রাঙ্গামাটি সদর হতে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে শুভলং বাজারের পাশেই শুভলং ঝর্ণার অবস্থান। বাংলাদেশের অন্য সকল ঝর্ণার মত শুভলং ঝর্ণাতেও শুকনো মৌসুমে পানি খুব কম থাকে। বর্ষা মৌসুমে প্রায় ১৪০ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে বিপুল জলধারা কাপ্তাই লেকে আছড়ে পড়ে। এছাড়া শুভলং ঝর্ণা দেখতে যাওয়ার পথের সৌন্দর্য্য আপনাকে আবেগময় করে তুলতে পারে। দুই পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া লেক দেখে থাইল্যান্ড বলে ভ্রম হতে পারে!

শুভলং ঝর্ণার সৌন্দর্য্য পর্যটকদের বিমোহিত করে। পাহাড়ের উপর থেকে পাথুরে মাটিতে ঝর্ণাধারা আছড়ে পড়ার অপূর্ব দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। অতিরিক্ত কাপড় সাথে থাকলে ঝর্ণার শীতল পানিতে স্নান করে শরীর জুড়িয়ে নিতে পারেন। শুভলং ঝর্ণার কাছেই প্রায় ২০০০ ফুট উঁচু ‘শুভলং পাহাড়’ বা ‘টি এন্ড টি পাহাড়’ রয়েছে। পাহাড় চূড়ায় রয়েছে সেনাক্যাম্প ও একটি টিঅ্যান্ডটি টাওয়ার। পাহাড়ে ওঠার জন্য রয়েছে চমৎকার সিঁড়ি। পাহাড়ের উপর থেকে দেখলে মনে হবে সমস্ত রাঙ্গামাটি জেলা কাপ্তাই লেকের পানির উপর ভেসে আছে।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা হতেঃ ঢাকার ফকিরাপুল মোড় ও সায়দাবাদে রাঙ্গামাটিগামী অসংখ্য বাস কাউন্টার রয়েছে। এই বাসগুলো সাধারণত সকাল ৮ টা থেকে ৯ টা এবং রাত ৮ টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ১১ টার মধ্যে ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে ছাড়ে। ঢাকা টু রাঙ্গামাটি শ্যামলীর এসি বাসের প্রতি সীট ভাড়া ৯০০ টাকা, বিআরটিসি এসি বাসের ভাড়া ৭০০ টাকা। এছাড়া সকল নন-এসি বাসের ভাড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে।

চট্টগ্রাম হতেঃ চট্টগ্রাম শহরের অক্সিজেন মোড় থেকে রাঙ্গামাটিগামী বিভিন্ন পরিবহণের লোকাল ও গেইটলক/ডাইরেক্ট বাস পাওয়া যায়। ভাড়া একটু বেশি হলেও গেইটলক বা ডাইরেক্ট বাসে উঠা উচিত। চট্টগ্রাম হতে রাঙ্গামাটি ডাইরেক্ট বাস ১৫০ টাকার মধ্যে পেয়ে যাবেন।

রাঙামাটির রিজার্ভ বাজারনথেকে শুভলং যাবার নৌকা সারাদিনের জন্য ভাড়া করুন। সারাদিনের জন্যে ভাড়া করলে শুভলং ঝর্ণা ছাড়াও অন্যান্য দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে পারবেন। এখানে সাধারণত নৌকার সাইজের উপর ভাড়া কম বেশি হয়ে থাকে। তবে মোটামুটি সাইজের একটা নৌকা ১০০০-১৫০০ টাকার মধ্যে ভাড়া করা যায়। ১০-১৫ জন যাওয়া যায় এক নৌকাতে। শুভলং ঝর্ণা পর্যন্ত যেতে দেড় থেকে দুই ঘন্টা সময় লাগে। লেকের মধ্যে দেখার মত আরো ৭-৮ টা জায়গা আছে। সময় থাকলে সবগুলো ঘুরে দেখে নিন। এছাড়া যদি ভ্রমণসঙ্গী এত জন না থাকে তাহলে রিজার্ভ বাজার থেকে জনপ্রতি প্যাকেজে ঘুরে আসতে পারবেন দর্শনীয় স্থানগুলো।

থাকা ও খাওয়া

শুভলং এলাকায় থাকা ও খাওয়ার জন্য কোন ভাল ব্যবস্থা নেই। তাই আপনাকে দিনে গিয়ে দিনেই রাঙ্গামাটি ফিরে আসতে হবে। প্রয়োজনে হালকা খাবার সাথে নিয়ে ভ্রমণ করুন। বোট নিয়ে যদি পেডা টিং টিং এ যান তাহলে সেখানে খেতে পারবেন।

