লালাখাল (Lalakhal) বিভাগীয় শহর সিলেট জৈন্তাপুর উপজেলায় অবস্থিত। সিলেট থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই লালাখাল নদী ভারতের চেরাপুঞ্জি পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদী, পাহাড়ি বন, চা-বাগান এবং নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজি লালাখালের ভূপ্রকৃতিকে দিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য। ভরা পূর্ণিমায় জ্যোৎস্না ধোয়া নদী কিংবা মেঘ পাহাড় আর নদীর মিতালী দেখতে আপনাকে লালাখাল ঘুরে আসতে হবে। বর্ষাকালে লালাখালের পানি খুব ঘোলা থাকে তাই নভেম্বর থেকে মার্চ অর্থাৎ শীতকাল হচ্ছে লালাখাল ভ্রমণের উপযুক্ত সময়।

লালাখালের বিভিন্ন অংশে নীল, সবুজ এবং স্বচ্ছ পানির দেখা মিলে। চাইলে তামাবিল অংশের স্বচ্ছ পানির সারি নদীর উপর দিয়ে স্পীডবোট বা নৌকায় লালাখালে যেতে পারেন। ৪৫ মিনিটের এ যাত্রা আপনাকে লালাখালের সৌন্দর্য্যে বাকরুদ্ধ করে রাখবে। সন্ধ্যার পর নদীতে নৌকা থাকে না, তাই সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে যাওয়া উত্তম। রাতে লালাখালের রুপে মোহিত হতে পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে আসা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সিলেট
ঢাকার গাবতলী এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে সিলেটের বাস ছেড়ে যায়৷ ফকিরাপুল, সায়দাবাদ ও মহাখালী বাস স্টেশন থেকে গ্রীন লাইন, সৌদিয়া, এস আলম, শ্যামলি ও এনা পরিবহনের এসি বাস যাতায়াত করে, এগুলোর ভাড়া সাধারণত ৮০০ থেকে ১১০০ টাকার মধ্যে। এছাড়াও ঢাকা থেকে সিলেট যেতে শ্যামলী, হানিফ, ইউনিক, এনা পরিবহনের নন এসি বাস জনপ্রতি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা ভাড়ায় পাবেন।

ঢাকা কমলাপুর কিংবা বিমান বন্দর রেলওয়ে স্টেশান হতে উপবন, জয়ন্তিকা, পারাবত অথবা কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনে করে সিলেট যেতে পারবেন। এছাড়া ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমানে সিলেট যেতে পারবেন।

চট্টগ্রাম থেকে সিলেট
চট্টগ্রাম থেকে বাস, ট্রেন ও আকাশপথে সিলেট যাওয়া যায়। চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে সিলেট যেতে পাহাড়িকা এবং উদয়ন এক্সপ্রেস নামের দুটি ট্রেন সপ্তাহে ৬ দিন চলাচল করে।

সিলেট থেকে লালাখাল
সিলেট থেকে লালাখালে যেতে হলে নগরীর ধোপাদিধীর ওসমানী শিশু উদ্যানের বা শিশু পার্কের সামনে থেকে লেগুনা, মাইক্রবাস অথবা জাফলংগামী বাসে চড়ে সারিঘাট আসতে পারেন। সারিঘাট সিলেট এবং জাফলং এর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। সারিঘাট থেকে লালাখালে যাওয়ার সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাবেন। যদি নদীপথে লালাখালে যেতে চান তবে এখানে ইঞ্জিন চালিত বিভিন্ন ট্রলার ও নৌকা ভাড়ায় পাবেন। লালাখাল থেকে সিলেট ফিরতে রাত ৮ টা পর্যন্ত বাস ও লেগুনা পাবেন।

