প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ‘গোয়া’ (Goa) ভারতের একটি রাজ্য। গোয়া নামটি মাথায় আসলে আমরা অনেকেই মনে করি গোয়া একটি সমুদ্র সৈকতের নাম। আদতে গোয়া ভারতের (India) একটি ছোট রাজ্য এবং এই গোয়াতেই আছে অনেক গুলো সমুদ্র সৈকত। শুধু সমুদ্র সৈকত নয় এইখানে আছে ঝর্ণা, সবুজ পাহাড়, নদী, প্রাচীন গুহা, পুরনো গির্জা ও মন্দির, দৃষ্টিনন্দন নাড়িকেল গাছের সারি, স্বচ্চ পানির ফোয়ারা। এইসব কিছু মিলেই গোয়া পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণের নাম। আমাদের অতিথি লেখক জাকিয়া সুলতানা মুক্তা ঘুরে এসে জানাচ্ছেন গোয়া ভ্রমণ নিয়ে তার অভিজ্ঞতা, মজার তথ্য ও গোয়া ভ্রমণের নানা টিপস।

বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করবো ভেবে একটা ভ্রমণ পরিকল্পনা করেছিলাম। গন্তব্য ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় ছোট্ট রাজ্য ‘গোয়া’। একসময় যেটি পর্তুগীজ উপনিবেশ ছিলো। এমনকি ভারত স্বাধীন হওয়ার পরেও রাজ্যটি ভারতের অধীন হয়নি। পরবর্তী সময়ে ১৯৬১ সালে যেটির ভূমির মালিকানা ভারত সরকারের হস্তগত হয় বলে জানা যায়।

যাই হোক, ‘গোয়া’ ভ্রমণের জন্য জুন মাস ভ্রমণপিপাসুদের জন্য আকর্ষনীয় নয়। কারণ ‘গোয়া’ মূলত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত হওয়ার পাশাপাশি, ওখানকার নানান আনন্দ-আয়োজনের জন্য বিখ্যাত। এই সময়টা থেকে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয় বিধায়, জুন মাস থেকে শুরু করে বৃষ্টির মৌসুমটা ‘গোয়া’তে চলে ‘অফ সিজন’। শীতকালটা হলো ‘গোয়া’তে বেড়ানোর জন্য উপযুক্ত সময়।

কিন্তু নিজেদের ব্যক্তিগত প্রোগ্রাম থাকায়, এই সময়টাতেই ‘গোয়া’তে বেড়াতে গিয়েছিলাম। মধ্যবিত্তদের জন্য ‘গোয়া’ ভ্রমণ উচ্চাভিলাষী চিন্তা বলে, সবাই বলাবলি করছিলো। কিন্তু তবুও আমরা দু’জনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যাবোই। হ্যাঁ! গিয়ে বুঝেছি, আসলেই ওখানে বেড়াতে হলে ‘সিজন’-এ বেড়াতে গেলেই মজা বেশি এবং তা বেশ অনেকখানিই ব্যয়বহুল। এখন আমাদের কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি –

আমাদের রুট প্ল্যান

প্রথমে বেনাপোল বর্ডার পার হয়ে কলকাতা গিয়েছিলাম। কলকাতা থেকে ট্রেনে করে গোয়া গেলাম। ট্রেনে এসি বার্থ তো পাইইনি, নন এসি থ্রি-টিয়ারের সীট জোগাড় করতে পেরেছিলাম। তাতে আমাদের জনপ্রতি পড়েছিলো এগারো’শ (১১০০) রুপী করে। ‘অমরাবতী এক্সপ্রেস’, ছাড়বে কলকাতার হাওড়া রেলস্টেশন থেকে আর গন্তব্যে পৌঁছাবে ‘ভাস্কো দ্য গামা রেলস্টেশন’-এ গিয়ে। তবে আমরা সময় বাঁচানোর জন্য এক স্টেশন আগেই নেমে গিয়েছিলাম, স্টেশনের নাম ছিলো ‘মারগাঁও রেলস্টেশন’। সময় লেগেছিলো প্রায় চল্লিশ ঘন্টার মতন। রেলস্টেশন থেকে গেস্টহাউস পর্যন্ত যেতে লাগলো প্রাইভেট কারে করে সতেরশ (১৭০০) রুপী।

