দামতুয়া ঝর্ণা বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলায় অবস্থিত। বান্দরবান জেলার দুর্গম জায়গায় যে কয়টি সুন্দর ঝর্ণা আছে তার মধ্যে আকার আকৃতি ও সৌন্দর্য্যের দিক দিয়ে এটি বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর ঝর্ণার মধ্যে একটি। ঝর্ণায় যাওয়ার রাস্তা দুর্গম হওয়ায় অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটকদের কাছে বর্তমানে খুবই আকর্ষণীয় এই স্থান। দামতুয়া ঝর্ণাটি আরও বেশ কিছু নামে পরিচিত। তার মধ্যে তুক অ ঝর্ণা, লামোনই ও ডামতুয়া ঝর্ণা নাম উল্লেখযোগ্য। দামতুয়া যাওয়ার পথেই পাবেন ওয়াংপা ঝর্ণা, তুক অ ঝিরি ঝর্ণা, আরও বেশ কিছু সুন্দর ক্যাসকেড। এই ঝর্ণায় যাবার রাস্তা মোটেও সহজ নয়। ঝর্ণায় যাওয়া আসার জন্যে পাহাড়ী রাস্তায় প্রায় ১২-১৩ কিলোমিটার হাঁটতে হবে। তাই যাঁরা পাহাড়ি পরিবেশে হাঁটতে পারেননা এবং শিশু ও বয়স্কদের সেখানে না যাওয়াই ভালো।

যাবার উপযুক্ত সময়

বছরের যে কোন সময় যাওয়া যায়। তবে ঝর্ণায় বেশি পানি থাকে বর্ষাকালে এবং বর্ষার পরের সময়টুকুতে। তাই এই সময়েই যাওয়া ভালো। তবে অতি বৃষ্টি হলে যাবার পথ অনেক কঠিন হয়ে যায়। সেই বিষয়ও আপনার বিবেচনায় থাকতে হবে।

যাওয়ার উপায়

দামতুয়া ঝর্ণায় যেতে হলে আপনাকে প্রথম আলীকদম-থানচি সড়কের ১৭ কিলোমিটার পয়েন্টের জায়গায় আসতে হবে। এখানে আসা যায় দুইভাবে। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা থেকে আলীকদম হয়ে অথবা সরাসরি আলীকদম গিয়ে। আরেকটি পথ হলো বান্দরবান শহর থেকে আলীকদম যাবার রোড ধরে। তবে চকরিয়া হয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে সুবিধাজনক ও সময় সাশ্রয়ী।

ঢাকা থেকে আলীকদম

বর্তমানে ঢাকা থেকে শ্যামলি ও হানিফ বাস সরাসরি আলীকদমে চলাচল করে। ঢাকা থেকে আলীকদম বাস ভাড়া ৮৫০ টাকা। এছাড়া চকরিয়া হয়েও আলীকদম যাওয়া যায়। কক্সবাজারগামী যে কোন বাসে যাওয়া যাবে চকরিয়া। ঢাকা থেকে চকরিয়া বাস ভাড়া শ্রেণিভেদে ৭৫০ থেকে ১৫০০ টাকা। যাবার সময় বাসের সুপারভাইজারকে চকরিয়া বাজারে নামিয়ে দিতে বললে আপনাকে নামিয়ে দিবে। চকরিয়া নেমে সেখানের নতুন বাস টার্মিনাল থেকে আলীকদম যাবার লোকাল বাস পাওয়া যায়। অথবা লোকাল চান্দের গাড়িতে করে কিংবা একসাথে অনেকজন থাকলে চান্দের গাড়ি রিজার্ভ করে আলীকদম যেতে পারবেন।

আলীকদম থেকে দামতুয়া ঝর্ণা

আলীকদমে এসে আলীকদমের পানবাজার থেকে আপনাকে বাইক ভাড়া করে যেতে হবে আলীকদম-থানচি রাস্তার ১৭ কিলোমিটার পয়েন্টের আদুপাড়াতে। এক বাইকে ২ জন করে বসা যাবে, জনপ্রতি ভাড়া লাগবে ২৫০-৩০০ টাকা। ভাড়ার বিষয়ে আপনাকে দরদাম করে নিতে হবে। অথবা আপনারা একসাথে বেশি মানুষ থাকলে আলীকদম থেকে চান্দের গাড়ী/জীপ ভাড়া করে নিতে পারবেন। আলীকদম থেকে যাবার পথে ১০ কিলোমিটার যাবার পর সেখানে আর্মি ক্যাম্প আছে। সেখানে সবার ন্যাশনাল আইডি কার্ড ও ফোন নাম্বার দিয়ে নাম এন্ট্রি করে সামনে যাবার জন্যে অবশ্যই পার্মিশন নিতে হবে। আর মনে রাখতে হবে আপনাকে অবশ্যই সেইদিনই ট্রেকিং শেষ করে বিকেল ৫ টার আগে এই ১০ কিলো আর্মি ক্যাম্পে ফিরে এসে রিপোর্ট করতে হবে। তাই সময়ের দিকে খেয়াল রাখা উচিৎ। ১৭ কিলোমিটার পয়েন্টে আদুপাড়া নামের একটা গ্রাম আছে সেখানে নেমে আপনাকে ট্রেকিং শুরু করতে হবে। আদুপাড়া থেকে ঘুরে ফিরে আসতে প্রায় ৬ ঘণ্টার মত লাগবে। তবে ট্রেকিং শুরু আগে আপনার প্রয়োজনীয় কিছুর দরকার হলে সেখানের ছোট স্থানীয় দোকান কিনে নিতে পারেন। আর দুপুরে খাবারের জন্যে আগে থেকেই সাথে করে শুকনো খাবার নিয়ে নিতে হবে। ঝর্ণায় যাবার জন্যে আপনার গাইডের প্রয়োজন হবে। আদুপাড়া থেকে আপনি সারাদিনের জন্যে গাইড ঠিক করে নিতে পারবেন। আপনাকে ঘুরিয়ে দেখিয়ে নিয়ে আবার ফিরে আসার জন্যে গাইড ফি হিসবে ৫০০-৮০০ টাকা দিতে হবে। তবে এইখানেও আপনাকে দরদাম করে নিতে হবে। দামতুয়া ঝর্ণার পাশাপাশি আরও বেশ কিছু ঝর্ণা ও ঝিরি আছে, কি কি দেখবেন তা গাইডের সাথে আগেই আলাপ করে নিবেন।

