মাধবকুন্ড জলপ্রপাত (Madhabkunda Waterfall) মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলায় অবস্থিত। কিছু বছর আগেও মাধবকুন্ড ছিল বাংলাদেশের জলপ্রপাত প্রেমী পর্যটকদের কাছে একমাত্র আকর্ষন। বর্তমানে বাংলাদেশে আরো বেশ কিছু ঝর্ণা আবিষ্কৃত হয়েছে। তবু পর্যটকদের কাছে মাধবকুন্ড ঝর্ণার আবেদন একটুও কমেনি তাই সরকারী উদ্যোগে এখানে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের রেস্টহাউজ ও রেস্টুরেন্ট আর সম্পূর্ন এলাকাকে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে মাধবকুন্ড ইকোপার্ক। অনিন্দ্য সুন্দর এ জলপ্রপাত প্রায় ১৬২ ফুট উঁচু আর মাধবকুন্ড ঝর্ণা থেকে ১৫-২০ মিনিট হাটলে পরিকুন্ড ঝর্ণা নামে আরেকটি ঝর্ণা চোখে পড়ে। এছাড়া এখানে আছে দিগন্তজোড়া চা বাগান, খাসিয়া পল্লী, কমলা, লেবু, সুপারী ও পানের বাগান আবার কোথাও কোথাও জুম চাষেরও দেখা মিলবে।

যাওয়ার সময়

ভ্রমণের জন্যে শীতকাল উপযুক্ত সময় হলেও ঝর্ণাতে শীতকালে তেমন পানি থাকে না। যদি সেই দিক চিন্তা করেন তাহলে বর্ষা বা তার আশেপাশের সময়ে মাধবকুন্ড ঝর্ণা ভ্রমণ করলে তখন ঝর্ণায় অনেক পানি থাকবে।

মাধবকুন্ড ইকোপার্ক যাবার উপায়

মাধবকুন্ড ঝর্ণায় যেতে পারবেন অনেক ভাবেই। আপনি কোন জায়গা থেকে যাবেন তার উপর নির্ভর করে নিচে কয়েকটি পদ্ধতিতে মাধবকুণ্ড যাবার উপায় দেওয়া হলোঃ

ঢাকা থেকে মাধবকুন্ড

ঢাকা থেকে বাসে গেলে সবচেয়ে সহজ পথ হবে আপনি বিয়ানীবাজার গামী শ্যামলী পরিবহন অথবা এনা পরিবহনে করে সরাসরি কাঠালতলী বাজার নেমে গেলে। সেখান থেকে রিসার্ভ সিএনজি (১৫০-১৮০) টাকা বা লোকাল সিএনজি (জনপ্রতি ২০-২৫) টাকা ভাড়া দিয়ে মাধবকুন্ড থেকে পারবেন।

ঢাকা থেকে ট্রেনে যেতে চাইলে বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেন মৌলভীবাজার হয়ে সিলেট যায়। পারাবত, উপবন ও জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনে মৌলভীবাজার এর কুলাউড়া স্টেশনে নেমে যেতে হবে আপনার (শ্রেণিভেদে ভাড়া ১৭০ – ৮০০ টাকা, সময় লাগবে ৬-৭ ঘন্টা)। কুলাউড়া স্টেশন থেকে কাঠালতলী বাজার হয়ে মধবকুন্ড যেতে হবে। এইক্ষেত্রে আপনি রিসার্ভ সিএনজি (৪০০-৬০০) নিয়ে মাধবকুন্ড যেতে পারবেন অথবা কুলাউড়া থেকে লোকাল সিএনজি দিয়ে কাঠালতলী বাজার গিয়ে সেখান থেকে আবার রিসার্ভ সিএনজি (১৫০-১৮০) টাকা বা লোকাল সিএনজি (জনপ্রতি ২০-২৫) টাকা ভাড়া দিয়ে মাধবকুন্ড থেকে পারবেন।

মৌলভীবাজার থেকে মাধবকুন্ড ইকোপার্ক

যদি মৌলভীবাজার শহর থেকে মাধবকুন্ড যেতে চান তাহলে যাবার উপায় দুইভাবে হতে পারে। হয় আপনি সিএনজি/জীপ/মাইক্রোবাস রিসার্ভ করে নিতে হবে। নয়তো বড়লেখা গামী কোন লোকাল বাসে উঠে কুলাউড়া পার হয়ে বড়লেখার আগেই কাঁঠালতলী বাজারে নেমে যাবেন। সেখান থেকে রিজার্ভ/লোকাল সিএনজি নিয়ে যেতে পারবেন মাধবকুন্ড।

সিলেট থেকে মাধবকুন্ড

সিলেট থেকে মাধবকুন্ড যেতে চাইলে কদমতলী বাস স্ট্যান্ড থেকে বড়লেখা হয়ে যে বাস কুলাউড়া যায় সেই বাসে উঠে যেতে পারেন অথবা বড়লেখা চলে আসবেন। বড়লেখা থেকে রিসার্ভ সিএনজি দিয়ে মাধবকুন্ড যেতে পারবেন অথবা বড়লেখা থেকে লোকাল সিএনজি দিয়ে কাঠালতলী বাজার এসে সেখানে থেকে রিসার্ভ/লোকাল সিএনজি তে করে মাধবকুণ্ড যেতে পারবেন।

