বাংলাদেশের গর্ব কিংবদন্তি নায়িকা সুচিত্রা সেনের পৈতৃক বাড়ি উত্তরাঞ্চলের পাবনা জেলার গোপালপুরের হেম সাগর লেনে অবস্থিত। এখানেই সুচিত্রা সেনের শৈশব ও যৌবনের স্মৃতিবিজড়িত দিনগুলো কেটেছে। মহানয়িকা সুচিত্রা সেনের পারিবারিক নাম ছিল রমা দাশগুপ্ত (বিবাহোত্তর নাম রমা সেনগুপ্ত)। পাবনা শহরের এই ঐতিহাসিক বাড়িতেই গড়ে তোলা হয়েছে ‘মহানয়িকা সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা’ (Suchitra Sen Memorial Museum)।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের প্রাক্কালে সুচিত্রা সেনের পরিবার পাবনা ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় বাড়িটি বেদখল অবস্থায় ছিল (১৯৮৭ থেকে ইমাম গাজ্জালী ট্রাস্টের দখলে ছিল)। পাবনাবাসী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০১৪ সালের ১৬ জুলাই আদালত ও জেলা প্রশাসনের সহায়তায় বাড়িটি দখলমুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল মহানয়িকার জন্মবার্ষিকীতে সরকারিভাবে অধিগ্রহণকৃত এই পৈতৃক বাড়ি সংস্কার করে ‘সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
বাড়ির সামনে ও পশ্চিম দিকে কিছুটা খোলা উঠান রয়েছে, যেখানে সুন্দর একটি বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। বাগানের ঠিক মাঝখানে সুচিত্রা সেনের একটি শ্বেতশুভ্র আবক্ষ ভাস্কর্য (Bust Sculpture) স্থাপন করা হয়েছে, যা প্রবেশ করতেই দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সংগ্রহশালায় রূপান্তর করার পর বাড়িটির ভেতরের ঘরের দেওয়ালে সুচিত্রা সেন এবং উত্তম কুমারের কালজয়ী বিভিন্ন সিনেমার বিরল স্থিরচিত্র ও পোস্টার টাঙ্গানো হয়েছে। সুচিত্রা সেনের অভিনীত ‘সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’, ‘দীপ জ্বেলে যাই’ প্রভৃতি জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের বিখ্যাত সংলাপ লিখিত আকারে প্রদর্শন করা হয়েছে। এছাড়া এখানে একটি আলমারি, কিছু পুরোনো আসবাবপত্র এবং দর্শনার্থীদের জন্য তাঁর অভিনীত সিনেমা বা ডকুমেন্টারি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে একটি টেলিভিশন আছে।
চলচ্চিত্রপ্রেমী ও পুরোনো সিনেমার অনুরাগীদের কাছে ১০ টাকার এই পরিদর্শন বেশ নস্টালজিক হলেও, সাধারণ পর্যটকদের মনে রাখা ভালো এটি একটি সাধারণ আকারের স্মারক কেন্দ্র। তাই খুব বেশি আধুনিক জাদুঘরের প্রত্যাশা না রেখে ইতিহাস ও মহানয়িকার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এখানে আসা শ্রেয়।
প্রবেশ মূল্য ও প্রদর্শনীর সময়
সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালায় প্রবেশ করতে হলে মাত্র ১০ টাকা দিয়ে টিকেট সংগ্রহ করতে হয়। সংগ্রহশালাটি প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। প্রতি সপ্তাহের সোমবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকে। বিকেলের দিকে হালকা রোদ ও খোলা উঠানের পরিবেশ ভালো উপভোগ করা যায়, তাই দুপুর ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে আসাটা সবচেয়ে সুবিধাজনক।
কিভাবে যাবেন
ঢাকার গাবতলী বা মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে শ্যামলী, পাবনা এক্সপ্রেস, সিডি লাইন বা সরকার পরিবহনের বাসে করে সরাসরি পাবনা বাস টার্মিনাল বা ইন্দারা মোড়ে নামা যায়। পাবনা শহরের যেকোনো স্থান (যেমন: আব্দুল হামিদ রোড, বাস টার্মিনাল বা স্টেশন) থেকে রিকশা, সিএনজি বা অটোতে করে সরাসরি সুচিত্রা সেনের বাড়িতে চলে আসা যায়। ভাড়া ২০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
কোথায় থাকবেন
পাবনা জেলা সদরে রাত্রিযাপনের জন্য বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল আছে। নিরাপদ ও আরামদায়ক হোটেলের জন্য শহরের আব্দুল হামিদ রোড ও স্টেশন রোড এলাকায় হোটেল প্রবাসী ইন্টারন্যাশনাল, হোটেল মুন, লাকি হোটেল, হোটেল রোহান, হোটেল পার্ক বোর্ডিং ও হোটেল ছায়ানীড় প্রভৃতি আবাসিক হোটেলে উঠতে পারেন। ছুটির দিনে এলে আগে থেকে রুম বুকিং করে রাখা ভালো।
আরও পড়ুনঃ পাবনার জেলার সেরা হোটেল ও রিসোর্ট
কোথায় খাবেন
পাবনা জেলাতে চাইনিজ, বাংলা ও ফাস্টফুড খাবারের অসংখ্য রেস্টুরেন্ট আছে। স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী বাংলা খাবারের জন্য আব্দুল হামিদ রোডের হোটেল প্রামাণিক বা মোসলেম রেস্টুরেন্ট বেশ জনপ্রিয়।
এছাড়া পাবনা জেলা বাঘাবাড়ির খাঁটি ঘি ও সুস্বাদু মিষ্টির জন্য বিখ্যাত। পাবনা শহরে এলে ‘সম্রাট সুইটস’ বা ‘শ্যামলী মিষ্টি’ থেকে ঐতিহ্যবাহী প্যারা সন্দেশ, ছানামুখী এবং বাঘাবাড়ির ঘি চেখে দেখতে বা নিয়ে যেতে ভুলবেন না।
ভ্রমণ সংক্রান্ত যে কোন তথ্য ও আপডেট জানতে ফলো করুন আমাদের ফেসবুক পেইজ এবং জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।