ফেরার দিন রেস্টহাউস থেকে ‘গোয়া বিমানবন্দর’ যেতে আমাদের যেতে ট্যাক্সিতে লেগেছিলো বারো’শ (১২০০) রুপী। বিমানের রিটার্ন টিকেট এক সপ্তাহ আগে কেটে রাখায়, আমাদের তুলনামূলক কম খরচ হয়েছিলো। জনপ্রতি এগারো হাজার (১১,০০০) রুপী পড়েছিলো। এখানে উল্লেখ্য যে, আপনারা যদি ভ্রমণের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকেন, তবে মাস দেড়েক আগে বিমানের টিকেট কেটে রাখলে জন প্রতি এগারো হাজার (১১,০০০) রুপীর কমেই আসা-যাওয়ার খরচ হয়ে যাবে।

আর ট্রেনের ব্যাপারে আগে থেকে টিকেট কেটে রাখলে এসিসহ ভালো সীট পাওয়ার সুবিধা পাবেন। খরচ পড়বে জন প্রতি আড়াই হাজার (২৫০০) রুপীর মতন। তবে রেলে এসি-নন এসি খুব বেশি পার্থক্য করে না, যদি আপনি ভ্রমণ পিপাসু হোন আর কষ্ট করতে আপত্তি না থাকে। ওখানকার রেল ব্যবস্থা খুবই ভালো। রেলের খাবার-দাবাড় ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতাও প্রশংসনীয়। কিন্তু টয়লেটের অবস্থা ভালো হলেও, টয়লেট ব্যবহারের ব্যবস্থা একেবারেই জঘণ্য। এককথায় যা তা! এই একটাই অসুবিধা আসলে।

ভ্রমণের জন্য ‘গোয়া’ কেমন স্থান?

গোয়া নিঃসন্দেহে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য কাঙ্ক্ষিত একটি ভ্রমণ-গন্তব্য বটে। এখানকার পরিবেশ ও আতিথেয়তার তুলনা মেলা ভার। তবে যদি ভূ-প্রকৃতির কথা বর্ণনা করতে চাই, সেক্ষেত্রে বলতেই হবে, এটি সমুদ্রতীরবর্তী পাহাড়ী রাজ্য। যেখানে কী নেই? সবই আছে। সমুদ্র থেকে সোজা উঠে যাওয়া পাহাড় আছে। পাহাড় ঘেরা সমুদ্রসৈকত আছে। সাথে আছে দুর্দান্ত সব ঝর্ণাধারা। খাল-বিল তো আছেই, আছে উত্তাল সমুদ্রের টানে ছুটে যাওয়া বিশাল বিশাল নদী। বন আছে, সমতলভূমিও আছে। ‘গোয়া’তে অনেকগুলো সমুদ্রসৈকত আছে। সবগুলোই সুন্দর, দৃষ্টিনন্দন।

‘গোয়া’তে ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা

‘গোয়া’ রাজ্যটি পুরোটাই আরব সাগরের পাশে অবস্থিত। এটি দু’টি ভাগে বিভক্ত, যথাক্রমে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চল। মূলত উত্তরাঞ্চলীয় উপকূলগুলোই বেশি সুন্দর আর মনোরম। দক্ষিণাঞ্চলের দিকটাও সুন্দর, তবে ওদিকটাতে মূলত ওদের প্রশাসনিক অবকাঠামো বেশি। পুরো রাজ্যটাতেই পর্তুগীজ শাসনের আবহ বিদ্যমান। মনে হবে যেন ওটা ভারতের বুকে একটুকরো ইউরোপীয় গ্রাম বুঝি।