রাঙ্গামাটিতে বিভিন্ন মানের গেষ্ট হাউজ ও আবাসিক হোটেল রয়েছে। রাঙ্গামাটি শহরের পুরাতন বাস স্ট্যন্ড ও রিজার্ভ বাজার এলাকায় লেকের কাছাকাছি হোটেল ঠিক করার চেষ্টা করুন। তাহলে হোটেল থেকে কাপ্তাই লেকের পরিবেশ ও শান্ত বাতাস উপভোগ করতে পারবেন। এছাড়া কম খরচে থাকতে বোডিং এ যোগযোগ করতে পারেন। বোডিংগুলোতে থাকতে খরচ কম হলেও এগুলোর অবস্থা খুব একটা ভাল নয়। উল্লেখযোগ্য কিছু আবাসিক হোটেলের নামঃ

হোটেল গ্রিন ক্যাসেল : রিজার্ভ বাজারে অবস্থিত এ হোটেলে নন-এসি সিঙ্গেল বেড, ডাবল বেড ও ত্রিপল বেডের রুমের ভাড়া যথাক্রমে ৮০০, ১০০০ ও ১২০০ টাকা। এসি কাপল বেড রুম পাবেন ১৬০০ টাকায় ও এসি ত্রিপল বেড রুম পাবেন ২০০০ টাকাইয়। যোগাযোগঃ ০১৭২৬৫১১৫৩২, ০১৮১৫৪৫৯১৪৬

পর্যটন মোটেল : রাঙ্গামাটি ঝুলন্ত ব্রিজের পাশে অবস্থিত এ হোটেলটিতে নন-এসি ডাবল বেডের রুম পেতে ১০০০-১২০০ টাকা গুনতে হবে। আর এসি ডাবল বেড পাবেন ১৫০০-১৮০০ টাকায়। যোগাযোগঃ ০৩৫১-৬৩১২৬

রংধনু গেস্ট হাউজ : এই গেস্ট হাউজে ফ্যামিলি বেড বা কাপল বেড ভাড়া নিতে খরচ পড়বে যথাক্রমে ৬৫০ ও ৫০০ টাকা। যোগাযোগঃ ০১৮১৬৭১২৬২২, ০১৭১২৩৯২৪৩০

হোটেল সুফিয়া : ফিসারী ঘাট, কাঁঠালতলী। যোগাযোগঃ ০১৫৫৩৪০৯১৪৯

হোটেল আল-মোবা : নতুন বাস স্টেশন, রিজার্ভ বাজার। যোগাযোগঃ ১৮১১৯১১১৫৮

রাঙ্গামাটি জেলার জনপ্রিয় সকল হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্ট হাউজের তথ্য জানতে পড়ুন রাঙ্গামাটি হোটেল ও রিসোর্ট গাইড

আশেপাশে দর্শনীয় স্থান

এছাড়া রাঙ্গামাটি জেলায় আরো যেসমস্ত আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় স্থান রয়েছেঃ ঝুলন্ত ব্রিজ, কাপ্তাই লেক, ইকো পার্ক, উপজাতীয় জাদুঘর, ঝুম রেস্তোরা, টুকটুক ইকো ভিলেজ, যমচুক, নির্বাণপুর বন ভাবনা কেন্দ্র, রাজবন বিহার, ঐতিহ্যবাহী চাকমা রাজবাড়ি, পেদা টিং টিং, উপজাতীয় টেক্সটাইল মার্কেট, নৌ-বাহিনীর পিকনিক স্পট, রাজস্থলী ঝুলন্ত সেতু, ফুরমোন পাহাড়, সাজেক ভ্যালি, আর্যপুর ধর্মোজ্জ্বল বনবিহার, ডলুছড়ি জেতবন বিহার, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র, কাট্টলী বিল ও ন-কাবা ছড়া ঝর্না ইত্যাদি।

ভ্রমণ টিপস ও সতর্কতা

  • শুভলং ঝর্ণার পূর্ণ রূপ দেখতে হলে বর্ষাকাল বা তার পরের সময়ে যান।
  • শীতকালে সাধারণত ঝর্ণায় খুব অল্প পানি থাকে।
  • একসাথে দলগত ভাবে গেলে খরচ কমে যাবে।
  • অফসিজনে ও ছুটির দিন ব্যাতিত গেলে খরচ কম হবে।
  • ট্রলার/বোট রিজার্ভ করার সময় কি দেখবেন কোথায় যাবেন ভালো মত বলে নিন।
  • রিজার্ভ করার সময় ঠিকমত দরদাম করে নিন।
  • লেকের কাছাকাছি কোন হোটেল ঠিক করার চেষ্টা করুন।
  • কোথাও কোথাও লেকের পানির গভীরতা অনেক, নামতে চাইলে মাঝিকে জিজ্ঞেস করে নিন।
  • সাতার না জানলে সাথে লাইফ জ্যাকেট রাখুন।
  • একদিনেই কমন স্পট গুলো ঘুরে বেড়ানো যায়।
  • পরিবেশে ও জীববৈচিত্রের ক্ষতি হয় দয়া করে এমন কিছু করবেন না।
  • স্থানীয় মানুষদের সাথে শালীন আচরণ করুন।

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।