থাকার জায়গা

বর্তমানে আর্মি ক্যাম্প থেকে দামতুয়া যাবার পথে থাকতে দেয় না। আপনাকে দামতুয়া ঝর্ণা দেখে সেইদিনই আলীকদম ফিরে আসতে হবে। আর আলীকদম থাকার মত তেমন ভালো কোন হোটেল বা আবাসিক ব্যবস্থা নেই। তাই সবচেয়ে ভাল সেইদিনই আপনি যদি আলীকদম থেকে ফিরে আসেন। ঢাকা থেকে গেলে সকালে পৌঁছে সারাদিন ঘুরে আলীকদম থেকে সন্ধ্যার ফিরতি বাসে ঢাকা চলে আসতে পারবেন। অথবা আলীকদম থেকে চকরিয়া ফিরে সেখান থেকে সুবিধামত পরিবহনে ফিরে যেতে পারবেন আপনার গন্তব্যে। আর একান্তই যদি থাকতে হয় তাহলে স্থানীয় হোটেল আছে, সেখানে থাকতে পারবেন।

দ্যা দামতুয়া ইন, আলীকদম উপজেলা রোড,আলীকদম, বান্দরবান। যোগাযোগঃ ০১৭৪৮-৯১২১২৭

খাওয়া দাওয়া

আলীকদমে বা আলীকদমের পানবাজারে খাওয়ার জন্যে মোটামুটি মানের বেশ কিছু হোটেল আছে। সেখানে দেশীয় খাবারের ব্যবস্থা আছে, অল্প খরচে খেয়ে নিতে পারবেন। আর দুপুরের খাওয়ার জন্যে আপনাকে সাথে করে শুকনো খাবার নিতে যেতে হবে। এছড়া ট্রেইলে ট্রেকিং এর সময় খাওয়ার জন্যে সাথে বিস্কুট, চকোলেট, কলা এইরকম কিছু খাবার সাথে রাখবেন। যাওয়ার পথে আদুপাড়ায় টং দোকান পাবেন সেখানে হালকা নাস্তার জন্যে কিছু খাবার পাবেন।

সতর্কতা ও ভ্রমণ টিপস

  • ঝর্ণায় যাওয়ার রাস্তা অতি দুর্গম। যাঁরা পাহাড়ি পরিবেশে হাঁটতে পারেননা তারা সেখানে না গেলেই ভালো।
  • ট্রেকিং এর জন্যে ভালো গ্রীপের স্যান্ডেল/জুতা ব্যবহার করুন।
  • যেহেতু বেশ বড় ট্রেকিং ট্রেইল, তাই আপনার ব্যাকপ্যাকের ওজন যত কম রাখা যায় ততই ভালো।
  • নিজের সাথে শুকনো খাবার, স্যালাইন, পানি ও কিছু প্রাথমিক ঔষুধ সাথে রাখবেন অবশ্যই।
  • পথে জোঁক থাকতে পারে, তাই সতর্ক থাকবেন। লম্বা মোজা পরে থাকলে জোঁক কম ধরবে।
  • শিশু, বয়স্ক বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের সেখানে না নেওয়াই ভালো।
  • সাথে করে অবশ্যই জাতীয় পরিচয় পত্রের কপি নিবেন।
  • দয়া করে অপচনশীল দ্রব্য ট্রেইলে বা ঝর্ণায় ফেলবেন না।
  • যে কোন ভাড়ার জন্যে দরদাম করে নিবেন।
  • পাহাড়ী পথে বা ঝিরিতে হাঁটার সময় সাবধান থাকবেন।
  • সময়ের দিকে খেয়াল রাখবেন।
  • স্থানীয় আদীবাসী মানুষদের সাথে ভালো ব্যবহার করুন।
  • দলগত ভাবে ভ্রমণ করলে ভ্রমণ খরচ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

ম্যাপে দামতুয়া ঝর্ণা

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।