প্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ সুনামগঞ্জ জেলা এক সময় আসামের কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। বিশাল হাওর অঞ্চলের সাথে উত্তরে খাসিয়া ও জৈন্তিয়া পাহাড় নিয়ে সিলেট বিভাগের এই জেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর। সুনামগঞ্জ জেলার দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- টাঙ্গুয়ার হাওর, টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি, নীলাদ্রী লেক খ্যাত শহীদ সিরাজ লেক, শিমুল বাগান, বারিক টিলা, যাদুকাটা নদী, লাউড়ের গড়, হাসান রাজার বাড়ি ইত্যাদি। ভ্রমণ গাইডের আজকের আয়োজনে চলুন জেনে নেই ১ রাত দুই দিনের সুনামগঞ্জ ভ্রমণের খরচ, দর্শনীয় স্থানসহ একটি সম্পূর্ণ ভ্রমণ পরিকল্পনার বিস্তারিত খুঁটিনাটি তথ্য।

সুনামগঞ্জের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভ্রমণ স্থান টাঙ্গুয়ার হাওর। সাধারণত বর্ষাকালে টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। শীতকালে হাওরে তেমন পানি থাকেনা তাই নৌকায় করে সব জায়গায় বেড়ানো সম্ভব নয়। আমাদের এই ভ্রমণ পরিকল্পণা মূলত বর্ষাকাল ও তার আশেপাশের সময়কে সামনে রেখে। সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান গুলোকে ১ রাত ২ দিনে দেখার জন্যে তিন রকম ভাবে পরিকল্পনা করা যায়। রুট প্ল্যান গুলো হবে এমনঃ

রুট প্ল্যান ১ : সুনামগঞ্জ শহর > তাহিরপুর > টাঙ্গুয়ার হাওর > টেকেরঘাট > শহীদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রি লেক) > শিমুল বাগান > বারিক টিলা > যাদুকাটা নদী > লাউড়ের গড় > সুনামগঞ্জ শহর

রুট প্ল্যান ২ : সুনামগঞ্জ শহর > তাহিরপুর > টাঙ্গুয়ার হাওর > টেকেরঘাট > শহীদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রি লেক) > শিমুল বাগান > বারিক টিলা > যাদুকাটা নদী > টেকেরঘাট > তাহিরপুর > সুনামগঞ্জ শহর

রুট প্ল্যান ৩ : সুনামগঞ্জ শহর > লাউডের গড় > যাদুকাটা নদী > বারেক টিলা > শিমুল বাগান > শহীদ সিরাজ লেক (নিলাদ্রী লেক) > টেকেরঘাট > টাঙ্গুয়ার হাওর > তাহিরপুর > সুনামগঞ্জ শহর

সুনামগঞ্জ ভ্রমণ গাইড (রুট প্ল্যান ১)

আপনার সুবিধামত রাতের বাসে সুনামগঞ্জ রওনা দিলে সকাল ৭ টার মধ্যেই সুনামগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড পৌঁছাতে পারবেন। সকালের নাস্তা করে সিএনজি বা লেগুনা ভাড়া করে তাহিরপুরের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ুন। সুনামগঞ্জ থেকে তাহিরপুর আসতে ঘন্টা দেড়েক সময় লাগে। তাহিরপুর ঘাট থেকে নৌকা ঠিক করে যদি নিজেরা বা মাঝিকে দিয়ে রান্না করাতে চান তাহলে তা আগেই মাঝির সাথে আলাপ করে ২ দিন ১ রাতের জন্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে ফেলুন। চেষ্টা করুন সকাল ১১ টার মধ্যে নৌকায় উঠে পড়ার।

যাদুকাটা নদী, সুনামগঞ্জ
যাদুকাটা নদী, ছবিঃ শফিকুল ইসলাম

নৌকা নিয়ে সোজা চলে আসুন ওয়াচ টাওয়ার এলাকায়। ওয়াচ টাওয়ার থেকে জলাবনের সৌন্দর্য্যের পাশাপাশি ছোট ছোট নৌকা নিয়ে ছোট বাচ্চাদের ঘুরতে দেখবেন। প্রয়োজনে ওয়াচ টাওয়ার এলাকায় রান্নার কাজ করে ফেলতে পারেন। ওয়াচ টাওয়ার দেখে উন্মুক্ত হাওরের মাঝে বেড়িয়ে পড়ুন। দিগন্তজোড়া জলরাশির বিশালতা ও দূরের পাহাড়ের রূপ দেখতে দেখতে দুপুরের পর টেকেরঘাট চলে আসুন। টেকেরঘাটের দিকে নৌকা যতই এগুতে থাকবে ততই পানি স্বচ্ছ দেখতে পাবেন এবং দূরের পাহাড় গুলো আরও স্পষ্ট হতে থাকবে।

