সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা এক রূপালী জলধারা, যার পতনের শব্দে কেঁপে ওঠে তিন্দুর গভীর অরণ্য প্রকৃতির এক আদিম, বন্য এবং রোমাঞ্চকর বিস্ময়ের নাম শৈনগং ঝর্ণা (Shoingong Waterfall)। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য জেলা বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু জোনের এক দুর্গম ও গভীর অরণ্যে এই ঝর্ণাটি অবস্থিত। বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে তিন্দুর ছাওদাং পাড়া থেকে প্রায় ২ থেকে ২.৫ ঘণ্টার হাঁটা দূরত্বে ক্যাসকেড আকৃতির এই নয়নাভিরাম ঝর্ণার অবস্থান। মারমা আদিবাসীদের ভাষায় ‘শৈনগং’ শব্দের অর্থ পাথুরে পানির গান। বর্ষায় এর রুদ্ররূপ এবং শীতে এর শান্ত স্নিগ্ধ রূপ ট্র্যাকার ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে এক স্বপ্নের গন্তব্য। যদি আপনি শহুরে কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে একদম আদিম প্রকৃতির ছোঁয়া পেতে চান, তবে এই ঝর্ণার ট্রেইল আপনাকে এক মায়াবী অনুভূতিতে আচ্ছন্ন করে রাখবে।
শৈনগং ঝর্ণা ভ্রমণের সেরা সময়
শৈনগং ঝর্ণার প্রকৃত রূপ এবং পানির গর্জন দেখতে হলে আপনাকে ভ্রমণের সময়টি খুব সতর্কতার সাথে নির্বাচন করতে হবে। বছরের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এই ট্রেইলের রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায়।
জুন থেকে অক্টোবর বর্ষাকাল এবং বর্ষা-পরবর্তী সময় হলো শৈনগং ঝর্ণা দেখার সেরা সময়। এই সময়ে ঝর্ণায় পানির প্রবাহ থাকে সবচেয়ে বেশি এবং চারপাশের পাহাড়গুলো সতেজ সবুজ রূপ ধারণ করে। তবে মনে রাখবেন, বর্ষায় পাহাড়ে হঠাৎ ফ্লাশ ফ্লাড (আকস্মিক পাহাড়ি ঢল) দেখা দিতে পারে। ঢল নামলে পাহাড়ি ঝিরিপথ ও সাঙ্গু নদীর পানি মুহূর্তেই বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায় এবং ট্রেইলটি অত্যন্ত পিচ্ছিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এছারা নভেম্বর থেকে মার্চ শীতকালে ঝর্ণার পানি অনেক কমে যায়, তবে ট্র্যাকিং করা বেশ সহজ হয়। আপনি যদি ট্রেইলের অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসেন এবং শান্ত পরিবেশ পছন্দ করেন, তবে এই সময়ে যেতে পারেন।
কিভাবে যাবেন
শৈনগং ঝর্ণা দেখতে হলে আপনাকে প্রথম বান্দরবান আসতে হবে। শৈনগং ঝর্ণা দেখতে যাওয়ার রুটঃ ঢাকা > বান্দরবান > থানচি > তিন্দু (নৌপথ) > শৈনগং ঝর্ণা
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে সরাসরি বান্দরবানের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। নন-এসি বাসের ভাড়া সাধারণত ৮৭০ থেকে ৯৫০ টাকা এবং এসি বাসের (যেমন: শ্যামলী, সেন্টমার্টিন ট্রাভেলস, সৌদিয়া) ভাড়া ১,৫০০ থেকে ১,৮০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
আরও পড়ুনঃ ঢাকা থেকে বান্দরবান যাওয়ার বিস্তারিত উপায়
