সিলেট ভ্রমণ যেকোন কাপলদের জন্যে কিছুটা ব্যয় সাপেক্ষ্য। আর অফরোডে সিলেটের ভ্রমণ স্থান গুলোতে ঘুরে বেড়াতে নানান রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সম্প্রতি আমাদের অতিথি লেখক শরিফা রিফা তার স্বামীকে নিয়ে ৫ দিনের ট্যুরে সিলেট বিভাগের (সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার) বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্য ঘুরে এসেছেন। শরিফা রিফার লেখায় পড়ুন সিলেট ভ্রমণে তার অভিজ্ঞতার কথা এবং জেন নিন এই ভ্রমণে হোটেল ভাড়া, যাতায়াত খরচ ও আনুষঙ্গিক বিভিন্ন ভ্রমণ টিপস।

বর্ষাকাল সিলেট ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। এই সময় পানি বেশি থাকায় সিলেটের সৌন্দর্য কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। সিলেট যাওয়ার ইচ্ছা আমার অনেক আগে থেকে। বারবার মিস করার পর অবশেষে সেই কাঙ্খিত দিন আসে। এই পোস্টটি করা মূলত কাপলদের জন্য। গ্রুপ করে গেলে ট্যুরের খরচ অনেক কমে যায়। কিন্তু আমাদের মত কিছু মানুষ আছে যাদের জন্য গ্রুপ করে যাওয়া কঠিন। আশা করি তারা একটু হলেও উপকৃত হবেন। ২০ জুলাই শনিবার আমি আর আমার হাজব্যান্ড যাত্রা শুরু করি। আমরা ঢাকা থেকে রাত ৯:৫০ এর উপবন এক্সপ্রেসে কেবিন নন-এসিতে টিকেট করেছিলাম। ভাড়া ছিল অনলাইন চার্জসহ দুজনের ১৪২০ টাকা (স্টেশনে গিয়ে কাটলে ১৩৮০ টাকা)।

১ম দিন

২১ তারিখ সকাল ৬:২০ এ সিলেট স্টেশনে পৌঁছে যাই। ওখান থেকে রিকশা করে জিন্দাবাজার গিয়ে পাঁচভাই রেস্টুরেন্টে নাস্তা করে সিএনজি ঠিক করি। অনেক দরাদরি করার পর ঠিক হয় দিনপ্রতি ১২০০টাকা। পরে ডিটেইলস বলছি। সিএনজি ঠিক করে আমরা হোটেল রাজমহল এ উঠি। হোটেল ভাড়া দিনপ্রতি ১৫০০টাকা(এসি)। চাইলে আরও কম বাজেটের হোটেলও পাবেন। হোটেল থেকে ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে পরি। সিএনজি করে প্রথমে যাই গোয়াইনঘাটে। যেতে যেতে রাস্তার সৌন্দর্যে বারবার মুগ্ধ হচ্ছিলাম। গোয়াইনঘাট থেকে নৌকা ঠিক করি রাতারগুল যাওয়ার জন্য। অনেক দর কষাকষির পর ঠিক হয় ১২০০ টাকা (প্রচুর সিন্ডিকেট) আর মাঝিকে বকশিস দেই ১০০ টাকা। রাতারগুলের সৌন্দর্য মুখে বলার মত না। যে দেখেছে সেই শুধু বুঝবে।

রাতারগুল; ছবিঃ লেখক

রাতারগুল থেকে ফিরে রওনা করি পান্থুমাই আর বিছনাকান্দির উদ্দেশ্যে। ড্রাইভার আগের ঘাটগুলোতে নামাতে চাইলেও একদম শেষ ঘাটে নামবেন। ওখানে নৌকা ভাড়া তুলনামূলক কম। আমরা পান্থুমাই আর বিছনাকান্দির জন্য ঠিক করি ২৫০০ টাকায়। প্রচুর দর কষাকষি করে নিবেন। আমাদের উপায় ছিলোনা, দেরি হয়ে যাচ্ছিলো তাই এই টাকায় যাই। পান্থুমাই গ্রামে পৌঁছে ডিঙি নৌকা করে ইন্ডিয়ার একদম কাছে ঝর্ণার নিচে যাওয়া যায়। ওখান থেকে নৌকা ভাড়া জনপ্রতি ১০০ টাকা। এক নৌকায় দুইজন যাওয়া যায়। আমাদের লাক খারাপ ছিল, নৌকা পারাপার ঐ সময় বন্ধ ছিল তাই ঝর্নার কাছে যেতে পারিনি। পাশের জনের আফসোসের সীমা ছিলোনা এই নিয়ে।

বিছনাকান্দি যাবার পথে, ছবিঃ লেখক

পান্থুমাই থেকে রওনা দেই বিছনাকান্দির উদ্দেশ্যে। পাথর, পানি আর পাহাড়ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই। বাট কষ্ট লাগছিল পাহাড় সব ইন্ডিয়ার দখলে তাই। বিছনাকান্দি থেকে ফিরে রওনা দেই হোটেল এর উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে নূর আনোয়ারা বড় বাড়ি (পাখি বাড়ি) আর বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরাতন চা বাগান মালনীছড়া ভ্রমণ করি। আর লামাবাজার থেকে ঐতিহ্যবাহী মণিপুরী শাড়ি কিনে রাতে আবার হযরত শাহজালাল (রহঃ) এর মাজার ঘুরে আসি। ঐদিন সিএনজি ভাড়া দিয়েছিলাম ১৩০০ টাকা।

