প্রকৃতির এক অপার বিস্ময় আর রোমাঞ্চের নাম চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড রেঞ্জ। এই রেঞ্জের সবুজে ঘেরা ল্যান্ডস্কেপ আর অদেখা সৌন্দর্যের এক মায়াবী অনুভূতির নাম হরিণমারা হাঁটুভাঙ্গা ট্রেইল (Harinmara Hatubhanga Trail)। চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড ও মীরসরাইয়ের সীমানায় অবস্থিত এই ট্রেইলটি মূলত ৩টি ঝর্ণা ও ১টি কৃত্রিম লেকের এক অপূর্ব সমন্বয়। এর মূল আকর্ষণ হরিণমারা ঝর্ণার সামনের গভীর খুমে অতীতে হরিণেরা জলপান করতে আসতো এবং সেখান থেকেই স্থানীয়রা হরিণ শিকার করতো বলে এই ট্রেইলের এমন নামকরণ করা হয়েছে। ট্রেইলটির অন্যতম বিশেষত্ব হলো, এটি সীতাকুণ্ড রেঞ্জের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত বা শর্ট ট্রেইল (Short Trail), যা অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী হাইকারদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

কখন যাবেন

হরিণমারা হাঁটুভাঙ্গা ট্রেইলের প্রকৃত রূপ এবং ঝর্ণাগুলোর যৌবন দেখতে আপনাকে বর্ষাকালে বা বর্ষার পরবর্তী সময়ে যেতে হবে। জুন থেকে অক্টোবর মাস এই ট্রেইলে ট্রেকিং করার জন্য সবচেয়ে সেরা সময়। এই সময়ে পাহাড়ি ঝিরিপথ ও ঝর্ণাগুলো পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। তবে শুকনো মৌসুমে লেকে পানি থাকলেও ঝর্ণার পানি অনেকটাই কমে যায়।

হরিণমারা ট্রেইলের দর্শনীয় স্থান

হরিণমারা হাঁটুভাঙ্গা ট্রেইলটি বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্রে ভরপুর। পুরো ট্রেইলটি শেষ করতে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে। এখানে পাহাড়ি খাড়া পথ দিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা হাঁটার পর আপনি ঝিরিপথে প্রবেশ করবেন। সেখান থেকে মিনিট চারেক এগোলেই একটি ওয়াই জংশন (Y-Junction) পাবেন। মূলত এই জংশন থেকেই ঝর্ণাগুলোর পথ আলাদা বা ভাগ হয়েছে।

  • হাঁটুভাঙ্গা ঝর্ণা (Hatubhanga Waterfall): ওয়াই জংশনের ডানদিকের পথ ধরে কিছুদূর হাঁটলেই দেখা মিলবে এই চমৎকার ঝর্ণাটির।
  • সর্পপ্রপাত ঝর্ণা (Sorpopropat Waterfall): হাঁটুভাঙ্গা ঝর্ণার ডানপাশ দিয়ে নীরব ও নিস্তব্ধ পথ ধরে মাত্র ২ মিনিট হাঁটলেই দেখা পাবেন এই ঝর্ণার। সাপের মতো আঁকাবাঁকা হয়ে পানি নেমে আসে বলে একে সর্পপ্রপাত বলা হয়।
  • হরিণমারা ঝর্ণা (Harinmara Waterfall): ওয়াই জংশনের বামদিকের পথ ধরে এগিয়ে গেলে দেখা পাবেন এই ট্রেইলের মূল আকর্ষণ হরিণমারা ঝর্ণার। এই ঝর্ণার সামনে একটি সুন্দর শীতল পানির খুম আছে, যেখানে সাঁতার কাটলে আপনার সব ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যাবে।

এছাড়াও আপনি বাওয়াছড়া লেকে ৬০০ টাকা ভাড়ায় বোট নিতে পারেন (এক বোটে ৮ জন বসা যায়) অথবা প্রতি ঘণ্টা ৪০০ টাকা খরচে কায়াকিং (Kayaking) উপভোগ করতে পারেন।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা কিংবা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে হরিণমারা ট্রেইলে আসতে হলে আপনাকে প্রথমেই চট্টগ্রামগামী বাসে বা ট্রেনে রওনা হতে হবে।

বাসে আসতে চাইলে: ঢাকা থেকে আসা চট্টগ্রামগামী যেকোনো দূরপাল্লার বাসে (যেমন: হানিফ, এনা, বা শ্যামলী পরিবহন) উঠে সুপারভাইজারকে আগেই বলে রাখবেন যেন আপনাকে সীতাকুণ্ডের ছোট কমলদহ বাজার-এ নামিয়ে দেয়। ঢাকা থেকে এখানে আসতে জনপ্রতি বাস ভাড়া পড়বে ৪৮০ থেকে ৬০০ টাকা।

