সেন্টমার্টিন, বাংলাদেশের মূল ভূখন্ডের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। বাংলাদেশের জনপ্রিয় ভ্রমণ স্থানের তালিকায় উপরের দিকে অবস্থান সেন্টমার্টিনের। নারিকেল জিঞ্জিরা খ্যাত এই দ্বীপটি কক্সবাজার জেলা শহর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেন্টমার্টিনের অসীম নীল আকাশের সাথে সমুদ্রের নীল জলের মিতালী, সারি সারি নারিকেল গাছ আর অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ভ্রমণ পিয়াসী মানুষকে দুর্নিবার আকর্ষনে কাছে টেনে নেয়। ভ্রমণ গাইডের এই ভ্রমণ পরিকল্পনায় জেনে নিন সেন্টমার্টিন দ্বীপ ভ্রমণের ট্যুর প্ল্যান, যাবার উপায়, থাকা ও খাওয়ার এবং খরচ সম্পর্কে সকল তথ্য। এই ট্যুর প্ল্যান পড়ার সাথে সাথে নিচের লিংক গুলো থেকে আমাদের ভ্রমণ গাইড পড়ে নিলে আরও অনেক তথ্য জানতে পারেন।

সেন্টমার্টিন ট্যুর প্ল্যান ১ : দুই দিন এক রাত

সেন্টমার্টিন যেতে হলে প্রথমে কক্সবাজার জেলার টেকনাফে আসতে হবে। এক্ষেত্রে ঢাকা থেকে রাত ৮-১০ টার মধ্যে বাসে রওনা দিলে পরদিন সকাল ৯ টার মধ্যে সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ ঘাটে চলে আসতে আসবেন। ঢাকা হতে বাসে টেকনাফ জাহাজ জেটিতে পৌঁছাতে ১০-১২ ঘন্টা সময় লাগে। ঢাকার ফকিরাপুল ও সায়েদাবাদ থেকে শ্যামলী, সেন্টমার্টিন পরিবহন, ঈগল, এস আলম, মডার্ন লাইন, গ্রীন লাইন ইত্যাদি বাস সরাসরি টেকনাফ যায়। বাসের ধরণ ও মান অনুযায়ী জনপ্রতি টিকেটের ভাড়া ৮০০ থেকে ২০০০ টাকা।

প্রথম দিন

বাস থেকে টেকনাফের যে জাহাজে যাবেন তার জেটির কাছে নেমে আগে টিকেট করা না থাকলে টিকেট কাউন্টার হতে কত দিন সেন্টমার্টিনে থাকবেন সেটা জানিয়ে সেন্টমার্টিনগামী পছন্দের জাহাজের টিকেট সংগ্রহ করে নিন। টেকনাফ থেকে কেয়ারী সিন্দাবাদ, কেয়ারি বে ক্রুজ এন্ড ডাইন, এম ভি গ্রীনলাইন ১, এমভি ফারহান, আটলান্টিক সহ আরও কিছু জাহাজ প্রতিদিন সকাল ৯.০০-৯.৩০ মিনিটে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। জাহাজের শ্রেনীভেদে আপ-ডাউন ভাড়া ৫৫০-১৫০০ টাকার মত। জাহাজে করে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন যেতে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘন্টা।

সব ঠিক থাকলে দুপুর ১২ টা থেকে সাড়ে ১২ টার মধ্যেই সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৌঁছে যাবেন। সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৌঁছে আগে হোটেল বুকিং করা না থাকলে হোটেল ঠিক করে নিন। ব্লু মেরিন রিসোর্ট, কোরাল ভিউ রিসোর্ট, প্রাসাদ প্যারাডাইস রিসোর্ট, নীল দিগন্তে রিসোর্ট, প্রিন্স হেভেন রিসোর্ট, লাবিবা বিলাস রিসোর্ট, কোরল ব্লু, মারমেইড, পান্না রিসোর্ট, সি প্রবাল, ‎সি ইন, ‎হোটেল সাগর পাড়, রিয়াদ গেস্ট হাউজ, হোটেল স্বপ্ন প্রবাল, শ্রাবণ বিলাস, সানসেট ভিউ ইত্যাদি হোটেল ও রিসোর্টে ১৫০০ থেকে ৫০০০ টাকায় রাত্রিযাপন করতে পারবেন। হোটেল ঠিক করে চেক ইন করে বেরিয়ে পড়ুন সেন্টমার্টিনে সমুদ্র স্নানের উদ্দেশ্যে। সমুদ্র স্নান সেরে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য রিসোর্টে আগে অর্ডার করে রাখতে পারেন অথবা আশেপাশের কোন হোটেল থেকে খাবার খেতে পারেবন। এই ক্ষেত্রে কেয়ারি মারজান রেস্তোরাঁ, বিচ পয়েন্ট, হোটেল আল্লার দান, বাজার বিচ, আসাম হোটেল, সি বিচ, সেন্টমার্টিন, কুমিল্লা রেস্টুরেন্ট, রিয়েল রেস্তোরাঁ, হাজী সেলিম পার্ক ও হোটেল সাদেক-কে বেছে নিতে পারেন।