ঘুরে বেড়ানোর জন্য তাই দক্ষিণাঞ্চল যেদিন বেছে নিবেন, সেদিন উত্তরাঞ্চলের দিকে না যাওয়াটাই ভালো। আবার উত্তরাঞ্চলের দিকে রওনা করলে, একই দিনে দক্ষিণাঞ্চলের দিকে যাওয়াটা বোকামি হবে। বেড়াতে বের হওয়ার জন্য প্রাইভেট কার, মোটরবাইক খুব সহজেই পাবেন। কিন্তু ‘গোয়া’তে ঘুরে বেড়ানোর জন্য প্রাইভেট কারের খরচটাই সবচাইতে ব্যয়বহুল। দিন প্রতি তাতে খরচ পড়বে আড়াই থেকে তিন হাজার (২৫০০-৩০০০) রুপী। আর যদি আপনি নিজে গাড়ি চালাতে চান তবুও খরচ পড়বে পনেশ থেকে সতেরশ (১৭০০) রুপী।

এদিকে মোটরসাইকেল বা স্কুটারে করে বেড়াতে চাইলে, দিনপ্রতি তিনশ (৩০০) রুপী হলেই সারাদিন ওটা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। উল্লেখ্য, নিজে গাড়ী চালাতে চাইলে বা মোটরসাইকেল চালাতে চাইলে, অবশ্যই ড্রাইভিং লাইসেন্স লাগবে। এমনকি বাংলাদেশী লাইসেন্স হলেও কোন অসুবিধা নাই। একটা লাইসেন্স হলেই হলো।

আরেকটা কথা, কারে ড্রাইভার সহ ভাড়া পাওয়া গেলেও বাইক চালানোর জন্য কোন গাইড পাবেন না। তাই যারা বাইক চালাতে পারেন, তাদের জন্য মূল সুবিধা ওখানে। এর বাইরে সারাদিনের তেল খরচ বাবদ, যা খরচ হবে সেটা আপনাদের উপরেই। আর লাইসেন্স ছাড়া যদি গাড়ী বা বাইক চালাতে চান, তবে মনে রাখতে হবে পুলিশের কাছে ধরা খেলে একদিনের জন্য পেনাল্টি হবে ষোল শত (১৬০০) রুপী। আর মাফ চেয়ে কমাতে চাইলে, এক থেকে দুইশ (১০০-২০০) রুপী গোপনে ঘুষ দিলেই কাজ হয়ে যাবে।

গোয়া’তে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা

থাকার জন্য ‘গোয়া’তে হোটেল-রিসোর্টের ব্যবস্থা তো খুব ভালোই আছে। এখন কেমন খরচ করবেন, তার উপর নির্ভর করছে সবকিছু। তবে বলা যায়, এখানকার রাজকীয় হোটেল-রিসোর্টগুলো ছাড়াও সাধারণের থাকার জন্যও বেশ ভালো ভালো থাকার জায়গা রয়েছে এবং হোটেল বা রিসোর্ট ম্যানেজমেন্টের উপর আপনি খুব খুশিই থাকবেন। কারণ, ওরা খুবই ভালো আর সহযোগিতা করায় উৎসাহী হয়ে থাকে।

আমরা তো খুবই সুন্দর আর ছিমছাম ধরণের একটা রিসোর্টে মাত্র পনেশ রুপী (১৫০০) দিয়েই এসি রুমে থেকেছি। শুনেছি ছয়শ রুপীতেও (৬০০) ভালো রুমের ব্যবস্থা এখানে আছে। একটু খোঁজ নিয়ে আসতে হবে। আর OYO বা অন্যান্য রুম বুকিং সার্ভিসের সাহায্য নিলে সুবিধা বেশি হবে। কমে পাওয়া পাবে।

