বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হল হিমালয় পর্বতমালার মাউন্ট এভারেস্ট। আজ থেকে প্রায় ৫৭ বছর আগে এই শৃঙ্গে মানুষের পায়ের প্রথম চিহ্ন পড়েছিল। এশিয়ার নেপাল ও চীনের সীমানায় অবস্থান এই সর্বোচ্চ শৃঙ্গের। মাউন্ট এভারেস্ট সম্পর্কে জানে না এমন মানুষ খুব কমই আছে। হতে পারে কারো জানার পরিধি অনেক বা কারো কম কিন্তু সবারই কম বেশি ধারণা আছে এভারেস্ট এর ব্যাপারে। আর এই উচু পর্বত শৃঙ্গের সাথে জড়িয়ে আছে অনেক ঘটনা, কিছু ঘটনা মজার আবার কিছু আশ্চর্যজনক। রয়েছে কিছু লৌকিক মিথ বা কল্পকাহিনী। আমাদের আজকের আর্টিকেল এমনই কিছু তথ্য নিয়ে।

এভারেস্ট নিয়ে সাধারন কিছু তথ্য

  • এভারেস্ট প্রায় ৬০ মিলিয়ন বছর আগে সৃষ্টি হয়েছিল।
  • অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা ৮,৮৪৮ মিটার (২৯,০২৯ ফিট)।
  • ১৯৫৩ সালের ২৯শে মে নিউজিল্যান্ডের স্যার এডমণ্ড হিলারি এবং নেপালের শেরপা তেঞ্জিং দক্ষিণ দিক থেকে সর্ব প্রথম এভারেস্টের শীর্ষে আরোহণ করেন।
  • চীন অথবা নেপালের সীমান্তে অবস্থান এর উপর ভিত্তি করে এভারেস্টের উচ্চতা নিয়ে রয়েছে কিছু মত বিরোধ রয়েছে। চীনা গবেষকদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ট থেকে এভারেস্টশৃঙ্গের উচ্চতা ২৯,০১৬ ফুট (৮,৮৪৪ মিটার) উঁচু, আবার নেপালি গবেষকদের মতে, ২৯,০৩৫ ফুট (৮,৮৪৮ মিটার)।
  • এভারেস্টের শীর্ষ নেপালের উত্তরে এবং চীন বা তিব্বতের দক্ষিণে অবস্থিত।
  • ১৮৪১ সালে জর্জ এভারেস্ট মাউন্ট এভারেস্ট আবিষ্কার করেন, উনি পেশায় একজন ভারতের সার্ভেয়ার জেনারেল ছিলেন।
  • ১৮৮৭ সালে ‘ব্রিটিশ সার্ভেয়ার অফ ইন্ডিয়া অ্যান্ড্রু ওয়া মাউন্ট’ এভারেস্টের নামকরন করেন।
  • এভারেস্টের পূর্ব নাম ছিল পিক-বি, পরবর্তীতে পিক-১৫ নামকরণ করা হয়।
  • এভারেস্টে ১৮টি ভিন্ন ভিন্ন চলাচলের রুট রয়েছে।
  • এভারেস্টে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা হতে পারে -৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট।
  • মাউন্ট এভেরেস্টের বাতাসের গতি ২০০ মাইল।
  • উচ্চতার কারণে শারীরিক ভারসাম্য বজায় রেখে এভারেস্ট শীর্ষে উঠতে ৪০দিনের মতো সময় লাগে।

