।

তারা মসজিদ
তারা মসজিদ (Star Mosque) পুরান ঢাকার আরমানিটোলা এলাকায় আবুল খয়রাত সড়কে অবস্থিত। মসজিদের গায়ে কোন শিলালিপি না থাকায় মসজিদটির সঠিক নির্মাণকাল সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হয় ১৮ শতকের শুরুর দিকে তৎকালীন ঢাকার জমিদার মির্জা গোলাম পীর তারা মসজিদ নির্মাণ করেন।

ওসমানী উদ্যান
ঢাকার গুলিস্তানে নগর ভবন ও সচিবালয়ের সংলগ্ন প্রায় ২৩.৩৭ একর জায়গাজুড়ে ওসমানী উদ্যান (Osmani Uddayan) অবস্থিত। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর নামে ওসমানি উদ্যান নামকরন ও ওসমানি অডিটোরিয়াম নির্মাণ করা হয়।

বাহাদুর শাহ পার্ক
পুরান ঢাকার সদরঘাট এলাকার লক্ষ্মীবাজারে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী উদ্যানের নাম বাহাদুর শাহ পার্ক (Bahadur Shah Park)। গাছপালার ছায়াঘেরা মনোরম পরিবেশের বাহাদুর শাহ পার্কে আরও আছে নবাবজাদা খাজা হাফিজুল্লাহ স্মরণে তৈরী স্মৃতিস্তম্ভ এবং সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক নির্মিত ফোয়ারা। ১৯৫৭ সালে নবাব খান বাহাদুর পার্কটির নাম পরিবর্তন করে বাহাদুর শাহ পার্ক রাখেন।
ঢাকেশ্বরী মন্দির
ঢাকেশ্বরী মন্দির (Dhakeshwari Temple) বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি ঐতিহাসিক পুণ্যস্থান এবং জাতীয় মন্দির। ঢাকেশ্বরী শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘ঢাকার ঈশ্বরী’। আবার অনেকে মনে করেন, এই ঢাকেশ্বরী মন্দিরের নাম থেকেই ঢাকার নামকরণ করা হয়েছে।
শঙ্খনিধি হাউস
বিংশ শতকের শুরুতে লালমোহন সাহা, ভজহরি সাহা ও গৌর নিতাই সাহা নামের বণিক ভ্রাতৃত্রয় ব্যবসায় ব্যপক উন্নতির ফলে বণিক উপাধি বর্জন করে শঙ্খনিধি অর্থাৎ শঙ্খের বাহক উপাধি গ্রহণ করেন। ১৯২০-১৯২৬ সালে তাঁরা পুরান ঢাকার টিপু সুলতান রোড থেকে ওয়ারির র্যাঙ্কিন স্ট্রিটের বিভিন্ন জায়গায় বেশকিছু ভবন নির্মাণ করেন। তিন ভাইয়ের একজন লালমোহন সাহা ১৯২১ সালে শঙ্খনিধি হাউস (Songkhonidhi House) নির্মাণ করেন।
নর্থব্রুক হল – লালকুঠি
১৮৭৪ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যরিং নর্থব্রুকের ঢাকা সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে মোগল স্থাপত্যরীতি ও ইউরোপীয় কারুকাজের অপূর্ব সংমিশ্রণে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ফরাশগঞ্জ এলাকায় নর্থব্রুক হল (Northbrook Hall) নির্মাণ করা হয়।
বড় কাটরা
পুরান ঢাকার চকবাজারের বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে মুঘল আমলের এক ঐতিহাসিক নিদর্শন বড় কাটরা (Bara Katra) অবস্থিত। ১৬৪১ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহজাদা শাহ সুজার নির্দেশে প্রধান স্থপতি মীর আবুল কাসেম এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেন। আবুল কাসেমকে সে সময় ‘মীর-ই-ইমারত’ নামে আখ্যায়িত করা হত। শাহজাদা শাহ সুজার বসবাসের জন্য বড় কাটরা নির্মিত হলেও পরবর্তী সময়ে এটি মুসাফিরখানা হিসাবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
ছোট কাঠারা
ছোট কাটরা (Choto Katara) শায়েস্তা খানের আমলে তৈরি একটি স্থাপনা বা ইমারত। বর্তমানে অবশ্য ছোট কাটরা বলতে কিছুই বাকি নেই শুধু একটি ভাঙা ইমারত ছাড়া। যা শুধু বিশাল তোড়নের মতন সরু গোলির উপর দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে অসংখ্য দোকান এমন ভাবে ঘিরে ধরেছে যে দেখে বোঝার উপায় নেই যে এখানে মুঘল আমলের এমন একটি স্থাপত্য ছিল।
ভ্রমণ সংক্রান্ত যে কোন তথ্য ও আপডেট জানতে ফলো করুন আমাদের ফেসবুক পেইজ এবং জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।