সিলেট থেকে লালাখাল যেতে মাইক্রোবাসে ভাড়া লাগবে ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকা। বাস কিংবা লেগুনায় সারিঘাট যেতে ৪০ থেকে ৬০ টাকা খরচ হবে। সারিঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় লালাখালে যেতে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা এবং স্পিডবোটে যেতে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা লাগবে। কম খরচে লালাখাল যেতে চাইলে সারিঘাট ব্রিজ পার হয়ে উত্তর দিকে মসজিদ থেকে একটু এগিয়ে ডান দিকে লালাখালের রাস্তায় সারি সারি অটো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবেন। সিরিয়ালের ভিত্তিতে চলা এসব অটোতে জনপ্রতি ভাড়া লাগে ১৫ টাকা। অটো থেকে নেমে লালাখাল ঘাটে গেলেই সবুজ পানির অপার্থিব দৃশ্য দেখতে পারবেন।

এখানে ছাউনি দেয়া রঙিন নৌকায় ঘুরতে চাইলে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা লাগবে আর আরো কম টাকায় নৌকা ভাড়া করতে খেয়া পার হয়ে নদীর অপর পাড়ে ছাউনি ছাড়া নৌকা গুলোর কাছে চলে যান। এখানে নৌকাগুলোর সিরিয়াল আছে একটু দরদাম করে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় ইচ্ছেমত সময়ের জন্য ভাড়া করতে পারবেন।

কোথায় থাকবেন

লালাখালের পাড়ে রাত কাটাতে নর্দার্ন রিসোর্টে বুকিং দিতে পারেন। অতিথিদের সিলেট যাওয়া আসার জন্য এদের নিজেদের পরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া লালাখালের কাছে খাদিমনগরে অবস্থিত নাজিমগড় রিসোর্টে আগেই যোগাযোগ করে নিতে পারেন। কারণ সিজনে রিসোর্টের সব রুম বুক থাকতে পারে। নাজিমগড় রিসোর্টে টেরেস, ছোট বাংলো এবং বড় ভিলায় রাত্রি যাপনের সুযোগ রয়েছে। এই রিসোর্টটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় ভরপুর। প্রতি রাতের জন্য নাজিমগড় রিসোর্টের প্রিমিয়ার কক্ষের ভাড়া ৭০০০ টাকা এবং প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুইটের ভাড়া ১৫,০০০ টাকা।

তবে থাকার জন্য সিলেট ফিরে আসাই সুবিধাজনক। সিলেটের লালা বাজার ও দরগা রোডে কম ভাড়ায় অনেক মানসম্মত রেস্ট হাউস আছে৷ যেখানে ৪০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিভিন্ন ধরণের রুম পাবেন। এছাড়াও হোটেল হিল টাউন, গুলশান, দরগা গেইট, সুরমা, কায়কোবাদ ইত্যাদি হোটেলে আপনার প্রয়োজন ও সামর্থ অনুযায়ী থাকতে পারবেন।

কি খাবেন

সিলেটর জিন্দাবাজার এলাকার পানসী, পাঁচ ভাই কিংবা পালকি রেস্টুরেন্টের সুলভ মূল্যে পছন্দমত নানা রকম দেশী খাবার খেতে পারেন। এইসব রেস্টুরেন্টের বাহারী খাবার পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। এছাড়া সিলেট শহরে বিভিন্ন মানের রেস্টুরেন্ট আছে, আপনার পছন্দ মত যে কোন জায়গায় খেয়ে নিতে পারেন।

সিলেটের দর্শনীয় স্থান

এছাড়াও সিলেট শহর ও সিলেটের আশেপাশে যে সকল দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণ করতে পারেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্থান হলো:
হযরত শাহজালাল (রঃ) মাজার, মালনীছড়া চা বাগান, জাফলং, বিছনাকান্দি, রাতারগুল, লোভাছড়া, পান্থুমাই ঝর্ণা, সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা, ক্বীন ব্রিজ, হাকালুকি হাওর, ভোলাগঞ্জ, জাকারিয়া সিটি, আলী আমজাদের ঘড়ি ইত্যাদি।

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।