মাউন্ট এভারেস্টের কিছু অজানা তথ্য

  • নেপালে অবস্থিত এই পর্বতকে নেপালের স্থানীয়রা ‘সাগরমাথা ’ বলে যার অর্থ হল “আকাশের দেবী”।
  • তিব্বতে পর্বতটিকে “চোমোলাংমা” বলা হয় যার অর্থ “মহাবিশ্বের মা” কারন এভারেস্টের শীর্ষ থেকে দেখা যায় বৌদ্ধদের পবিত্র স্থান।
  • চীনাদের কাছে এভারেস্ট “কোকোল্যাংমা” নামে পরিচিত। 
  • প্রতি বছর ভূতাত্ত্বিকগত উত্থানের কারণে গড়ে আনুমানিক ৪মিলিমিটার উচ্চতা বৃদ্ধি পায় এভেরেস্টের!
  • মাউন্ট এভেরেস্টের ২২,০০০ ফিট (৬৭০০ মিটার) উপরের ফাটলে রয়েছে খুব ছোট কালো রঙের মাকড়সার বাসা যা “হিমালয়ের জাম্পিং মাকড়শা” নামে পরিচিত ।
  • এভারেস্টে আরোহণের ক্ষেত্রে রয়েছে বয়সের পরিসীমা। নেপালের সীমান্ত দিক থেকে আরোহণ করতে গেলে ১৬ বছর বয়সী ও চীনা সীমান্তের পাশ দিয়ে আরোহণ করতে হলে ১৮-৬০ বছরের মধ্যে বয়স হতে হবে।
  • এভারেস্টে আরোহনের জন্য জন প্রতি ৪০ হাজার ডলার যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩৪ লক্ষ টাকা খরচ করতে হয়।
  • যারা পর্বতারোহীদের গাইড হিসেবে কাজ করে তাদেরকেই ‘শেরপা’ বলে। ছোট থেকেই এভারেস্টের ঠাণ্ডা পরিবেশ ও কম অক্সিজেনে বড় হবার কারণে তাদের কিছু শারীরিক পরিবর্তন আর এই কারণে এভারেস্টের শৃঙ্গে আরোহণের ক্ষেত্রে শেরপারাই সবচেয়ে এগিয়ে।
  • বৌদ্ধ শেরপাদের পর্বতে আরোহণের পূর্বে বেজ ক্যাম্পে বৌদ্ধ লামা ও তাদের দুই বা ততোধিক অনুসারীদের নিয়ে একটি পূজার আয়োজন করা হয় নিরাপদে শীর্ষে আরোহণ ও উত্তরণের জন্য। এটি ঐতিহ্য হিসেবে শত শত বছর ধরে তারা মেনে আসছে।
  • লোক মুখে প্রচলিত আছে, শেরপারা নিজেদের তাপমাত্রা বাড়াতে ও কমাতে পারে।
  • পর্বতারোহীরা খাবার হিসেবে প্রচুর ভাত ও নুডুলস খায় ।
  • এভারেস্টের বেজ ক্যাম্পের পাশে ছোট ছোট কিছু রঙ্গিন কাপড় ঝুলতে দেখা যায়। এদের বলা হয় “প্রেয়ার ফ্ল্যাগ”। পর্বত আরোহণের পূর্বে পর্বতারোহীরা নিজেদের মঙ্গল কামনা করে রঙ্গিন সুতোয় কাপড় বাঁধাকে তাদের জন্য শুভ মনে করে।
  • এভারেস্টের ৭৫০০ মিটার উপরের অঞ্চলকে “মৃত্যু অঞ্চল” হিসেবে অভিহিতকরা হয়। কারণ এখানে বেশির ভাগ মানুষের মৃত্যু ঘটে ঠাণ্ডা জনিত রোগের কারণে।
  • অবাক হলেও সত্যি, মাউন্ট এভেরেস্টের উষ্ণতম তাপমাত্রা হল -২০ ডিগ্রী। এই তাপমাত্রায় এভারেস্টে বেশিক্ষন থাকা যায় না তবে ব্যাতিক্রম বাবু শেরপা, যিনি ১৬ ঘণ্টা মাউন্ট এভেরেস্টের শীর্ষে অবস্থান করেছিলেন।
  • মাউন্ট এভেরেস্টের অক্সিজেনের পরিমান সমুদ্র স্তরে উপস্থিত অক্সিজেনেরতিন ভাগের এক ভাগ।
  • গুগলের একটি দল গুগল মানচিত্রে এভারেস্টের ছবি দেওয়ার জন্য ১২ দিন ধরে মাউন্ট এভারেস্টের ছবি তুলেছিলো।

এভারেস্টে সর্বপ্রথম

  • ১৯২১ সালে তিব্বতের উত্তর দিক থেকে সর্ব প্রথম একজন ব্রিটিশ পর্বত আরোহণের চেষ্টা করে ব্যার্থ হন।
  • ১৮৯৯ সালে সর্বপ্রথম এভারেস্টের উচ্চতা নির্ণয় করা হয়।
  • ১৯৪৮ সালে সর্বপ্রথম শারীরিক ভাবে অক্ষম ব্যাক্তি হিসেবে নিউ ইয়র্কের টম হুইটকার পর্বত আরোহণ করেন।
  • ১৯৭৪ সালে প্রথম অক্সিজেন ছাড়া পর্বতারোহী ইতালির রেইনহোল্ড মেসনার ও তার সঙ্গী পিটার হাবলার।
  • প্রথম যুগল হিসেবে তাশি ও নুঙ্গশী মালিক একসাথে এভেরেস্টের চূড়ায় উঠে।
  • প্রথম নারী হিসেবে এভেরেস্টের চূড়ায় উঠে জুনকো তাবেই।
  • প্রথম বাঙ্গালী হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন সত্যব্রত দাস।
  • প্রথম বাঙ্গালী নারী হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন শিপ্রা মজুমদার।
  • সবচেয়ে বেশি বয়সী ব্যাক্তি জাপানের ইউইচিরো মিউরায় ২০১৩তে পর্বত আরোহণ করেন , বয়স  ৮০।
  • মার্কিন যুক্তরাজ্যের জর্দান রোমেরো একই বছর ২০১৩ তে পাহারের চূড়ায় উঠে সবচেয়ে কম বয়সী ব্যাক্তি হিসেবে, বয়স  ১৩
  • কেন্টন কুল নামের একজন হাইকার সর্বপ্রথম এভেরেস্টের শীর্ষ থেকে ‘দি উইয়িক সিগন্যালের’ মাধ্যমে  টুইটারে  টুইট করেন।
  • ২০০৫ সালে এভারেস্টের শীর্ষ স্থানে সর্বপ্রথম এক নেপালি দম্পতি বিয়ে করেছিল। তারা বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার জন্য মাত্র  ১০ মিনিটের জন্য এভেরেস্টের শীর্ষে অবস্থান করেছিল।