আরও পড়ুন : একদিনে সুনামগঞ্জ ভ্রমণ গাইড

হাওরে গোসল না করে থাকলে টেকেরঘাটের নীলাদ্রি লেকে এসে গা ভেজাতে পারেন। আর এখানেই হাওরে নৌকা বেঁধে নৌকার মধ্যে রাত কাটিয়ে দিতে পারেন। টেকেরঘাট বাজার থেকে প্রয়োজনে দরকারি কিছু কেনার থাকলে কিনে নিতে পারেন। সকাল সকাল ঘুম থেকে নাস্তা করে টেকেরঘাট থেকে মটরসাইকেল নিয়ে শিমুল বাগান, যাদুকাটা নদী ও বারিক্কাটিলা দেখতে রওনা দিন। হাওরে বেশি পানি থাকলে নৌকা নিয়ে যাওয়ার সুবিধা আছে। তবে এতে নৌকা ভাড়া বেশি লাগবে। যদি নদীপথেই যাওয়ার ইচ্ছে থাকে তাহলে তাহিরপুর ঘাট থেকে নৌকা ঠিক করার সময় যাদুকাটা যাবার কথা বলে নিতে হবে। এবং সেভাবেই নৌকা ভাড়া ঠিক করে নিতে হবে।

শিমুল বাগান, যাদুকাটা নদী ও বারিক্কাটিলা দেখে দুপুরের মধ্যে টেকেরঘাট ফিরে আরেকটু সময় হাওর ঘুরে সন্ধ্যার আগেই তাহিরপুর চলে আসুন। সেখান থেকে সিএনজি বা লেগুনা ভাড়া করে সরাসরি সুনামগঞ্জ বাস স্ট্যান্ড চলে আসতে পারেন। রাতের বাসে চলে যেতে পারবেন আপনার গন্তব্যে।

সুনামগঞ্জ ভ্রমণ গাইড (রুট প্ল্যান ২)

এই প্ল্যান রুট প্ল্যান ১ এর মতই, তবে শেষের কিছুটা ব্যতিক্রম। রুট প্ল্যান ১ এর মত করে আপনি টেকেরঘাট চলে যান। সেখানে নৌকায় সকাল পর্যন্ত যে পরিকল্পনা দেওয়া আছে তার মতই সব কিছু করবেন। সকালে ফ্রেশ হয়ে নৌকা ছেড়ে দিন। নাস্তা করে টেকেরঘাট থেকে মটরসাইকেল নিয়ে শিমুল বাগান, বারিক টিলা ও যাদুকাটা নদী দেখতে রওনা দিন।

শিমুল বাগান, তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ
শিমুল বাগান, ছবিঃ steemit

বারিক টিলা ঘুরে দেখার পর নৌকায় করে যাদুকাটা নদী পাড় হয়ে লাউড়ের গড় বাজারে চলে আসুন। প্রয়োজন হলে লাউড়ের গড় বাজারে খাওয়া দাওয়া করে নিতে পারেন। তারপর লাউড়ের গড় বাজার থেকে বাইক অথবা সিএনজি দিয়ে ঘন্টা দেড়েক সময়ে সুনামগঞ্জ সদর চলে আসতে পারবেন। লাউড়ের গড় থেকে সুনামগঞ্জ শহরের দূরত্ব প্রায় ২৮ কিলোমিটার।

সুনামগঞ্জ শহরে এসে হাতে সময় থাকলে শহরের কাছেই হাসন রাজা জাদুঘর থেকে ঘুরে আসতে পারবেন। রাতে বাসের সময়ের আগে বাকি সময় শহর ঘুরেই কাটিয়ে দিবেন। বাস এ উঠার আগে রাতের খাবার খেয়ে নিতে পারেন।

সুনামগঞ্জ ভ্রমণ গাইড (রুট প্ল্যান ৩)

এই রুট প্ল্যান ঠিক রুট প্ল্যান ২ এর উল্টো পথে। ভোরে সুনামগঞ্জ পৌঁছে নাস্তা এবং আনুসাঙ্গিক কাজ শেষ করে সুরমা ব্রীজের কাছ থেকে বাইক ঠিক করে নিন। বাইক ঠিক করার আগে কোন কোন জায়গায় যাবেন তা বলে নিন। আপনি চাইলে এক বাইক নিয়েই যাদুকাটা নদী, বারিক টিলা, শিমুল বাগান, শহীদ সিরাজ লেক ঘুরে টেকেরঘাট যেতে পারেন। অথবা প্রথমে বাইক নিয়ে লাউড়ের গড় এসে বাইক ছেড়ে দিয়ে নদী পার হয়ে সেখান থেকে বাকি জায়গা দেখার জন্যে অন্য বাইক ঠিক করে নিতে পারবেন। এক বাইকে চালক ছাড়া দুইজন বসার সুযোগ রয়েছে। তবে অবশ্যই ভাড়ার বেপারে দরদাম করে নিবেন।