শ্রীমঙ্গল থেকে মাধবকুন্ড

শ্রীমঙ্গল থেকে মাধবকুন্ড যেতে চাইলে সরাসরি সিএনজি/জীপ রিসার্ভ করে যেতে পারবেন। অথবা বড়লেখা গামী কোন লোকাল বাসে করে বড়লেখার আগে কাঁঠালতলী বাজারে নেমে যেতে হবে। সেখান থেকে রিসার্ভ/লোকাল সিএনজি দিয়ে মাধবকুন্ড যাওয়া যায়।

মাধবকুন্ড থেকে প্রায় অর্ধ কিলোমিটার পথ হেটে গেলেই মাধবকুন্ড ঝর্নার দেখা মিলবে। তার আগে অবশ্য ১০ টাকা টিকেট মূল্য দিয়ে পর্যটন এলাকায় প্রবেশ করতে হবে। আর মাধবকুন্ড ঝর্ণার কাছেই পরিকুন্ড নামে আরও একটি ঝর্না আছে। ঝিরি ধরে ১০-১৫ মিনিট হেঁটে গেলেই সেই ঝর্ণার দেখা পাওয়া যাবে। এছাড়া মাধবকুন্ড ইকোপার্ক এর চারপাশে ঘুরে দেখতে খারাপ লাগবেনা। চাইলে দিনের পুরোটা সময় এইখানে ব্যয় করতে পারবেন।

কোথায় থাকবেন

মাধবকুন্ডে থাকার জন্য জেলা পরিষদের ২টি বাংলো ও ২টি আবাসিক হোটেল রয়েছে। অগ্রিম বুকিং দিয়ে থাকতে পারবেন সেখানে। তবে সবচেয়ে ভালো হয় সিলেট, মৌলভীবাজার বা শ্রীমঙ্গলে রাত্রি যাপন করলে এতে পরদিন যেকোন জায়গায় আপনার যাত্রা সহজ হবে। আর সেসব জায়গায় থাকার অনেক ব্যবস্থা আছে। আপনি আপনার পছন্দমত হোটেল বা কটেজে রাত্রিযাপন করতে পারবেন।

কোথায় খাবেন

মাধবকুণ্ডে মাঝারি মানের রেস্টুরেন্ট আছে তবে সেখানে খাবারের দাম একটু বেশী। তাই প্রয়োজনে নিজেদের খাবার বাইরে থেকে কিনে নিয়ে যেতে পারেন কিংবা সিলেট ফিরে জিন্দাবাজার এলাকায় পানসী, পাঁচ ভাই কিংবা পালকি রেস্টুরেন্টের প্রায় ৩০ রকম ভর্তা চেখে দেখতে পারেন। মৌলভীবাজার বা শ্রীমঙ্গল শহরেও অনেক মানের খাবার হোটেল আছে। আপনার পছন্দমত কোন হোটেল থেকে খেয়ে নিতে পারবেন।

আশেপাশে দর্শনীয় স্থান

মাধবকুন্ড জলপ্রপাত ছাড়াও মৌলভীবাজারের আরও কিছু দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণ করতে পারেন। আপনার ভ্রমণ পরিকল্পনা সেইভাবেই গুছিয়ে নিতে পারেন। কত সময়ের জন্যে যাচ্ছেন, কি কি দেখবেন তা হিসেব করেই সে পরিকল্পনা করতে পারেন। মৌলভীবাজার জেলার সুন্দর জায়গা গুলোর মধ্যে লাউয়াছড়া উদ্যান, চা বাগান, হামহাম ঝর্ণা, বাইক্কা বিল, মাধবপুর চা বাগান ও লেক, নবাব বাড়ি, হাকালুকি হাওর, মনিপুরী পল্লী সহ আরও নানা স্থাপনা ঘুরে দেখতে পারেন।

মাধবকুন্ড ভ্রমণ টিপস ও সতর্কতা

  • কম খরচে মাধবকুন্ড জলপ্রপাত ভ্রমণ করতে চাইলে ট্রেন ও লোকাল সিএনজি দিয়ে যাতায়াত করতে পারবেন।
  • খরচ কমাতে দলগত ভাবে ঘুরতে পারেন, টিমে সদস্য সংখ্যা যেন সিএনজি কতজন বসবেন সে অনুযায়ী হয়।
  • মাধবকুন্ড একদিনেই ঘুরে দেখা সম্ভব, আগের রাতে রওনা দিয়ে সারাদিন ঘুরে রাতে আপনার গন্তব্যে ফিরে যেতে যান।
  • স্থানীয় যাতায়াত এর জন্যে ভাড়া দরদাম করে নিবেন। টূরিস্ট দেখলে অতিরিক্ত টাকা চায়।
  • সিজনে ও ছুটির দিনে গেলে সিএনজি/জিপ ভাড়া একটু বেশি লাগবে।
  • মাধবকুন্ড জলপ্রপাতের উত্তাল রূপ দেখার সময় বর্ষা কালেই।
  • ঝর্ণার আশেপাশের পাথর অনেক পিচ্ছিল, হাটা চলায় সাবধান থাকবেন।
  • নোটিশ বোর্ডে যা লিখা আছে তা পালন করুন।
  • জলপ্রপাতের নিচে অনেক গভীর, ভুলেও সেখানে যাবেন না।
  • বর্ষায় অনেক পানি থাকে তাই ঝিরিতে অনেক স্রোত, সাবধান থাকবেন।
  • ঝর্ণার পানিতে গোসল করলে আগেই অতিরিক্ত জামাকাপড় নিয়ে নিন।
  • যে কোন বিষয়ে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা নিন।

ফিচার ইমেজ : রুবেল মিয়া

ম্যাপে মাধবকুন্ড জলপ্রপাত

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।