এভারেস্ট জয়ে বাংলাদেশ

  • ২০১০ সালের ২৩ মে সর্বপ্রথম বাংলাদেশি হিসেবে মুসা ইব্রাহিম, পেশায় একজন সাংবাদিক এভারেস্ট জয় করেন ।
  • ২০১১ সালের ২১ মে, এম এ মুহিত , পেশায় একজন বেসরকারী কোম্পানির কর্মকর্তা, দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্টের শীর্ষে আরোহণ করেন।
  • ১৯ মে, ২০১২ সালে প্রথম নারী বাংলাদেশি হিসেবে নিশাত মজুমদার, পেশায় একজন একাউন্টেন্ট এভারেস্টে পা রাখেন।
  • ২৬ মে, ২০১২ সালে সবচেয়ে কম বয়সী বাংলাদেশি এবং দ্বিতীয় নারী হিসেবে ওয়াসাফিয়া নাজরিন, পেশায় মানবসেবা ও উন্নয়নকর্মী ,এভারেস্ট জয় করেন।
  • ২০ মে, ২০১৩ সালে পঞ্চম বাংলাদেশী হিসেবে সজল খালেদ নামের একজন চলচিত্রকার এভারেস্টের শীর্ষে উঠেন কিন্তু পর্বত থেকে নামার সময় তার হঠাৎ মৃত্যু ঘটে।

এভারেস্ট নিয়ে কিছু ভুল তথ্য

  • জর্জ এভারেস্টের নামানুসারে এভারেস্টের নামকরন করা হলেও অনেকে এভেরেস্টকে এভার-এস্ট বলে কিন্তু আসল উচ্চারণ হল এভে-রেস্ট ।
  • অনেকেই মনে করেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বা উচু পর্বত হল হিমালয় পর্বত। কিন্তু হিমালয় কোন একটি নির্দিষ্টপর্বত না ১৫০টি বৃহৎ পর্বতের সমষ্টিতে গড়ে উঠেছে হিমালয় পর্বত মালা। আর এর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু পর্বত হল মাউন্ট এভারেস্ট।
  • আরেকটি মজার কিন্তু ভুল তথ্য হল সবাই ভাবে এভারেস্টে আরোহণ করা সবচেয়ে কঠিন ও পর্বতারোহীদের মৃত্যু হার একমাত্র এই শৃঙ্গেই সবচেয়ে বেশি। আসলে কিন্তু এটা সঠিক না। এভারেস্টের কাছাকাছি অবস্থিত আরেকটা পর্বত- মাউন্ট গডউইন অস্টেন, হিমালয়ের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ পর্বত যা আরোহণে মৃত্যু হার হল শতকরা ২৬ যেখানে এভারেস্টের মৃত্যু হার শতকরা ৪।

কিছু পরিসংখ্যান

  • পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ৫২৯৪ জন এভারেস্টের শীর্ষে উঠার চেষ্টা করেছে।
  • ২০০০ এরও বেশি পর্বতারোহী এভারেস্টের শীর্ষে পৌঁছেছেন।
  • কামি রিতা শেরপা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক এভারেস্টের শীর্ষে উঠার রেকর্ড অর্জন করেন।
  • ১৯২৪ সাল থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত, পাহাড়ের চূড়ায় উঠার পথে প্রায় ২৯৫টি মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে যা মোট পর্বতারোহীদের ৩.৫%।
  • প্রতি ১০ জন সফল পর্বতারোহীর মধ্যে  ১জন পর্বতারোহীর জীবন মৃত্যুর সম্মুখীন হয়।
  • ১৯৬৯ সাল থেকে প্রতি বছরে একজনের মৃত্যু ঘটে ঠাণ্ডা, তুষারের জন্য চোখে দেখতে না পারা,দমবন্ধ, ক্ষুধা ও হাইপোথার্মিয়ার কারণে। 
  • ১৯৭৪ সালে কেউ পর্বত আরোহণের চেষ্টা না করার কারণে এই বছরকে এভেরেস্টের ইতিহাসে “কুমারী বছর” হিসেবে গন্য করা হয় ।
  • পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তিব্বতের পাশ দিয়ে এভেরেস্টে আরোহণের ক্ষেত্রে বেশীরভাগ পর্বতারোহী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

এভারেস্ট নিয়ে আরও মজার কিংবা অজানা তথ্য জানা থাকলে কমেন্ট করে জানিয়ে দিন সবাইকে। মজার ও অজানার পৃথিবীর এই শীর্ষ বিন্দুর তথ্য গুলো সবাইকে জানাতে শেয়ার করুন আপনার ফেসবুক ওয়ালে।

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।