ট্রেনে আসতে চাইলে: ঢাকা বা দেশের অন্য প্রান্ত থেকে ট্রেনে আসলে আপনাকে ফেনী স্টেশন অথবা সীতাকুণ্ড স্টেশনে নামতে হবে। ফেনী থেকে লোকাল বাসে করে ছোট কমলদহ বাজারে চলে আসতে পারবেন, ভাড়া পড়বে ৫০ থেকে ৮০ টাকা।

মূল ট্রেইলে যাত্রা: ছোট কমলদহ বাজারটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের একদম পাশেই অবস্থিত। বাজার থেকে হাতের ডানের পথ ধরে বাছড়া লেক বা হরিণমারা ট্রেইলের প্রবেশমুখে যাওয়ার জন্য সিএনজি বা অটোরিকশা পেয়ে যাবেন। সিএনজি বা অটোতে করে প্রবেশমুখে যেতে জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা খরচ হতে পারে। আপনি যদি হেঁটে যেতে চান, তবে রেললাইন ধরে ৫-৬ মিনিট হাঁটলেই কাঁচা রাস্তার দেখা পাবেন, যেখান থেকে মূল ট্রেকিং শুরু হয়। কাঁচা রাস্তা দিয়ে ৭-৮ মিনিট হাঁটার পর বামে টিকিট কাউন্টার পাবেন, যেখানে জনপ্রতি টিকিট মূল্য ২০ টাকা।

আরও পড়ুনঃ ঝরঝরি ঝর্ণা ভ্রমণ গাইড

কোথায় থাকবেন

হরিণমারা হাঁটুভাঙ্গা ট্রেইলটি এক দিনেই ঘুরে শেষ করা সম্ভব। তবে আপনি যদি রাতে থাকতে চান, তবে সীতাকুণ্ড পৌরসভা বা চট্টগ্রাম শহরে চলে যেতে পারেন। এছারা সীতাকুণ্ড বাজারে অবস্থিত হোটেল ৯৯, হোটেল সাইমুন, হোটেল সৌদিয়া অথবা হোটেল ডায়মন্ডে থাকতে পারেন। এগুলো সীতাকুণ্ডের বেশ পরিচিত হোটেল।

কোথায় খাবেন

টিকিট কাউন্টার থেকে ১-২ মিনিট হাঁটলেই দেখতে পাবেন চোখ জুড়ানো বাওয়াছড়া লেক (Bawachhara Lake), যা স্থানীয়ভাবে নীলাম্বরী লেক (Nilambori Lake) নামেও পরিচিত। এই লেকের পাড়েই সুন্দর একটি খাবারের দোকান রয়েছে। ট্র্যাকিংয়ে যাওয়ার আগেই আপনি এখানে দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে রাখতে পারেন। ভাত, ডাল ও মুরগির মাংসের প্যাকেজ এখানে জনপ্রতি ১৩০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে পেয়ে যাবেন। লেকের পাড়ে বসে এমন মনোরম পরিবেশে দুপুরের খাবার খাওয়ার অভিজ্ঞতা আপনার ভ্রমণকে আরও আনন্দময় করে তুলবে।

ভ্রমণ পরামর্শ ও টিপস

  • ট্রেকিং জুতো: ট্রেইলের পাহাড় ও ঝিরিপথ বেশ পিচ্ছিল, তাই ভালো গ্রিপের জুতো বা প্লাস্টিকের স্যান্ডেল সাথে রাখুন।
  • খাবারের অর্ডার: ট্র্যাকিং শুরু করার আগেই লেকের পাড়ের দোকানে দুপুরের খাবারের অর্ডার নিশ্চিত করুন, এতে ফিরে এসে দ্রুত খাবার পাবেন।
  • ব্যাগ হালকা রাখা: ট্রেকিংয়ের সময় ব্যাগ যত সম্ভব হালকা রাখুন। অতিরিক্ত কাপড় বা ভারী জিনিসপত্রের জন্য লেকের দোকানে কথা বলে রেখে যেতে পারেন।
  • পরিবেশ রক্ষা: প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট বা যেকোনো ময়লা-আবর্জনা ঝিরিপথ বা ঝর্ণার পানিতে ফেলে প্রকৃতির ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ফিচার ইমেজ: ভ্রমণ বন্ধু

ভ্রমণ সংক্রান্ত যে কোন তথ্য ও আপডেট জানতে ফলো করুন আমাদের ফেসবুক পেইজ এবং জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে

ম্যাপে হরিণমারা হাঁটুভাঙ্গা ট্রেইল

শেয়ার করুন সবার সাথে

দৃষ্টি আকর্ষণ: যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের দেশের সম্পদ। প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন। অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল নাও থাকতে পারে। অনুগ্রহ করে আপনি কোথাও ভ্রমণে যাওয়ার পূর্বে বর্তমান তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে নিয়ে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এইসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই বাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।

মন্তব্য জানান

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।