বিকেল বেলা পশ্চিম বিচে সময় কাটাতে পারেন অথবা হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকলে জেটি ঘাট থেকে ট্রলার/স্পিড বোটে চলে যান ছেঁড়া দ্বীপ ভ্রমণে। যদি ছেঁড়া দ্বীপ যান তাহলে দ্বীপে সূর্যাস্থ দেখে হোটেলে সন্ধ্যার ফিরে আসুন। রাতে বারবিকিউ করতে চাইলে উপরে উল্লেখিত যেকোন খাবার হোটেল কিংবা আপনার হোটেল বা রিসোর্টের সাথে বললে তারাই ব্যবস্থা করে দিবে। এক্ষেত্রে নিজেরা মাছ বাচাই করে কিনে দেওয়ার চেষ্টা করবেন এবং প্রয়োজনে দামাদামি করে নিবেন।

দ্বিতীয় দিন

পরদিন ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠে সাইকেল ভাড়া নিয়ে অথবা পায়ে হেটে সেন্টমার্টিন দ্বীপ ঘুরে দেখতে পারেন। পায়ে হেটে দ্বীপ ঘুরতে বের হলে অবশ্যই সাথে খাবার পানি নিয়ে নিবেন। চাইলে পুরো দ্বীপই ঘুরে দেখতে পারেন। ৩-৪ ঘন্টা সময় নিয়ে দ্বীপের চারপাশ ঘুরে দেখতে ভালই লাগবে। আর আগের দিন যদি ছেঁড়া দ্বীপ না গিয়ে থাকেন তাহলে সকালের সময়টা ছেঁড়া দ্বীপে কাটিয়ে আসুন। দুপুরের আগেই বিদায়ী সমুদ্র স্নান ও খাওয়া দাওয়া সেরে ৩ টার মধ্যে টেকনাফের জাহাজে চড়ে বসুন।

সেন্টমার্টিন জেটি ঘাট থেকে জাহাজগুলো বিকাল ৩ টা থেকে ৩.৩০ মিনিটের মধ্যে ছেড়ে যায়। তাই সময়ের আগে জেটি ঘাটে উপস্থিত না হতে পারলে জাহাজ মিস হবার সম্ভাবনা বাড়ে। আর এমন ক্ষেত্রে ট্রলারে করে ফেরা ছাড়া উপায় নেই, যা অনেকটা বিপদজনক। সেন্টমার্টিন দ্বীপের জাহাজ জেটি এবং টেকনাফ জাহাজ জেটি থেকে সরাসরি ঢাকায় আসার বিভিন্ন বাসের টিকেট পাওয়া যায়। আপনার পছন্দের বাসে বাড়ির পথে রওনা দিয়ে দিন। অথবা যদি কক্সবাজার যেতে চান তাহলে টেকনাফ থেকে বাসে বা সিএনজতে কক্সবাজার চলে যেতে পারবেন।

সেন্টমার্টিন দ্বীপ ট্যুর প্ল্যান
ছবি: ভ্রমণ গাইড

সেন্টমার্টিন ট্যুর প্ল্যান ২ : তিন দিন দুই রাত

ঢাকা থেকে রাত ৮ টার মধ্যে বাসে রওনা দিয়ে পরদিন সকাল ৯ টার মধ্যে টেকনাফ জাহাজ জেটিতে এসে টিকেট কাউন্টার হতে কত দিন সেন্টমার্টিনে থাকবেন সেটা জানিয়ে সেন্টমার্টিনগামী পছন্দের জাহাজের টিকেট সংগ্রহ করে নিন (যদি আগে টিকেট করা না থাকে)। জাহাজে করে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন যেতে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘন্টা।

প্রথম দিন

সব ঠিক থাকলে দুপুর ১২ টা থেকে সাড়ে ১২ টার মধ্যেই সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৌঁছে যাবেন। সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৌঁছে হোটেল ঠিক করে দুপুরের খাবার খেয়ে আলস্য মেখে বিশ্রাম নিয়ে বিকেল বেলা আড্ডায় কাটিয়ে দিন। এই সময়টা পশ্চিম বিচে হেঁটে হেঁটে গল্প গুজব করে কাটিয়ে দিতে পারেন। রাতের বেলায় রিসোর্টে বলে অথবা হোটেল থেকে ফিশ বারবিকিউ এর আয়োজন করে নিতে পারেন।

দ্বিতীয় দিন

দ্বিতীয় দিন সকালে অথবা বিকেলের সময়টা ঠিক করে রাখুন ছেঁড়া দ্বীপ ভ্রমণের জন্যে। তবে ছেঁড়া দ্বীপে বিকেলে গেলেই সবচেয়ে ভাল লাগবে। সেই ক্ষেত্রের সকালের সময়টা দ্বীপে হেঁটে চারপাশ ঘুরে অথবা সাইকেল ভাড়া করে ঘুরে দেখতে পারেন। হেঁটে হেঁটে দ্বীপ ঘুরে দেখতে ৩-৪ ঘন্টা লাগবে।

