দ্বিগন্ত বিস্তৃত জলরাশির বুকে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ পেতে চাইলে চলে যান নিকলী হাওরে (Nikli Haor)। নিকলী হাওর কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলায় অবস্থিত। কিশোরগঞ্জ সদর থেকে নিকলি উপজেলার দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার।

পানিতে দ্বীপের মত ভেসে থাকা ছোট ছোট গ্রাম, স্বচ্ছ জলের খেলা, মাছ ধরতে জেলেদের ব্যস্ততা, রাতারগুলের মত ছোট জলাবন ও খাওয়ার জন্যে হাওরের তরতাজা নানা মাছ। এই সব কিছুর অভিজ্ঞতা পেতে চাইলে নিকলীর অপরূপ হাওর ভ্রমণ আপনার জীবনে মনে রাখার মত একটি ভ্রমণ হিসেবে গেঁথে থাকবে।

ঢাকা বা কিশোরগঞ্জ এর আশেপাশের জেলা গুলো থেকে একদিনেই ঘুরে আসা সম্ভব নিকলী হাওর। নিকলী ভ্রমণ নিয়ে আমাদের ভিডিও গাইড ইউটিউবে দেখুন এই লিংক থেকে নিকলী ভিডিও গাইড। ভিডিওতে উল্লেখিত কিছু তথ্য অনেক আগের, নতুন তথ্য জানতে এই আর্টিকেল পড়ুন। তবে ভিডিওটি দেখলে নিকলী ভ্রমণের অনেক কিছুই দেখার সাথে জানতেও পারবেন।

নিকলী ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

হাওরের পানির রূপ দেখতে চাইলে আপনাকে বর্ষাকাল বা তার পর পর যেতে হবে। তাই নিকলী ভ্রমণের উপযুক্ত সময় জুলাই মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস। এছাড়া বছরের যে কোন সময়ই যেতে পারেন হাওরের ভিন্ন এক রূপ দেখার জন্যে।

নিকলী যাবার উপায়

ঢাকা বা কিশোরগঞ্জ জেলার আশপাশ থেকে একদিনে ঘুরে আসতে পারবেন নিকলী হাওর থেকে। ঢাকা থেকে ট্রেনে বা বাসে এই দুইভাবেই নিকলী হাওরে যেতে পারবেন।

ঢাকা থেকে ট্রেনে যাওয়ার উপায়: ঢাকা হতে ট্রেনে গিয়ে একদিনে ঘুরে দেখতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই আন্তঃনগর এগারো সিন্ধুর প্রভাতী ট্রেনে আসতে হবে। এগারো সিন্ধুর প্রভাতী বুধবার ছাড়া সপ্তাহের বাকি ৬ দিন কমলাপূর ষ্টেশন থেকে সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে বিমানবন্দর, টঙ্গী, নরসিংদী ও ভৈরব ষ্টেশন হয়ে কিশোরগঞ্জ আসে। শ্রেণী অনুযায়ী ট্রেনের টিকেট ভাড়া ১৩৫ থেকে ৩৬৮ টাকা পর্যন্ত।

যদি ট্রেনে আসেন তাহলে সবচেয়ে ভাল হবে কিশোরগঞ্জ সদরে পোঁছার আগের ষ্টেশন গচিহাটা ষ্টেশনে নেমে গেলে। ঢাকা থেকে ট্রেনে রওনা দিয়ে আপনি সকাল ১১ টার মধ্যেই গচিহাটা ষ্টেশনে চলে আসতে পারবেন। ষ্টেশন থেকে ইজিবাইক অথবা সিএনজি দিয়ে সহজেই চলে যেতে পারবেন ১৫ কিলোমিটার দূরের নিকলী বাজারে। ইজিবাইকে জনপ্রতি ৩৫ টাকা অথবা রিজার্ভ নিলে ২৫০-৩০০ টাকা ভাড়ায় নিকলী যেতে সময় লাগবে প্রায় ১ ঘন্টা। সিএনজি রিজার্ভ নিলে খরচ হবে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা আর সময় লাগবে প্রায় ৪০ মিনিট। তবে ঐ দিনই ফিরতে চাইলে যাবার পথে আপনাকে বাসে যেতে হবে।

ঢাকা থেকে বাসে যাওয়ার উপায়: ঢাকা থেকে বাসে নিকলী যেতে চাইলে চাইলে ঢাকার গোলাপবাগ, গুলিস্তান থেকে যাতায়াত ও অনন্যা সুপার বাস অথবা মহাখালী থেকে জলসিড়ি বাসে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলায় প্রথমে আসতে হবে।

প্রতিদিন ভোর ৫:৩০ থেকে কিছুসময় পর পর বাস ছেড়ে যায়। বাসের ভাড়া জনপ্রতি ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। দিনে ঘুরে রাতের মধ্যে ফিরতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই সকাল ৭টার আগেই বাসে রওনা দিতে হবে। যে বাসেই আসেন কিশোরগঞ্জের আগেই কটিয়াদি বাস স্ট্যান্ড নেমে যাবেন।

