নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও থানার জামপুর ইউনিয়নের মহজমপুর গ্রামে ঐতিহাসিক মহজমপুর শাহী মসজিদ (Mohjompur Shahi Mosque) অবস্থিত। ঐতিহ্যবাহী সুলতানী স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন এই মসজিদটি ইতিহাসপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক দারুণ এক আকর্ষণ।
মসজিদ থেকে প্রাপ্ত শিলালিপি অনুসারে, বাংলার সুলতান শামস আল দীন আহমদ শাহের শাসনামলে ৮৩৬-৮৩৯ হিজরির (১৪৩২-১৪৩৬ খ্রিষ্টাব্দ) মাঝামাঝি সময়ে ফিরোজ খান নামের এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি মহজমপুর শাহী মসজিদ নির্মাণ করেন। স্থানীয়ভাবে প্রাচীনকাল থেকেই মসজিদটি “মজমপুর জামে মসজিদ (Mojompur )” নামেও পরিচিত।
৬ গম্বুজ বিশিষ্ট ঐতিহাসিক মহজমপুর শাহী মসজিদের দৈর্ঘ্য ৪২ ফুট, প্রস্থ ৩০ ফুট এবং চারপাশের দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ১.৮ মিটার। মসজিদের পূর্ব দিকে খিলান বিশিষ্ট তিনটি প্রবেশপথ এবং সামনের অংশের ছাদের দুই কোণে সুন্দর অষ্টভুজাকৃতির দুইটি মিনার রয়েছে।
মহজমপুর শাহী মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে কারুকার্য শোভিত কেন্দ্রীয় মিহরাব এবং তার পেছনের অসাধারণ পোড়ামাটির (Terracotta) নকশা করা দেয়াল প্রাচীন সুলতানী আমলের সূক্ষ্ম স্থাপত্যশৈলীর স্বাক্ষর বহন করে। এটিই মূলত এই মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। সময়ের সাথে সাথে সুলতানী আমলে নির্মিত এই মসজিদটির মূল ঐতিহাসিক কাঠামো ঠিক রেখে বিভিন্ন পর্যায়ে সংস্কার করা হয়েছে, যার ফলে বর্তমানে স্থানীয়দের সুবিধার্থে মসজিদটির আয়তন ও সামনের চত্বর কিছুটা বাড়ানো হয়েছে।
এছারা মসজিদ প্রাঙ্গণের দক্ষিণ দিকে একতলা একটি ভবনের ভেতরে শাহ লঙ্গর (শাহ আলম)-এর মাজার রয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, তিনি বাগদাদ থেকে আগত এক সূফী সাধক ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন, যিনি ধন-সম্পদ ত্যাগ করে সাধারণ জীবনযাপন ও ধর্মপ্রচারে সোনারগাঁওয়ে বসতি স্থাপন করেছিলেন। মসজিদ পরিদর্শনের পাশাপাশি পর্যটকরা ঐতিহাসিক এই মাজার প্রাঙ্গণটিও ঘুরে দেখেন।
কিভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে খুব সহজেই দিনে গিয়ে দিনে মহজমপুর শাহী মসজিদ দেখে ফিরে আসা যায়। ঢাকার গুলিস্তান বা সায়দাবাদ থেকে দোয়েল, স্বদেশ, গ্লোরি কিংবা বোরাক পরিবহনের বাসে উঠে মদনপুর বাস স্ট্যান্ড অথবা ভুলতা/আড়াইহাজার বাস স্ট্যান্ডে নামতে হবে। (ভাড়া সাধারণত ৮০-১২০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে)। মদনপুর বা ভুলতা থেকে সিএনজি, অটো কিংবা স্থানীয় রিকশা নিয়ে সরাসরি মহজমপুর বাজারে পৌঁছাতে পারবেন। মহজমপুর বাজার থেকে সামান্য হাঁটলেই পেয়ে যাবেন শাহী মসজিদ।
কোথায় থাকবেন
ঢাকা ও আশেপাশের এলাকা থেকে সকাল সকাল রওনা দিলে নারায়ণগঞ্জ ও সোনারগাঁওয়ের এই দর্শনীয় স্থানটি ঘুরে সন্ধ্যার পূর্বেই ঢাকায় ফিরে আসা সম্ভব। তাই সাধারণত এখানে থাকার প্রয়োজন পড়ে না। তবে দূর থেকে আসা পর্যটক বা যারা সোনারগাঁও অঞ্চলে একাধিক দিন অবস্থান করতে চান, তারা নারায়ণগঞ্জ শহর বা রূপগঞ্জের হোটেল ও রিসোর্টে থাকতে পারেন।
কোথায় খাবেন
মহজমপুর বাজারের আশেপাশে স্থানীয় ছোটখাটো খাবারের দোকান ও চা-নাস্তার দোকান রয়েছে। তবে দুপুরের ভারী খাবারের জন্য ভালো মানের রেস্তোরাঁ পেতে চাইলে সোনারগাঁও মোড়, গাউছিয়া বাজার অথবা নারায়ণগঞ্জ শহর বেছে নেওয়া ভালো।
নারায়ণগঞ্জ শহরের রেল গেট সংলগ্ন খাবারের হোটেলের মধ্যে বিখ্যাত মনির রেস্তোরাঁ, নিরিবিলি রেস্টুরেন্ট, শাহী রেস্টুরেন্ট, নিউ ঘরোয়া, খাবার ঘর ও বিভিন্ন বিরিয়ানি হাউজে ট্রেডিশনাল ডিশ ও বিরিয়ানি উপভোগ করতে পারেন। এছাড়া সোনারগাঁওয়ের কাইকারটেক হাটের দিকে গেলে তাজা নদীর মাছের খাবারের স্বাদ নিতে পারেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলার অন্যান্য দর্শনীয় স্থান
নারায়ণগঞ্জের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে পানাম নগর, জিন্দা পার্ক, মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ী, মায়াদ্বীপ, মেরি এন্ডারসন, ফুলের গ্রাম সাবদি, সোনাকান্দা দুর্গ, কাইকারটেক হাট, বাংলার তাজমহল, বারদী লোকনাথ আশ্রম, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন ও গোয়ালদি মসজিদ উল্লেখযোগ্য।
ফিচার ইমেজ: শফিক
ভ্রমণ সংক্রান্ত যে কোন তথ্য ও আপডেট জানতে ফলো করুন আমাদের ফেসবুক পেইজ এবং জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।