২য় দিন

সকালে বের হই জাফলং এর উদ্দেশ্যে। প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল, তাই লালাখাল যেতে পারিনি। পাহাড়ি ঢলে পানি ঘোলা ছিল। ভোলাগঞ্জ সাদা পাথরও নিমজ্জিত ছিল পানিতে। জাফলং এ নৌকা সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ি। সিএনজি ড্রাইভার ওখানে চালাকি করে নিয়ে গিয়েছিল বলে পরে মনে হয়েছে। জিরো পয়েন্ট, খাসিয়া পল্লী, সংগ্রাম্পুঞ্জি জলপ্রপাত সব ঘুরাবে এই উদ্দেশ্য নৌকা ভাড়া ঠিক করি ১৮০০ টাকায়। আমার হাজব্যান্ড বলেছিল যে লোকাল ট্রলারে করে যাওয়া যায়না? ওরা জানাল যে ওই ঘাট বন্ধ। ফেরার পথে বুঝলাম সব মিথ্যা। আসলে আমরা জনপ্রতি ৫০ টাকা করে যেতে পারতাম জিরো পয়েন্ট আর সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণায়। আর খাসিয়া পল্লীতে ওরকম কিছু দেখার নেই। আফসোস হচ্ছিল নিজেদের বোকামির জন্য। কেউ এরকম সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়বেননা। দেখে শুনে বুঝে যাবেন।

সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা
সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা

ফেরার পথে তামাবিল জিরো পয়েন্ট, জৈন্তাপুর জমিদার বাড়ি আর শাহ পরাণের মাজার দেখেছিলাম। সিএনজি ভাড়া দিয়েছিলাম ১৪০০ টাকা। ১৫০০ই দিতাম, ড্রাইভারের উপর রাগ হয়েছিল, সে নিশ্চয়ই ওখান থেকে কমিশন নিয়েছে। হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে পরি আবার। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, এমসি কলেজ আর সিলেট শহর ঘুরে ঐদিনের সফর শেষ করি। রাতে কথা বলে রাখি পরের দিন সুনামগঞ্জ টাংগুয়ার হাওড়ে যাওয়ার জন্য। মোবারক মাঝিকে ঠিক করি সারাদিন আর সারারাত এর জন্য। ঐদিন উনি ফাঁকা ছিল তাই ৩২০০ টাকায় রাজি হয়ে জান।

৩য় দিন

সিলেট কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড থেকে সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে বিআরটিসি বাসের টিকেট কাটি জনপ্রতি ১১০টাকা (নন-এসি)। প্রায় দেড়ঘন্টা লেগেছিল সুনামগঞ্জ সুরমা ব্রীজ পৌঁছাতে। ঐখান থেকে সিএনজি রিজার্ভ করি তাহিরপুর যাওয়ার জন্য। ভাড়া ছিল ৩৫০টাকা (বড় গ্রুপ হলে লেগুনাতে অথবা সাথে বড় ব্যাগ না থাকলে মোটরসাইকেলে যাওয়া যাবে)। সবাই ওখানে মোটরসাইকেল করে যায়। আমাদের সাথে লাগেজ থাকায় সিএনজি করে যেতে হয়েছে। তাহিরপুর পৌঁছাতে কম ধকল পোহাতে হয়নি। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে রাস্তা ভাংগা ছিল। তাই হাটতে হয়েছে প্রায় ৫০০ মিটার। তারপরে আবার অটোরিকশা জনপ্রতি ২০ টাকা করে।

ট্রলারের মাঝি মোবারক ভাই আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা দুপুরের খাবার হোটেল থেকে খেয়ে প্রয়োজনীয় খাবার পানি কিনে ট্রলারে উঠে পড়ি। ইচ্ছা ছিল রাতে ট্রলারে থাকার। মাঝি বলেছিল চাইলে ট্রলারে রান্না করে দিবে। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বাজার করে নেওয়া লাগবে৷ আমরা দুজন বলে এই ঝামেলা নেইনি। ট্রলার একটু পর টাংগুয়ার হাওড়ের ভেতরে চলে যায়। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। অবাক হয়ে দেখছিলাম। ভেতরে ওয়াচ টাওয়ারে থামিয়েছিল গোসলের জন্য। হাওর পার হয়ে টেকেরঘাট পৌঁছলাম।

