ঢাকার বেড়ানোর জায়গা পর্ব এক এর ধারাবাহিকতায় আজ আমরা আবারও ঢাকার দর্শনীয় স্থান গুলো নিয়ে লিখছি। ব্যস্ততার ফাঁকে আমরা অনেকেই ছুটির দিন গুলোতে পরিবার পরিজন বা বন্ধু বান্ধব নিয়ে ঢাকার সুন্দর জায়গা গুলোতে একটু সময় কাটাতে চাই। যেখানে পাওয়া যাবে একটু শান্তির পরশ বা আমাদের ঐতিহ্য ও গৌরব উজ্জল ইতিহাসের হাতছানি। এমন সব সুন্দর ও ঐতিহাসিক ৮টি জায়গা নিয়েই আমাদের ঢাকায় ঘোরাঘুরির জায়গা নিয়ে এই দ্বিতীয় পর্ব। প্রথম পর্ব পড়ুন এইখানে: ঢাকায় বেড়ানোর জায়গা

৯। জাতীয় স্মৃতিসৌধ

sriti-shoudho-dhaka-vromon-guide
জাতীয় স্মৃতিসৌধ

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী সকল বীর শহীদদের স্মৃতির স্মরণে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। প্রায় ৪৪ হেক্টর জায়গা নিয়ে সাভার উপজেলায় স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্স স্থাপন করা হয়েছে। স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেনের নকশায় ১৯৮২ সালের শেষের দিকে স্মৃতিসৌধের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। জাতীয় স্মৃতিসৌধের মূলকাঠামো সাত জোড়া ত্রিভূজাকৃতির দেয়াল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। স্মৃতিসৌধের সাত জোড়া স্তম্ভ বা দেয়াল ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, শাসনতন্ত্র আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ। জাতীয় স্মৃতিসৌধে প্রবেশের জন্য কোনরকম অর্থ পরিশোধ করতে হয় না। দর্শনার্থীদের পরিদর্শনের জন্য প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জাতীয় স্মৃতিসৌধ খোলা থাকে। বিস্তারিত পড়ুন জাতীয় স্মৃতিসৌধ ভ্রমণ গাইড থেকে।

১০। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

dhaka-university-vromon-guide
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১ সালে প্রতিষ্টিত হয়। হাজারো শিক্ষার্থীর প্রাণের এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ৬০০ একর জমির উপর গড়ে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে অসংখ্য বৃক্ষ, পুকুর, ফুলের বাগান এবং পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা স্থাপত্য শিল্পের অনন্য নিদর্শন হয়ে থাকার মত সুউচ্চ বহু দালান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে বাংলাদেশের বিভিন্ন গৌরবোজ্জল অধ্যায়ের সাক্ষী বিভিন্ন স্থাপনা এবং বিভিন্ন ভাস্কর্য্য, যার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে কার্জন হল, কলা ভবন, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, তিন নেতার মাজার, চারুকলা ইন্সটিটিউট, বকুল তলা, কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবর, বাংলা একাডেমি, শহীদ মিনার, ডাকসু ভবন, টিএসসি, অপরাজেয় বাংলা ও রাজু ভাস্কর্য্য, দোয়েল চত্ত্বর, মধুর কেন্টিন, হাকিম চত্ত্বর, মুক্তি ও গণতন্ত্র তোড়ন।