সুনামগঞ্জ শহর থেকে প্রথমে যাবে লাউড়ের গড় যার দূরত্ব প্রায় ২৮ কিলোমিটার, যেতে আপনার ঘন্টা দেড়েক সময় লাগবে। লাউড়ের গড় এসে নৌকায় যাদুকাটা নদী পার হয়ে চলে যান বারেক টিলায়। বারেক টিলা থেকে যাদুকাটা নদীর সৌন্দর্য্য দেখে পা বাড়ান শিমুল বাগানের উদ্দেশ্যে। শিমুল বাগান থেকে লাকমাছড়া যাওয়ার আগে ছোট ঝিরির রাজাই ঝর্ণায় কিছুটা সময় কাটিয়ে যেতে পারেন। লাকমাছড়া অনেকটা বিছানাকান্দির মত তাই চেষ্টা করবেন সিজনে যাওয়ার জন্য। তারপর শহীদ সিরাজ লেক (নিলাদ্রী লেক) দেখে টেকেরঘাট পৌঁছে বাইক ছেড়ে দিন।

নীলাদ্রি লাইমস্টোন লেক, টেকেরঘাট
শহীদ সিরাজ লেক, ছবিঃ রায়হান সায়েদ

বিকেলের মধ্যে টেকেরঘাট এসে খাওয়া দাওয়া সেরে টাংগুয়ার হাওরের জন্য নৌকা ঠিক করে ফেলতে পারেন। সাধারণত তাহিরপুর থেকে টাংগুয়ার হাওরের জন্য নৌকা ঠিক করতে হয়। তবে টেকেরঘাট থেকেও কিছু নৌকা পাওয়া যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে সময় বের করে থানায় জিডি করতে ভুল করবেন না। রাতের জন্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে নিন। খাওয়ার বেপারে নৌকার মাঝির সাথে কন্ট্রাক্ট করে নিন। অথবা চাইলে টেকেরঘাট বাজার থেকেও খাওয়া দাওয়া করে নিতে পারবেন। টাংগুয়ার হাওড়ে রাত কাটিয়ে ভোরে ওয়াচ টাওয়ার ঘুরে তাহিরপুর চলে আসুন। নৌকার আকার ও সিজন ভেদে ভাড়া লাগতে পারে ৪২০০ থেকে ৫০০০ টাকা।

তাহিরপুর থেকে লেগুনা বা সিএনজি দিয়ে সুনামগঞ্জ শহরে ফিরে আসুন। হাতে সময় থাকলে সুনামগঞ্জ শহরে ফিরে হাসন রাজার বাড়ি, রাজবাড়ি, ছাতক সিমেন্ট কারখানা দেখে নিতে পারেন। রাতে শহরের কোন হোটেলে খাওয়া দাওয়ার পর্ব সেরে বাসে উঠে আপনার গন্ত্যবে চলে আসুন।

সুনামগঞ্জ যাওয়ার উপায়

ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ : ঢাকার সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন মামুন ও শ্যামলী পরিবহণের বাস সরাসরি সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। আর মহাখালী বাস স্ট্যান্ড থেকে ছেড়ে যায় এনা পরিবহণের বাস। এসব বাসে জনপ্রতি টিকেট কাটতে ৫৫০ টাকা লাগে। ঢাকা হতে সুনামগঞ্জ পৌঁছাতে প্রায় ৬ ঘন্টা সময় লাগে।

চট্টগ্রাম থেকে সুনামগঞ্জ : চট্টগ্রাম থেকে বাসে এবং ট্রেনে (সিলেট হয়ে) সুনামগঞ্জ যাওয়া যায়। সরাসরি যেতে চাইলে বাসেই যেতে হবে। দামপাড় বাস স্ট্যান্ড থেকে ৮০০টাকা বাস ভাড়ায় সরাসরি সুনামগঞ্জ যাওয়া যায়। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে সিলেট গিয়ে নিচে উল্লেখিত উপায় সুনামগঞ্জ যেতে পারবেন।

সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ : সিলেটের কুমারগাঁও বাস স্ট্যান্ড থেকে সুনামগঞ্জ যাবার লোকাল ও সিটিং বাস আছে। সিটিং বাস ভাড়া ১০০ টাকা, সুনামগঞ্জ যেতে দুই ঘন্টার মত সময় লাগবে। অথবা শাহজালাল মাজারের সামনে থেকে সুনামগঞ্জ যাবার লাইট গাড়ি তে ২০০ টাকা ভাড়ায় যাওয়া যায়।

সুনামগঞ্জ ভ্রমণের সতর্কতা ও কিছু পরামর্শ

হাওর ভ্রমণে নিরাপত্তার জন্য অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট সাথে রাখুন। হাওরের পানিতে যেকোন ধরণের ময়লা ফেলবেন না। হাওরে উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী মাইক বা যন্ত্র ব্যবহার না করাই ভাল। তাহিরপুর কিংবা টেকেরঘাট যেখানেই নৌকা ঠিক করেন আপনার নিরাপত্তার জন্যে থানায় জিডি করে নিন।

সুনামগঞ্জ টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণে ব্যাকআপ ব্যাটারিসহ টর্চ, রেইনকোর্ট বা ছাতা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, টয়লেট পেপার, ব্যাগ ঢেকে ফেলার মতো বড় পলিথিন, প্লাস্টিকের স্যান্ডেল, সানগ্লাস, ক্যাপ বা হ্যাট, গামছা (যা সহজে শুকাবে), খাবার পানি, হাফ প্যান্ট এবং সহজে শুকায় এমন জামাকাপড় সঙ্গে নিন।

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।