অফ-সিজন জন্য আমাদের রিসোর্টে খাওয়ার ব্যবস্থা ছিলো না যদিও, সিজনে এই সমস্যাটা নেই। তবে অফ-সিজনের খরচপাতির হিসাবইতো দিচ্ছি, সিজনে তা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে নিশ্চিতভাবেই। খাওয়ার জন্য আমরা বাইরেই বেড়িয়েছি বরাবর এবং রাস্তার পাশের দোকান থেকে শুরু করে ভালো ভালো রেস্টুরেন্টেও খেয়েছি। খাবার আপনার যেমনই লাগুক (ভালো না লাগার আসলে কোন কারণই নেই!), খাবারের মান এখানে দুর্দান্ত। কারণ, চারদিনে একবারের জন্যও আমাদের কারোর পেটের সমস্যা বা অন্যান্য কোন শারীরিক সমস্যা পোহাতে হয়নি।

খাবারের মেনুতে যা যা অর্ডার করবেন, মনে রাখবেন, যদি আপনি নিতান্তই ভোজনরসিক অথবা পেটুক গোছের কেউ না হয়ে থাকেন, তবে একজনের জন্য করা খাবারের অর্ডারে দু’জনে বেশ আরাম করেই খেয়ে উঠতে পারবেন। কিন্তু চাইলেই এখানকার কোথাও খাবার ঝটপট আপনাকে সার্ভ করবে না। অন্তত বিশ মিনিট থেকে শুরু করে আধা ঘন্টাতো অপেক্ষা করতেই হবে, কারণ খাবার ওরা আমাদের এখানকার মত আগেই তৈরি করে রাখে না। বাসি-পঁচা খাবার আপনাকে কেউ সার্ভ করবে না।

দিনেতো অবশ্যই, সারারাতই আপনি কোন না কোন খাবার খাওয়া এবং পানীয় পানের রেস্টুরেন্ট খোলা পাবেন। উল্লেখ্য, এখানে কম খরচের মধ্যে ভেজ থালি একশ বিশ (১২০) রুপী থেকে একশ চল্লিশ (১৪০) রুপীতে পাবেন। থালিতে পাবেন দু’টো সবজি, একপ্রকারের ডাল, টক দই, দুই পিস রুটি, স্টিম রাইস, দুই পিস পাঁপড়। নন-ভেজ থালি পাবেন একশ ষাট (১৬০) থেকে একশ আশি (১৮০) রুপীতেই পাবেন। থালিতে থাকবে সবজি, মাটন/চিকেন, ডাল, টকদই, রুটি দুই পিস, স্টিম রাইস।

আর যদি নাস্তার জন্য কম খরচে খেতে চান, তবে ওখানকার ঐতিহ্যবাহী ‘পাও-ভাজি’ খেতে পারেন। মূলত এটা সেঁকা বন রুটি আর ছানার ডাল(চটপটির ডাল), সাথে এক বিচিত্র স্বাস্থ্যবান মরিচ ভাজা। বেগুনির মতন করে ভাজা আরকি। আর দুধ চা, যাতে আবার গোলাপজল মেশানো থাকে কোথাও কোথাও। এসবের জন্য জন প্রতি ত্রিশ(৩০) রুপী পড়বে। এছাড়া হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি, কাশ্মীরী বিরিয়ানী তিনশ থেকে চারশো(৩০০-৪০০) রুপীতে পাবেন। এছাড়াও আরও কমে খেতে চাইলে নুডুলস খেতে পারবেন সত্তর থেকে আশি(৭০-৮০) রুপীতে।

আবারও উল্লেখ করছি, সব খাবারই একজনের জন্য অর্ডার করে দুইজনে অনায়াসে পেট ভরে খেতে পারবেন। পুরো ‘গোয়া’ রাজ্যটাই একটা খাবার আর পানীয়ের রাজ্য। তাই যারা পান করতে আগ্রহী বেশি, এটা তাদের জন্য স্বর্গরাজ্য। মনের সুখ মিটিয়ে পান করতে পারবেন।

