বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার মিয়ানমার সীমান্ত থেকে মাত্র ৩-৪ কিলোমিটার দূরে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত চাকঢালা ঝর্ণা (Chakdhala Waterfall)। নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালা এলাকায় সীমান্তঘেঁষে অবস্থানের কারণে স্থানীয় ও পর্যটকদের কাছে এটি ‘চাকঢালা সীমান্ত ঝর্ণা’ হিসেবেও ব্যাপক পরিচিত। এছাড়া ঝর্ণার পেছনের পাথরের বিশেষ খনিজ গঠনের ওপর সূর্যের আলো পড়লে তা সোনালী রঙের অপূর্ব আভা সৃষ্টি করে, যার ফলে অনেকে একে ‘সোনালী ঝর্ণা’ বলেও ডেকে থাকেন।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার বিস্ময় বান্দরবানের পার্বত্য অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য সুন্দর ঝর্ণার মধ্যে প্রকৃতিপ্রেমী ভ্রমণকারীদের কাছে এই ঝর্ণা সাম্প্রতিক সময়ের এক নতুন ও রোমাঞ্চকর আকর্ষণীয় গন্তব্য। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা এর স্বচ্ছ জলের ধারা এবং চারপাশের সবুজে মোড়ানো প্রকৃতির নিস্তব্ধতা ভ্রমণকারীদের ক্লান্তি দূর করে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দেয়।
গ্রামের শান্ত মেঠো পথ, বাঁশের দুলতে থাকা সাঁকো এবং উঁচু-নিচু পাহাড়ি ট্রেইল পার হয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টার ট্রেকিং শেষে দেখা মেলে এই দৃষ্টিনন্দন জলপ্রপাতের। যেহেতু এটি একটি সীমান্তসংলগ্ন ও দুর্গম এলাকা, তাই প্রকৃতির এই অপরূপ রূপ উপভোগ করতে ভ্রমণের পূর্বে বিশেষ কিছু সতর্কতা ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি থাকা জরুরি।
কি দেখবেন
- মূল ঝর্না: পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা, চারপাশে ঘন সবুজ পাহাড় আর জলধারার গর্জন মিলিয়ে এক নৈসর্গিক দৃশ্য।
- ঝিরিপথ: ঝর্না থেকে নেমে আসা ঠান্ডা পানির ঝিরিপথ, যেখানে অনেক ভ্রমণকারী কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন, হাত-মুখ ধুয়ে আবার যাত্রা শুরু করেন।
- পাহাড়ি ট্রেইল: বাঁশের সাঁকো পার হয়ে উঁচু-নিচু কয়েকটি পাহাড় ডিঙিয়ে যাওয়ার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, প্রতিটি বাঁকে ভিন্ন ভিন্ন পাহাড়ি দৃশ্য।
- গ্রামীণ জনজীবন: শুরুর দিকের মেঠো পথে স্থানীয় পাহাড়ি গ্রামের সহজ-সরল জীবনযাত্রার ঝলক।
কিভাবে যাবেন
চাকঢালা ঝর্নায় যেতে হলে আপনাকে প্রথমে কক্সবাজার বা চট্টগ্রাম আসতে হবে। সেখান থেকে রামু হয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি, এবং সবশেষে চাকঢালা বাজার থেকে পায়ে হেঁটে ঝর্না পর্যন্ত যেতে হবে।
