রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত বাংলাদেশের একটি অন্যতম ঐতিহাসিক স্থানের নাম রায়ের বাজার। মুঘল আমলে তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত রায়ের বাজার মৃৎশিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকে জনবসতি শুরু হয়। লালমাটির সহজলভ্যতা এবং নদী পথে পরিবহণ ব্যয় কম হওয়ার কারনে এই অঞ্চলের বেশীরভাগ কুমোর রায়েরবাজার বসবাস করতেন। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, মুঘল আমলে রায়ের বাজারকে ‘কুমারতলী’ নামে ডাকা হতো।

বর্তমানে রায়ের বাজারের সাথে জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াল স্মৃতি। মুক্তিযুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর রাতের আধারে সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পী, চিকিৎসক, লেখক, প্রকৌশলীসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন পেশার বুদ্ধিজীবিদের ঘর থেকে তুলে নিয়ে যায়। এদের মধ্যে ছিলেন ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, শহিদুল্লাহ কায়সার, ডাঃ ফজলে রাব্বীসহ আরো অনেকে। এরপর বাংলার সূর্য্য সন্তানদের নৃশংসভাবে হত্যা করে তাঁদের লাশ রায়ের বাজারের ইটখোলায় ফেলে রাখে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর রায়েরবাজারের ইটখোলায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পচা গলা লাশের স্থুপ দৃষ্টিগোচর হয়।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিকে স্মরনীয় করে রাখতে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সরকার রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পরবর্তীতে স্থপতি ফরিদউদ্দীন আহমেদ এবং স্থপতি জামি-আল-শফি-র নকশায় ১৯৯৬ সালে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে ১৯৯৯ সালে শেষ হয়।

রায়ের বাজার বধ্যভূমি (Rayer Bazar Bodhyo Bhumi) এলাকাটির আয়তন ৩.৫১ একর। স্মৃতিসৌধের প্রধান অংশে রয়েছে ১৭.৬৮ মিটার উচ্চতা, ০.৯১ মিটার প্রস্থ এবং ১১৫.৮২ মিটার দৈর্ঘ্যের ইটের তৈরি দুই প্রান্ত ভাঙ্গা এবং বাঁকানো একটি দেয়াল। যা ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের মৃতদেহ প্রাপ্তির ইটখোলাকে নির্দেশ করে। আর দেয়ালের ভগ্ন দুইপ্রান্ত বুদ্ধিজীবী হত্যার দুঃখ এবং শোকের গভীরতা নির্দেশ করছে। দেয়ালের দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি বর্গাকৃতির জানালা রয়েছে। জানালা দিয়ে পেছনের আকাশ দেখা যায়। আর এই জানালাটি দেয়ালের শোকের গভীরতা কমিয়ে আশার বাণী বয়ে আনে।

বাঁকা দেয়ালের সামনে রয়েছে একটি স্থির জলাধার, যেখানে পানির নিচ থেকে কালো গ্র্যানাইট পাথরের একটি স্তম্ভ উপরে উঠে এসেছে। যা মুহ্যমান শোকের প্রতীক। এছাড়াও রায়ের বাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ চত্বরে একটি ছোট জাদুঘর, অফিস কক্ষসহ একটি পাঠাগার এবং একটি কবরস্থান নির্মাণের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে।

পরিদর্শনের সময়সূচী ও প্রবেশ টিকেট মূল্য

রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ প্রতিদিন সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত সকল দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। তবে এখানে রাতের বেলায় প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে প্রবেশের জন্য কোন প্রবেশ টিকেটের প্রয়োজন হয় না।

কিভাবে যাবেন

পুরান ঢাকা থেকে রায়ের বাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ দেখতে হলে বাবু বাজার আসতে হবে। বাবু বাজার ব্রীজের কাছে যানজাবিল ব্রাদার্স নামের লোকাল বাসে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে আসা যায়। এছাড়া গাবতলী থেকে যানজাবিল ব্রাদার্সের বাস রয়েছে। অথবা ঢাকার যেকোন স্থান থেকে মোহাম্মদপুরের বাসে চড়ে ধানমন্ডি ১৫ (পুরান) তে নেমে রিক্সা ভাড়া করে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে যেতে পারবেন।

ম্যাপে রায়ের বাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।