রাজধানী ঢাকার আগারগাঁওয়ে ২০১৪ সালে বাংলাদেশের প্রথম বিমান বাহিনী জাদুঘর (Bangladesh Air Force Museum) প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর গৌরবময় ঐতিহ্যের ইতিহাস এবং সাফল্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে এই অনন্য জাদুঘরটি নির্মাণ করা হয়। জাদুঘরের প্রধান প্রবেশদ্বার দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে একটি বিশাল উন্মুক্ত চত্বর। আর এই নান্দনিক ও সুপরিসর চত্বরেই অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক জঙ্গি বিমান, যুদ্ধকালীন হেলিকপ্টার এবং বিশালাকৃতির রাডার।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘরে বর্তমানে মোট ২১টি বিমান ও ৩টি রাডার রয়েছে। যার মধ্যে ৩টি বিশেষ বিমান ১৯৭১ সালে আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। তৎকালীন ভারতীয় বিমান বাহিনী এই বিমানগুলো ব্যবহার করে এবং পরবর্তীতে তাদের ঐতিহাসিক ও মৈত্রী স্মারক হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশকে উপহার হিসেবে প্রদান করে।

দর্শনার্থীদের সার্বিক বিনোদন ও সুবিধার কথা মাথায় রেখে বিমান বাহিনী জাদুঘরের ভেতরে গড়ে তোলা হয়েছে একটি আধুনিক ফুড কোর্ট, চমৎকার স্যুভেনির শপ ‘নীলাদ্রি’, শিশুদের জন্য বিভিন্ন আকর্ষক প্রাণীর প্রতিকৃতি, একটি সুসজ্জিত থিম পার্ক এবং সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে নান্দনিক ফোয়ারা।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘরের উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ:

জাদুঘরের উন্মুক্ত চত্বরে প্রদর্শিত প্রতিটি বিমানের পেছনেই রয়েছে বীরত্ব, প্রযুক্তি এবং ইতিহাসের এক একটি রোমাঞ্চকর গল্প। দর্শনার্থী হিসেবে এই সংগ্রহগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আগে থেকে জেনে গেলে আপনার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা বহুগুণ সমৃদ্ধ হবে:

  • বলাকা (রাশিয়া): এটি রাশিয়ার তৈরি স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম যাত্রীবাহী বিমান। ১৯৫৮ সালে বলাকা বিমানটিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আনা হয়। বিমানটির বিশালাকৃতি এবং এর ভিন্টেজ ডিজাইন যেকোনো সাধারণ দর্শনার্থী ও ইতিহাসপ্রেমীদের মুগ্ধ করে।
  • পিটি-৬ (চীন): চীনের তৈরি এই বিশেষ বিমানটি মূলত প্রাথমিক প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হতো, যা ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বহরে যুক্ত হয়।
  • এয়ার টুওরার (নিউজিল্যান্ড): নিউজিল্যান্ডের তৈরি এই বিমানটি আমাদের বিমান বাহিনিতে নতুন ক্যাডেটদের প্রাথমিক ট্রেনিংয়ের জন্য দীর্ঘদিন ব্যবহার করা হতো। হালকা ও সুনিপুণ কাঠামোর এই বিমানটিকে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশে আনা হয়।
  • গ্লাইডার (জার্মানি): জার্মানির কাছ থেকে ১৯৮২ সালে এই ইঞ্জিনবিহীন গ্লাইডারটি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয়। বাতাসে ভেসে থাকার এই বিশেষ প্রযুক্তিটি তরুণ প্রজন্মকে এভিয়েশন বা বিমান চালনার মূল নীতি বুঝতে দারুণ সাহায্য করে।
  • ফুগাসি এম-১৭০ (ফ্রান্স): ১৯৬০ সালে ফ্রান্সের তৈরি অত্যন্ত সুপরিচিত ও দ্রুতগতির এই বাহনটি ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘরে স্থায়ী স্থান পায়।
  • হান্টার বিমান (ভারত): ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় বিমান বাহিনী বাংলাদেশের আকাশ ও ভূমিকে শত্রু মুক্ত রাখতে এই শক্তিশালী হান্টার বিমানটি অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহার করে। এটি আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল।
  • এয়ারটেক কানাডিয়ান ডিএইচ ৩/১০০০ (কানাডা): কানাডার তৈরি এই বোমারু বিমানটি আমাদের মুক্তিকামী মানুষের গর্ব। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর এলাকায় পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সফল ও বিধ্বংসী বিমান অভিযানে এই বিমানটি সরাসরি অংশ নিয়েছিল।