কিন্তু কোনভাবেই রাস্তায় সিগারেট ধরাতে পারবেন না। এমনকি সব রেস্টুরেন্টেও সিগারেট খাওয়ার সুবিধা পাবেন না। যদি উক্ত নিয়ম অমান্য করেন, তবে তাৎক্ষণিক আপনাকে পুলিশ এসে জরিমানা করবে। এমনকি থানাতেও নিয়ে যেতে পারে। ‘গোয়া’তে পানীয় যত সহজলভ্য, সিগারেট বা কোনধরনের ড্রাগস নেয়ার সুযোগ ঠিক ততটাই কঠিন। সুতরাং এসব ব্যাপারে স্মার্টনেস দেখাতে গেলেই বিপদে পড়বেন।

গোয়া’র দর্শনীয় স্থান

পুরো ‘গোয়া’ রাজ্যটাই সুন্দর। আপনি আপনার খেয়াল খুশি মতন যেদিকেই যান না কেন, কিছু না কিছু দেখার মতন-উপভোগ করার মতন পাবেনই। এখানে প্রাচীন আমলের পর্তুগীজ অনেকগুলো দূর্গ ও ডাচদের গড়া লাইটহাউজও একটা আছে (যেমন- ছাফোড়া ফোর্ট, এগোয়াণ্ডা ফোর্ট, ট্যারাকোল ফোর্ট ইত্যাদি!), পুরোনো জেলখানা আছে, আছে অনেক পুরোনো সব মন্দির-বিশেষত চার্চগুলো বেশি পুরোনো আর নান্দনিক (যেমন- সালিগাঁও চার্চ!), দুধসাগর ঝর্ণার দেখা পাওয়া, দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ করার সুযোগ, এছাড়া আছে জাদুঘর, ওয়াক্স মিউজিয়াম, ক্যাসিনোতে যাওয়ার সুযোগ। উপরন্তু আছে রিভার ক্রুজ, বোটিং, প্যারাগ্লাইডিং, স্কুবা ড্রাইভিং করার সুযোগ।

যতদূর জেনেছি, প্যারাগ্লাইডিং করার জন্য পনেশ থেকে দুই হাজার রুপী (১৫০০-২০০০) লাগবে, বোটিং করার জন্য প্রতিজন পাঁচশ (৫০০) রুপী খরচ দিতে হয়। রিভার ক্রুজ উপভোগ করার জন্য জনপ্রতি চারশ (৪০০) রুপী লাগবে। অন্যকিছু জানার সুযোগ হয়নি।

আর যেটা সবচেয়ে বেশি আছে, তা হলো, কিছুদূর পরপরই পাহাড়ী সব সমুদ্রসৈকত। মূলত পালোলেম সমুদ্রসৈকত, আরাম্বোল সমুদ্রসৈকত, বাঘা সমুদ্রসৈকত, বাগাতোর সমুদ্রসৈকত, আঞ্জুনা সমুদ্রসৈকত, বব মার্লে সমুদ্রসৈকত- এই সমুদ্রসৈকত গুলো তুলনামূলক পর্যটকদের জন্য বেশি আকর্ষণীয় সমুদ্রসৈকত।

এছাড়াও আরও অনেক সমুদ্রসৈকতই আছে, সবই সুন্দর। সিজনে সবগুলো সমুদ্রসৈকতেই নানান আনন্দ আয়োজন থাকলেও, অফ সিজনে অনেক সমুদ্রসৈকতেই কিছু থাকে না। তাই অফসিজনে যেতে চাইলে, যাওয়ার আগে জেনে যাবেন কোন সমুদ্রসৈকতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ভালোভাবে চালু আছে। নইলে সমস্যায় পড়বেন। কিছুও পাবেন না, ঝামেলায় পড়বেন।