১১। ফ্যান্টাসি কিংডম

fantasy-kingdom-dhaka-vromon-guide
ফ্যান্টাসি কিংডম

সাভারের আশুলিয়ার জামগড়ায় ২০ একর জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ফ্যান্টাসী কিংডম। রোলার কোস্টার, শান্তা মারিয়া, ম্যাজিক কার্পেটসহ বিশ্বের জনপ্রিয় সকল অনেক রাইড রয়েছে এই বিনোদন কেন্দ্রে। তবে ওয়াটার কিংডম হচ্ছে এখানকার প্রধান আকর্ষণ। ওয়াটার কিংডমে আনন্দময় ১১টি রাইড ছাড়াও রয়েছে কৃত্রিম সমুদ্র সৈকত ওয়েবপুল, স্লাইড ওয়ার্ল্ড, টিউব স্লাইড ও বিশাল সুইমিং পুল। এছাড়াও লেজি রিভার, ওয়াটার ফল, ডুম স্লাইড, লস্ট কিংডম, প্লে জোন, ড্যান্সিং জোনের মতো মজারসব রাইডও আছে এখানে। ফ্যান্টাসী কিংডম সপ্তাহের ৭ দিনই খোলা থাকে। সাধারন দিনগুলোতে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকলেও সরকারী ছুটির দিনে সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পার্কটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। বিস্তারিত পড়ুন : ফ্যান্টাসি কিংডম ভ্রমণ গাইড।

১২। নন্দন পার্ক

nandan-park-dhaka-vromon-guide
নন্দন পার্ক

সাভারের নবীনগর-চন্দ্রা হাইওয়ের বাড়ইপাড়া এলাকায় প্রায় ৩৩ একর জমির উপর ২০০৩ সালের অক্টোবর থেকে নন্দন থিম পার্কের যাত্রা শুরু। নন্দন থিম পার্কের সবুজ বৃক্ষরাজি অন্যান্য পার্ক থেকে একে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানের রাইড, মানসম্পন্ন খাবারের দোকান ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সত্যিই ভ্রমনকারীদের বারংবার নন্দন পার্কে আসার ইচ্ছা জাগায়। সাথে রয়েছে সুনিশ্চিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও হকার মুক্ত পরিবেশ। আকর্ষনীয় রাইডগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যাবল কার, ওয়েব পুল, জিপ স্লাইড, রক ক্লাইমরিং, রিপলিং, মুন রেকার, কাটার পিলার, ওয়াটার কোস্টার, আইসল্যান্ড, প্যাডেল বোট। এছাড়া রয়েছে ওয়াটার ওয়ার্ল্ড। প্রতিদিন সকাল ১১ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শুধুমাত্র শুক্রবার সকাল ১০ টা থেকে রাত ৮ ট পর্যন্ত খোলা থাকে। বিস্তারিত পড়ুন: নন্দন পার্ক ভ্রমণ।

১৩। বোটানিক্যাল গার্ডেন

botanical-garden-dhaka-vromon-guide
বোটানিক্যাল গার্ডেন

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান (বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম) বোটানিক্যাল গার্ডেন (Botanical Garden) হিসেবে অধিক পরিচিত। মিরপুরে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার পাশেই বোটানিক্যাল গার্ডেনের অবস্থান। ২০৮ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত এই জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে প্রায় ৮০০ প্রজাতির বিভিন্ন বৃক্ষ রয়েছে। এই সব বৃক্ষরাজির মধ্যে রয়েছে নানান ধরনের ফুল, ফল, বনজ এবং ঔষধি গাছ। বোটানিক্যাল গার্ডেনে ফুলের বাগান ছাড়াও রয়েছে পুকুর, দীঘি ও ঘাসে ঢাকা সবুজ মাঠ। রাজধানী ঢাকা শহরের ভেতরে সবুজের রাজ্যে ভ্রমণের জন্য বোটানিক্যাল গার্ডেন অনন্য। তাই প্রতি বছর হাজার হাজার দর্শনার্থী এখানে বেড়াতে আসেন। আরও বিস্তারিত জানতে পড়ুন বোটানিক্যাল গার্ডেন ভ্রমণ গাইড।