বারেক টিলা থেকে যাদুকাটা; ছবিঃ লেখক

ওখান থেকে একটা মোটরসাইকেল করে (ঠিক করে দিয়েছিল মোবারক ভাই) প্রথমে যাই শিমুল বাগান, পরে বারেক/বারিক্কা টিলা, জাদুকাটা নদী, রাজাই ঝর্ণা, লক্ষণছড়া, নীলাদ্রি লেক (শহীদ সিরাজ লেক) স্পটে। সবকটা স্পটই ছিল চোখ ধাঁধানো সুন্দর। যত দূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। সন্ধ্যার দিকে হুট করে ডিসিশন নেই ঐদিন সিলেট ফিরে যাব, রাতে থাকবোনা। কারণ রাতে থাকতে গেলে পরের দিন নষ্ট হয়ে যাবে। আমাদের যাওয়ার কথা ছিল মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত। টেকেরঘাট থেকে সন্ধ্যায় রওনা দেই। সাড়ে আটটায় পৌঁছে যাই তাহিরপুর ঘাটে। কিন্তু স্থানীয় লোকজন যেতে দেয়নি গলাকাটা গুজবের ভয়ে। আগেরদিন কাকে যেন মেরে ফেলেছে এই গুজব বিশ্বাস করে৷ অগত্যা ঐদিন থেকে গেলাম তাহিরপুরে। আমরা ছিলাম হোটেল টাংগুয়া ইন এ। ভাড়া ছিল ৬০০ টাকা।

৪র্থ দিন

চতুর্থ দিন পুরোটাই নষ্ট হয়েছিল যাতায়াতের কারণে। আগেরদিন রাতে বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তার অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ ছিল। রাস্তা ভেংগে পানি উঠে একাকার অবস্থা। ৩ বার সিএনজি চেঞ্জ করতে হয়েছিল। প্রায় তিনঘণ্টা লেগেছিল সুনামগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড পৌঁছাতে। ওখান থেকে বিআরটিসি বাসের টিকেট করি সিলেটের উদ্দেশ্যে কারণ মৌলভীবাজার যাওয়ার সরাসরি বাস নেই। ভাড়া জনপ্রতি এসি ১৬০ টাকা। সিলেট পৌঁছে দেখি দুপুর ১টা বাজে৷ ঐদিন রওনা দিয়ে কোনভাবেই সম্ভব না মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত দেখা কারণ শুনেছি ৫ টার মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। তাই মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত দেখার আশা ছেড়ে দেই এবারের মত। ওখান থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে রেলস্টেশনে চলে যাই। বিকাল ৩টার পারাবত এক্সপ্রেসে যাই শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশ্যে । ভাড়া শোভন চেয়ারে জনপ্রতি ১১০ টাকা। ৬টায় পৌঁছে যাই শ্রীমঙ্গলে। ওখান থেকে হোটেল টি টাউনে উঠি। ভাড়া ছিল ১৩০০ টাকা (এসি)। রাতে শহর ঘুরে দেখি। আর পরেরদিনের জন্য সিএনজি ঠিক করে ফেলি। সিলেটে খাবার হোটেল পাঁচভাই ও পানসী দুটোই অনেক ভালো, শ্রীমঙ্গলে পানসী রেস্টুরেন্ট ভালো, তবে সিলেট থেকে দামে বেশ বেশি।

৫ম দিন

সকালে নাস্তা সেড়ে বেড়িয়ে পড়ি। আগে থেকে হোটেলে চেক-আউট করে যাই। প্রথমে দেখি রাবার বাগান, পরে গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট বাইরে থেকে দেখে যাই ফুলবাড়ি টি এস্টেট, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, নুরজাহান টি এস্টেট এবং সব শেষে শ্রীমঙ্গল বধ্যভূমি। সিএনজি ভাড়া অবশ্যই ঠিক করে নিবেন আগেই। শ্রীমঙ্গলে ভাড়া বেশি দাবি করে। আমরা দুপুর ৩ টায় সিএনজি ছেড়ে দেই তবুও ১২০০ টাকা নিয়েছে অথছ প্রথমে বলেছিল সিলেটের তুলনায় অনেক কম ভাড়া নিবে সে। দুপুরে খেয়ে হোটেল থেকে লাগেজ নিয়ে বাসস্টেশনে যাই। হানিফ পরিবহনে ঢাকার টিকেট কাটি জনপ্রতি ৩৮০ টাকা করে।

নুরজাহান টি এস্টেট; ছবিঃ লেখক

কিছু টিপস

  • ট্যুরে অযথা ব্যাগ ভারি করবেন না। আমরা অনেক সাফার করেছি।
  • সাথে অবশ্যই ছাতা আর রেইনকোট রাখবেন। বর্ষাকালে প্রায় প্রতিদিন বৃষ্টি হয় সিলেটে।
  • নৌকা সিএনজি যাই ভাড়া করেন না কেন দাম কষাকষি করে নিবেন। 
  • ভাইয়েরা প্রচুর ধৈর্য্য না থাকলে বউকে টাংগুয়ার হাওরে নিবেন না। এসব জায়গায় মেয়েদের নেওয়া বিশেষ করে লাগেজ টানা খুব কষ্ট! 
  • প্রতিদিন খুব সকালে রওনা দিবেন তা না হলে সব স্পট কাভার করতে পারবেন না।

লেখক : শরিফা রিফা

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।