এছাড়াও বিমান জাদুঘরের সুবিশাল চত্বরে আরও স্থান পেয়েছে বিশ্বখ্যাত সুপারসনিক ফাইটার মিগ-২১, প্রশিক্ষণ বিমান এফটি-৫, ওড়িশার কিংবদন্তি জি নাট, এবং আকাশ প্রতিরক্ষার অন্যতম স্তম্ভ এফ৬ ও এ৫-১১১।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘরে পরিদর্শনের সময়

বিমান বাহিনী জাদুঘরটি প্রতি সপ্তাহের রবিবার বাদে অন্য ৬ দিন খোলা থাকে। সোম থেকে বৃহস্পতিবার জাদুঘরটি দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। আর শুক্র এবং শনিবার ও জাতীয় ছুটির দিনে সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা জাদুঘরে প্রবেশ করতে পারে।

টিকেট মূল্য

জাদুঘরে সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশে টিকেটের মূল্য ৫০ টাকা, আর বিদেশী দর্শনার্থীদের জন্য ১০০ টাকা এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য প্রবেশ মূল্য ২৫ টাকা। এছাড়াও ৩০ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে জাদুঘরের বিমান কিংবা হেলিকাপ্টারে উঠার সুযোগ রয়েছে।

যোগাযোগ
আগারগাঁও, ঢাকা
মোবাইলঃ 01769-975723, 01769-975716, 01769-975718
ইমেইলঃ bafmuseum@gmail.com
Website | Facebook Page

কিভাবে যাবেন

ঢাকার যে কোন জায়গা থেকে আগারগাঁও চলে আসুন। রাজধানীর গুলিস্থান থেকে বিহঙ্গ, হিমাচল, স্বাধীন, হাজী ট্রান্সপোর্ট, ইটিসি ট্রান্সপোর্ট এবং আরো অনেক বাসে আগারগাঁও যেতে পারবেন। বিমানবাহিনী যাদুঘর বললেই নামিয়ে দিবে। এছাড়া রামপুরা থেকে হিমাচল, আলিফ পরিবহনেও যেতে পারবেন। কিংবা নিজস্ব পরিবহন বা সিএনজি নিয়ে ঢাকার যে কোন জায়গা থেকে সহজে যেতে পারবেন।

যদি যানজট এড়িয়ে দ্রুত পৌঁছাতে চান, তবে ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে (উত্তরা-মতিঝিল) মেট্রোরেলে উঠে সরাসরি “আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশন”-এ নেমে যান। স্টেশন থেকে মাত্র ৫-৭ মিনিটের হাঁটা দূরত্ব অথবা একটি রিকশা নিয়ে সহজেই জাদুঘরের মূল প্রবেশদ্বারে পৌঁছে যেতে পারবেন।

ভ্রমণ সংক্রান্ত যে কোন তথ্য ও আপডেট জানতে ফলো করুন আমাদের ফেসবুক পেইজ এবং জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

ম্যাপে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘর

শেয়ার করুন সবার সাথে

দৃষ্টি আকর্ষণ: যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের দেশের সম্পদ। প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন। অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল নাও থাকতে পারে। অনুগ্রহ করে আপনি কোথাও ভ্রমণে যাওয়ার পূর্বে বর্তমান তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে নিয়ে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এইসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই বাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।

মন্তব্য জানান

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।