১৪। মিরপুর চিড়িয়াখানা

bangladesh-national-zoo-dhaka-vromon-guide
চিড়িয়াখানা

ঢাকার প্রাণকেন্দ্র হতে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে মিরপুরে বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশে ১৯৭৪ সালে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় ঢাকা চিড়িয়াখানা। ২০১৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা চিড়িয়াখানা নামে পরিচিতি পাওয়া এই প্রাণী সংরক্ষনাগারকে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা নামকরণ করা হয়। দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্য এখানে স্থান পেয়েছে বিভিন্ন বিলুপ্তপ্রায় ও দূর্লভ প্রাণীকুল। এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির বন্য প্রাণী সংগ্রহ, প্রজনন, সংরক্ষণ, শিক্ষা-গবেষণা এবং গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানায় ১৯১ প্রজাতির ২১৫০টি প্রাণী সংরক্ষিত রয়েছে। এদের মধ্যে ৪৪৭ টি স্তন্যপায়ী, ৬১ টি সাপ ও সরিসৃপ, ৯৯২ টি পাখি এবং ৭৯৭ টি মাছ রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার অভ্যন্তরে রয়েছে ১৩ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত দুটি লেক। আরও বিস্তারিত জানতে পড়ুন জাতীয় চিড়িয়াখানা ভ্রমণ গাইড।

১৫। হাতিরঝিল

hatirjheel-vromon-guide
হাতিরঝিল

হাতিরঝিল (Hatirjhil) রাজধানী ঢাকার একটি এলাকা, যা নগরবাসীর বিনোদনের জন্য মনোরম এক বিনোদন কেন্দ্র হিসাবে বেশ সুনাম অর্জন করেছে। হাতিরঝিল পরিবেশ ও নান্দনিকতায় খুব সহজেই নগরবাসীর মনে জায়গা করে নিয়েছে। হাতিরঝিলে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন সেতু, চমৎকার শ্বেতশুভ্র সিঁড়ি এবং নজরকাড়া ফোয়ারা। এখানে ঝিলের জলে পালতোলা নৌকায় করে নৌবিহার করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়াও হাতিরঝিলকে ঘিরে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, শিশুপার্ক, বিশ্বমানের থিয়েটার এবং শরীর চর্চা কেন্দ্র।

১৬। দিয়াবাড়ি

diabari-vromon-guide
উত্তরা দিয়াবাড়ি

প্রকৃতির অপার মাধুর্য্য নিয়ে সুসজ্জিত ঢাকার উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত দিয়াবাড়ি। শুভ্রতায় পরিপূর্ণ দিয়াবাড়ি যেন এক মেঘের রাজ্য। বিশেষ করে শরৎকালে দিগন্তজোড়া কাশফুল দেখে মনে হয় যেন মেঘ পায়ের কাছে এসে লুকোচুরি করছে। কাশফুল, রোদ আর মেঘের খেলা মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে এখানে আগত দর্শনার্থীদের। ইট, কাঠ ও কংক্রিটের এই নগরে এক মুঠো প্রশান্তির আশায় ছুটে আসা নগরবাসীর কাছে উত্তরা দিয়াবাড়ি যেন আলাদীনের চেরাগ। দিয়াবাড়ির বটতলা থেকে কিছুদূর সামনে গেলে একটি ছোট্ট প্রাণহীন নদী চোখে পড়ে। তুরাগ নদীর এই শাখার উপর বর্তমানে নির্মাণ করা হয়েছে একটি নান্দনিক সংযোগ সেতু। নদীতে পরিত্যক্ত নৌকা আর জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ততা এবং রোমাঞ্চকর পরিবেশে অনায়াসেই কাটিয়ে দেয়া যায় একটি বিকেল।

ঢাকা ভ্রমণ নিয়ে এই আয়োজন আশা করি আপনাদের ভালো লেগেছে। সুন্দর ও ঐতিহাসিক এই জায়গা গুলো ভালো লেগে থাকলে শেয়ার করুন আপনাদের বন্ধুদের সাথে। ঘুরে আসুন প্রিয়জনদের নিয়ে। ঢাকার দর্শনীয় স্থান গুলোর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন মন্তব্যে। আগামী পর্বে থাকবে ঢাকার আরও কিছু সুন্দর ও মনোরম জায়গা নিয়ে ঢাকা ভ্রমণের তৃতীয় পর্ব। সেই পর্যন্ত ভালো থাকুন। হ্যাপি ট্রাভেলিং।

ফিচার ইমেজ : মাহি উন নবী

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।