দুপুরে সমুদ্রে গোসল করে খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে চলে যান জাহাজ ঘাটে। সেখান থেকে ট্রলার বা বোটে করে যাবেন ছেঁড়া দ্বীপে। ছেঁড়া দ্বীপে বিকেল সময়টা কাটিয়ে সুর্যাস্ত দেখতে দেখতে ফিরে আসুন।

যদি কেনাকাটা করতে চান তাহলে সন্ধ্যার সময়টা সেন্টমার্টিন বাজারে কাটিয়ে ফিরে আসুন নিজের রিসোর্টে। রাতে ক্যাম্পিং কিংবা বারবিকিউ এর আয়োজন করে ফেলুন। সাগর পাড়ের এই রাত আড্ডা আপনার মনকে আজীবন তৃপ্ত করবে।

তৃতীয় দিন

সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে বিদায়ী সমুদ্র স্নানের পর ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকুন। ৩ টার আগে জাহাজে চড়ে বসুন। সেন্টমার্টিন দ্বীপের জাহাজ জেটি এবং টেকনাফ থেকে সরাসরি ঢাকায় আসার বিভিন্ন বাস পাওয়া যায়। আপনার পছন্দের বাসে বাড়ির পথে রওনা দিয়ে দিন। অথবা যদি কক্সবাজার যেতে চান তাহলে টেকনাফ থেকে বাসে বা সিএনজতে কক্সবাজার চলে যেতে পারবেন।

সেন্টমার্টিন ভ্রমণ খরচ

যে কোন ভ্রমণে খরচ কত হবে তা সম্পূর্ণই আপনার উপর নির্ভর করবে। আপনি কিভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন, কি খাবেন ও কি করবেন সেইসব বিষয়ের সাথে কোন সময় যাচ্ছেন তার উপরেও খরচ নির্ভর করে। পিক সিজন (ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারী) বা ছুটির দিন গুলোতে থাকা খাওয়া সহ অন্যান্য খরচ একটু বেশিই হবে। কম খরচে ও মোটামুটি মানের হোটেলে ১ রাত থাকা ও খাওয়া সহ ঢাকা থেকে সেন্টমার্টিন ভ্রমণে কত খরচ হবে তার একটা ধারণা দেবার জন্যে খরচের তালিকা দেওয়া হলো। যা থেকে আপনি কিছুটা হলেও খরচ সম্পর্কে ধারণা করতে পারবেন।

যাতায়াত খরচ

বাসের টিকেট – যাওয়া ও আসা সহ ১,৮০০ টাকা (নন এসি), ৩,১০০-৩,৪০০ টাকা (এসি)।
শিপ/জাহাজ ভাড়া – যাওয়া ও আসা সহ ৬০০-৮০০ টাকা (ওপেন ডেক), ১০০০-১৬০০ টাকা (এসি)।
ছেড়া দ্বীপ – ট্রলারে যাওয়া আসা ২০০ টাকা।
লোকাল যাতায়াত – সেন্টমার্টিনের বাজারে কিংবা আশেপাশে যাওয়ার ভ্যান ভাড়া ১৫০-২০০ টাকা।
অন্যান্য খরচ – ২০০টাকা।

খাবার খরচ

যাত্রার দিন – যাত্রা বিরতিতে রাতের খাবার ১০০-২০০ টাকা।
১ম দিন – নাস্তা ৬০-১০০ টাকা, দুপুরে ১২০-২২০ টাকা ও রাতের খাবার/বার বি কিউ ২০০-৩০০ টাকা।
২য় দিন – নাস্তা ৬০-১০০ টাকা, দুপুরের খাবার ১২০-২২০ টাকা।
ফিরে আসার দিন – যাত্রা বিরতিতে রাতের খাবার ১০০-২০০ টাকা।

চাইলে আরও কম খরচে খাওয়া দাওয়া করা সম্ভব। বাজারের ভিতরের দিকে হোটেল গুলোতে গিয়ে সাধারণ খাবার খেলে খরচ অনেক কমে যাবে।

থাকার খরচ

স্ট্যান্ডার্ড হোটেল/রিসোর্ট ডাবল বেড ১২০০-২০০০ টাকা। বাজারের দিকে মোটামুটি মানের হোটেল ৮০০-১২০০ টাকা। খুবই পিক সিজন আর সরকারি ছুটির দিনে ভাড়া আরও একটু বেড়ে যাবে। এই ক্ষেত্রে সমুদ্রের কাছের বা একটু ভালো রিসোর্ট থাকতে রুম প্রতি ২০০০-২৫০০ টাকা লাগবে। বেশিরভাগ রুমে ডাবল বেড থাকে। এক রুমে কয়েকজন মিলে থাকলে খরচ ভাগ হয়ে কমে যাবে। পিক সিজন ও ছুটির দিন ছাড়া গেলে খরচ আরও কম হবে। এছাড়া আরও কম খরচে থাকতে চাইলে স্থানীয় মানুষদের বাড়িতে অল্প টাকায় থাকতে পারবেন, এ জন্যে একটু খুঁজে ও কথা বলে দেখতে হবে।

প্রয়োজনীয় তথ্য

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।