ঢাকা থেকে কটিয়াদি আসতে অতিরিক্ত জ্যামের কারণে সময় নষ্ট না হলে সময় লাগবে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘন্টা। সেখান থেকে ২২ কিলোমিটার দূরত্বের নিকলী যেতে সিএনজি সবচেয়ে ভালো উপায়। কটিয়াদি বাস স্ট্যান্ডেই সিএনজি পেয়ে যাবেন। রিসার্ভ করে গেলে ভাড়া লাগবে ৩৫০-৪০০ টাকা। লোকাল সিএনজিতে যেতে ভাড়া লাগবে জনপ্রতি ৮০ টাকা। কটিয়াদি হতে সিএনএজিতে নিকলি যেতে সময় লাগবে প্রায় ১ ঘন্টা ২০ মিনিট।

কিশোরগঞ্জ থেকে নিকলী: যদি কিশোরগঞ্জ জেলা শহর থেকে নিকলী যেতে চান তবে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে ষ্টেশনের সংলগ্ন নিকলীগামী সিএনজি ষ্টেশনে চলে আসুন। কিশোরগঞ্জ সদর থেকে নিকলীর দূরত্ব প্রায় ২৭ কিলোমিটার। সিএনজি ষ্টেশন থেকে লোকালে বা রিজার্ভ নিয়ে নিকলী যেতে প্রায় ১ ঘন্টা সময় লাগে। লোকালে যেতে জনপ্রতি ভাড়া ৭০ টাকা আর সিএনজি রিজার্ভ নিতে ৩৫০-৪০০ টাকা ভাড়া লাগে।

ভৈরব থেকে নিকলী: এছাড়া ভৈরব থেকেও লোকাল কিংবা রিজার্ভ সিএনজি নিয়ে নিকলী যাওয়া যায়। লোকালে যেতে জনপ্রতি ভাড়া ১২০ টাকা আর রিজার্ভ নিলে ৬০০ টাকা। ভৈরব থেকে সিএনজিতে নিকলী যেতে সময় লাগবে দেড় ঘন্টার মত।

গচিহাটা, কটিয়াদি বা কিশোরগঞ্জ যেখান থেকেই নিকলী আসেন না কেনো আসার পথের দুইপাশের গ্রাম বাংলার দৃশ্য আপনার ভাল লাগবেই। যতই নিকলীর কাছাকাছি যেতে থাকবেন ততই সুন্দর লাগবে সবকিছু। দুপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতেই কখন যে নিকলী পৌঁছে যাবেন সেটা বুঝতেই পারবেন না।

ট্রেনে আসলে গচিহাটা বা মানিকখালি স্টেশনে নেমে গেলে এবং বাসে আসলে কটিয়াদি নেমে গেলে কম সময় নিকলী যেতে পারবেন।

কোথায় খাবেন

নিকলী যেখানে নামবেন সেখানেই মোটামুটি মানের কয়েকটি খাবার হোটেল আছে। তার মধ্যে হোটেল সেতু, ক্যাফে ঢেউ উল্লেখযোগ্য। হাওরের তাজা মাছের নানা পদ দিয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকায় ভরপেট খেয়ে নিতে পারবেন।

কিভাবে ঘুরবেন

খাওয়া দাওয়া ও প্রয়োজনীয় কাজ সেরে ইজিবাইকে বেড়ি বাঁধের শেষ প্রান্তে চলে আসুন। সেখানে দরদাম করে ঘন্টা প্রতি নৌকা ঠিক করে নিবেন হাওর ঘুরে দেখার জন্যে। ছোট নৌকা ভাড়া করতে ঘন্টা প্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং একটু বড় নৌকা ভাড়া করতে ঘন্টা প্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ হবে। আর একসাথে আপনারা কয়েকজন থাকলে আপনার পছন্দমত নৌকা রিসার্ভ হিসেবে ঠিক করে নিন। এক নৌকায় অনায়াসে ১০-৩০ জন পর্যন্ত উঠতে পারবেন। তবে অবশ্যই দরদাম করে নিবেন।

আপনার হাতে কত সময় আছে সেই হিসেবেই নৌকা ভাড়া করুন। চেষ্টা করুন অন্তত ৩ ঘন্টা যেন হাতে থাকে নৌকা দিয়ে ঘুরার জন্যে। নৌকা দিয়ে হাওরে ভাসতে ভাসতে চারপাশের মোহনীয় রূপ দেখতে প্রথমেই চলে যেতে পারেন ছাতিরচর গ্রামে। সিলেটের রাতারগুলের মত জলাবনের মুগ্ধতা দেখতে দেখতে দু’চোখ জুড়িয়ে নেয়ার পাশাপাশি শীতল জলে গা ঢুবিয়ে শরীর শান্ত করার কাজটা এখানেই সেরে ফেলতে পারেন। তবে ভরা বর্ষায় পানি অনেক বেশি থাকে। তাই গোসল করতে চাইলে সাথে করে লাইফ জ্যাকেট নিয়ে যাওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