রাজধানী ঢাকার ফকিরাপুল, সায়েদাবাদ বা গাবতলী থেকে কক্সবাজারগামী যেকোনো দূরপাল্লার এসি কিংবা নন-এসি নাইট কোচে উঠে পড়ুন। যাত্রা পথে আপনাকে নামতে হবে কক্সবাজারের ঠিক আগের স্টেশন রামু বাইপাসে অথবা কক্সবাজার সদরে। ভোরে রামু বাইপাসে নেমে সেখানকার টেক্সি স্ট্যান্ড থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, লোকাল বাস সার্ভিস বা বাইকে করে চলে যান নাইক্ষ্যংছড়ি সদর বাজারে। পাহাড়ি পথ ধরে আঁকাবাঁকা পথে প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের সুন্দর ভ্রমণ শেষে পৌঁছে যাবেন নাইক্ষ্যংছড়ি সদরে।
নাইক্ষ্যংছড়ি বাজার থেকে সিএনজি, মোটরসাইকেল অথবা রিজার্ভ গাড়ি নিয়ে যেতে হবে চাকঢালা বাজারে। গাড়ি চলার পথ মূলত এখানেই শেষ। এরপর শুরু হবে ট্রেকিংয়ের আসল রোমাঞ্চ! চাকঢালা বাজার থেকেই প্রয়োজনীয় পানি ও শুকনো খাবার কিনে নিয়ে হেঁটে এগোতে হবে। শুরুতে পাহাড়ি গ্রামের মেঠো পথ এবং বাঁশের সাঁকো পার হয়ে উঠতে হবে সবুজ উঁচু-নিচু পাহাড়ি ট্রেইলে। ঘন বন আর পাহাড় পেরিয়ে প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা ট্রেকিংয়ের পর সামনে আসবে শীতল ও বরফস্বচ্ছ পানির পাহাড়ি ঝিরিপথ। সেই ঝিরিপথ ধরে স্বচ্ছ পানি মাড়িয়ে আর কিছুটা পথ হাঁটলেই দেখা মিলবে বহু কাঙ্ক্ষিত চাকঢালা ঝর্নার।
কোথায় থাকবেন
নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে কক্সবাজার শহরের দূরত্ব অনেক কম। তাই দিনে গিয়ে ঝর্না ঘুরে বিকেলের মধ্যে কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন মানের হোটেল বা রিসোর্টে ফিরে রাত্রিযাপন করা সবচেয়ে সুবিধাজনক। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় জেলা পরিষদের ডাক বাংলো রয়েছে, যেখানে অনুমতি সাপেক্ষে থাকা সম্ভব।
কোথায় খাবেন
ট্র্যাকিং শুরুর আগে সকালে কিংবা ট্র্যাকিং শেষ করে দুপুরের খাবার নাইক্ষ্যংছড়ি সদর বাজার বা রামু বাজারের স্থানীয় হোটেলগুলোতে খেয়ে নিতে পারেন। চাকঢালা বাজার পার হওয়ার পর পথে বা ঝর্না এলাকায় কোনো খাবারের দোকান নেই। তাই চাকঢালা বাজার থেকেই প্রয়োজনীয় খাবার, বিশুদ্ধ পানি, স্যালাইন, বিস্কুট, খেজুর ইত্যাদি সাথে নিয়ে যাত্রা শুরু করুন।
ভ্রমণ পরামর্শ
- জোঁকের সতর্কতা: বর্ষাকালে পাহাড়ি পথে জোঁকের উপদ্রব থাকে। সাথে লবণ, সরিষার তেল বা স্যাভলন রাখুন এবং পা ঢাকা জুতো বা এঙ্কলেট ব্যবহার করুন।
- সঠিক জুতো ব্যবহার: পাহাড়ি পিচ্ছিল পথ ও পাথুরে ঝিরিপথে সহজে হাঁটার জন্য ভালো গ্রিপযুক্ত জুতো বা ট্রেকিং শু পরিধান করুন।
- আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানা: বর্ষাকালে পাহাড়ি ছড়া বা ঝিরিতে হঠাৎ পাহাড়ি ঢল বা ফ্লাশ ফ্লাড (আকস্মিক বন্যা) দেখা দিতে পারে এবং পানি খুব দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ভ্রমণ সংক্রান্ত যে কোন তথ্য ও আপডেট জানতে ফলো করুন আমাদের ফেসবুক পেইজ এবং জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।