বান্দরবান থেকে থানচিঃ বান্দরবান শহরের থোয়াইঙ্গ্যা পাড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে প্রতি এক ঘণ্টা পর পর থানচির বাস ছাড়ে, যার ভাড়া জনপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা (সময় লাগে প্রায় ৩.৫ থেকে ৪ ঘণ্টা)। তবে আপনি যদি পরিবার বা গ্রুপ নিয়ে আরামদায়ক ভ্রমণ চান, তবে ৪,৫০০ থেকে ৬,০০০ টাকায় একটি চান্দের গাড়ি (জিপ) রিজার্ভ করে সরাসরি থানচি চলে যেতে পারেন।
থানচি থেকে তিন্দুঃ থানচি ঘাটে পৌঁছে আপনাকে প্রথমে গাইড বুক করতে হবে এবং বিজিবি (BGB) ও আর্মি ক্যাম্প থেকে লিখিত পারমিশন নিতে হবে। পারমিশন পাওয়ার পর থানচি ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা (নৌকা প্রতি আপ-ডাউন ভাড়া ৪,০০০ থেকে ৫,৫০০ টাকা, যেখানে ৪-৫ জন বসতে পারে) নিয়ে সাঙ্গু নদীর বুক চিরে তিন্দু মুখে পৌঁছাতে হবে। খরস্রোতা সাঙ্গু নদী পার হয়ে তিন্দু পৌঁছাতে সময় লাগবে প্রায় ১.৫ থেকে ২ ঘণ্টা।
তিন্দু থেকে ছাওদাং পাড়া হয়ে শৈনগং ঝর্ণা (ট্র্যাকিং): তিন্দু ঘাটে নৌকা থেকে নেমে আপনাকে মূল ট্র্যাকিং শুরু করতে হবে। প্রথমে তিন্দু থেকে হেঁটে মারমা অধ্যুষিত ছাওদাং পাড়ায় (Chaodang Para) পৌঁছাতে হবে। ছাওদাং পাড়াকে শৈনগং ঝর্ণার মূল বেসক্যাম্প বলা চলে। এই ছাওদাং পাড়া থেকে ছোট-বড় ঝিরিপথ ও পিচ্ছিল পাথুরে ট্রেইল ধরে হেঁটে শৈনগং ঝর্ণার পাদদেশে পৌঁছাতে সাধারণত ২ থেকে ২.৫ ঘণ্টা সময় লাগে।
কোথায় থাকবেন
শৈনগং ঝর্ণাটি তিন্দুর গভীর অরণ্যে হওয়ায় ঝর্ণার আশেপাশে থাকার কোনো হোটেল বা রিসোর্ট নেই। তাই আপনাকে তিন্দু মুখে অথবা থানচি সদরে থাকতে হবে। প্রিমিয়াম/ইকো-রিসোর্টে থাকতে চাইলে বিজিবি নিয়ন্ত্রিত সীমান্ত অবকাশ রিসোর্ট অথবা থানচি কটেজে থাকতে পারবনে। ভাড়া লাগবে ৩,৫০০ থেকে ৬,০০০ টাকা জনপ্রতি।
কোথায় খাবেন
ভ্রমণের এই রুটে খাবারের বৈচিত্র্য মূলত স্থানীয় আদিবাসী খাবারের ওপর নির্ভরশীল। তিন্দু মুখে থাকার মাচাং ঘরে বা স্থানীয় মারমা পাড়ায় আগে থেকে অর্ডার করলে ওলন্দাজ মুরগি (পাহাড়ি মুরগি), জুমের চালের ভাত, কচি বাঁশ কোড়ল (বাঁশ কোড়ল ভাজি) এবং পাহাড়ি ডাল দিয়ে দুপুরের বা রাতের খাবারের ব্যবস্থা করা যায়। জনপ্রতি খরচ পড়বে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে।
কাছাকাছি আরও দেখতে পারেন
শৈনগং ঝর্ণার ট্রেইলে এলে একই সাথে তিন্দু ও বড়পাথর জোনের কাছাকাছি অবস্থিত বিখ্যাত লাংলোক ঝর্ণা (Langlok Waterfall) ঘুরে আসা সম্ভব। স্থানীয় মারমা ভাষায় এটি ‘লাংলোক ক্রং’ নামেও পরিচিত। শৈনগং ঝর্ণার ট্র্যাকিং শেষ করে বা একই পথে সময় একটু হাতে রেখে বাড়তি ১ থেকে ১.৫ ঘণ্টা হেঁটে পাহাড়ি বুনো ট্রেইল ধরে এই সুউচ্চ এই ঝর্ণায় যাওয়া যায়। আপনি যদি সকাল সকাল তিন্দু থেকে ট্র্যাকিং শুরু করেন, তবে অভিজ্ঞ স্থানীয় গাইডের সাহায্য নিয়ে একই দিনে শৈনগং ও লাংলোক—দুটি ঝর্ণারই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করে সন্ধ্যায় তিন্দু বা থানচিতে ফিরে আসতে পারবেন।
ভ্রমণ সংক্রান্ত যে কোন তথ্য ও আপডেট জানতে ফলো করুন আমাদের ফেসবুক পেইজ এবং জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।