জলাবনের সৌন্দর্য দেখে তারপর আবার নৌকা নিয়ে চলে যান চর মনপুরায়। পানি বেশি হলে যদিও ডুবে যায় তবে কম থাকলে আধো ভাসমান এই চরে ঘুরে বেড়াতে পারেন কিছুটা সময়। তারপর উন্মুক্ত হাওরে শেষ বিকেলের সূর্য্য দেখতে দেখতে পূনরায় নিকলী বেড়ি বাঁধে এসে বাড়ি ফেরার পথ ধরতে হবে।

যদি ট্রেনে ঢাকায় ফিরতে চান তাহলে বিকেল ৪টার আগেই গচিহাটা স্টেশনে ফিরতে হবে কিশোরগঞ্জ টু ঢাকার শেষ ট্রেন কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেন ধরার জন্যে। তা না হলে আপনাকে বাসেই ফিরতে হবে। এই জন্যে নিকলী উপজেলা মোড়ে এসে সিএনজি ঠিক করে চলে যান কটিয়াদিতে। কটিয়াদি বাস স্ট্যান্ড থেকে ঢাকা যাবার শেষ বাস ছেড়ে যায় সন্ধ্যা ৭টায়। তাই সময়ে দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন।

নিকলী, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম ট্যুর প্লান

নিকলী ঘুরে দেখার পাশাপাশি আপনি চাইলে মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের হাওর রোড ও ঘুরে দেখার প্ল্যান করতে পারেন। নিকলী থেকে নৌকায় মিঠামইন যেতে সময় লাগে প্রায় ২ ঘন্টা। তাই যাওয়া আসা এবং সেখানে ঘুরে বেড়ানোর সময় আপনার হবে কিনা সেই বিবেচনা করে প্ল্যান করুন। নিকলী ও মিঠামইন হয়ে হাওর রোড দেখতে চাইলে নৌকা রিসার্ভ খরচ ও বেশি হবে।

ঢাকা থেকে একদিনের ট্যুর প্ল্যান

আপনি যদি ঢাকা থেকে সকালের ট্রেনে বা সকালের কোন বাসে রওনা দেন তাহলে একদিনেই নিকলী হাওর দেখে আবার রাতের ভিতর ঢাকায় ফিরে যেতে পারবেন। সেই ক্ষেত্রে সময়ের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাসে আসলে চেষ্টা করতে হবে যত ভোরে রওনা দেওয়া যায়। যে ভাবেই আসেন সারাদিন ঘুরে ফেরার জন্যে আপনাকে বাসেই যেতে হবে। সেই ক্ষেত্রে নিকলী থেকে সিএনজি তে করে কটিয়াদি এসে সেখান থেকে ঢাকা যাওয়ার বাস পাবেন। কটিয়াদি থেকে ঢাকা যাওয়ার শেষ বাসের সময় সন্ধ্যা ৭টা।

থাকার ব্যবস্থা

নিকলীতে বর্তমানে কিছু মোটামুটি মানের আবাসিক হোটেল তৈরি হয়েছে পর্যটকদের কথা ভেবে। এছাড়া সুযোগ থাকলে উপজেলা ডাক বাংলো তে থাকতে পারবেন। আর চাইলে কিশোরগঞ্জ জেলা সদরে গিয়ে সেখানে থাকার বেশ কয়েকটি হোটেল পাবেন। যদি নৌকায় বা ক্যাম্পিং করে রাত পার করতে চান তবে নিরাপত্তার বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় কারও সাহায্য নিতে পারেন।

নিকলীর আরও কিছু দর্শনীয় স্থান

গুরই শাহী জামে মসজিদ: রিকশা বা মটরসাইকেলে করে সহজেই ঘুরে আসতে পারেন।
নিকলী বেড়ি বাঁ: নিকলী উপজেলা অফিসের সামনে থেকে বেড়িবাদ শুরু তাই হেটে – হেটে দেখা যাবে তার সৌন্দর্য।
পাহাড় খাঁর মাজার: নিকলী উপজেলা থেকে ট্রলারে করে ও মটর সাইকেলে করে যাওয়া যায়।
গুরই প্রাচীনতম আখড়া: কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলায় গুরই ইউনিয়নে এই আখড়া অবস্থিত। শুকনো মৌসুমে রিকসা, মটরসাইকেল, সিএনজি দিয়ে যাওয়া যায় কিন্তু বর্ষা মৌসুমে নৌকা বা ট্রলার যোগে যেতে হয়।

কিশোরগঞ্জের অন্যান্য হাওর

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলা ছাড়াও, অষ্টগ্রাম উপজেলা, মিঠামইন উপজেলা, ইটনা উপজেলার প্রায় পুরোটাই হাওর অঞ্চল। এই হাওর গুলোও বেশ সুন্দর। সেই সম্পর্কে জানতে বিস্তারিত পড়ুন নিচের লিংক গুলো থেকে।

ভ্রমণ সংক্রান্ত যে কোন তথ্য ও আপডেট জানতে ফলো করুন আমাদের ফেসবুক পেইজ এবং জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে

ম্যাপে নিকলী হাওর

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।