মূলত নাইট পার্টিগুলোর জন্যই এখানকার সমুদ্রসৈকতগুলো বিখ্যাত। কিন্তু অফসিজনে এই সুবিধাগুলো থাকে না। সিজনে গেলেও সেসব নাইট পার্টির সুবিধা থাকা সমুদ্রসৈকতের নির্দিষ্ট স্থানে ঢুকতে হলে, টাকা খরচ করতে হবে। সেটা শুনেছি, পাঁচশ থেকে এক হাজার (৫০০-১০০০) রুপীও লাগে।

এখানে উল্লেখ্য যে, ‘গোয়া’র বেশিরভাগ সমুদ্রসৈকতের সুন্দর সুন্দর স্থানগুলো হলো ব্যক্তিমালিকানাধীন। তাই ওগুলোতে যেতে হলে বেশ খরচ করতে হয়।

নিরাপত্তাহীনতা ও অন্যান্য বিপত্তি

‘গোয়া’ খুবই নিরাপদ ও নিরিবিলি শান্ত ভ্রমণ স্থান। এখানে তেমন কোন বিপত্তি ঘটার সুযোগ নেই। তবে এখানে ভ্রমণের সময় অবশ্যই যথেষ্ট মানি একচেঞ্জ করিয়ে নিয়ে যাবেন। কেবল ডেভিট-ক্রেডিট কার্ডে খরচের বাইরেও, নগদ ক্যাশে যেসব খরচ আপনাকে করতে হবে তার জন্য যথেষ্ট রুপী না নিয়ে আসলে ঝামেলায় পড়বেন। কারণ, এখানে বাংলাদেশী টাকা একচেঞ্জ করা ভীষণ ভীষণ ভীষণ কঠিন।

তবে ডলার হলে কোনই অসুবিধা নাই। এখানকার চলাফেরা খুব আরামদায়ক। গাড়ির হর্ণের কোন শব্দ এখানে আপনি পাবেন না। বরং চলতে গিয়ে কোন সাহায্য লাগলে, যে কারোর সাহায্য চাইলেই সে আপনাকে সাহায্য করবে। শতভাগ মানুষ এখানে আন্তরিক।

এখানকার মানুষের মাঝে ধর্ম-গোত্র-বর্ণের নানান ভেদ থাকলেও, তারা খুবই সহনশীল ও অমায়িক। ইভ টিজিং করতে পারবেন না। মদ খেয়ে মাতলামি করা বা উচ্চ গতিতে এখানে গাড়ি চালাতে পারবেন না। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা বা যত্রতত্র গাড়ি পার্ক করার সুযোগও এখানে নেই।

মজার ব্যাপার হলো, ‘গোয়া’তে যত না খাবারের রেস্টুরেন্ট আছে, তার চেয়ে বেশি আছে বার। প্রতিটা রেস্টুরেন্টেই বারের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু মূল টুইস্টটা হলো এই যে, গোয়ার মূল অধিবাসীদের দশ ভাগও মদ খায় না, এমনকি এই উদ্দাম সংস্কৃতিটাকে অপছন্দ করে। তবে পর্যটকদের ব্যাপারে তাদের কোন এলার্জি নেই।

বিশেষ আকর্ষনীয় কিছু

হিন্দি জনপ্রিয় অনেক মুভির শুটিং ‘গোয়া’তে হয়েছে। সেসব শুটিং স্পটগুলোও একেকটা আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট। সেসব সিনেমার মধ্যে ‘জোশ’, ‘দিল চাহতা হ্যা’, ‘বোম্বে’ মুভিগুলো থেকে শুরু করে হালের ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’, ‘সিংঘাম’, ‘দৃশ্যাম’, ‘ধামাল’, ‘আশিকী টু’, ‘গোলমাল’ ‘ডিয়ার জিন্দেগী’সহ আরও আরও অনেক জননন্দিত ও বিখ্যাত-অখ্যাত মুভি এখানে শ্যুট করা হয়েছে।

সুতরাং গুগল করে সেসব স্পটগুলো খুঁজে নিয়ে বেড়াতে গেলেও অনেক ভালো লাগবে। আমরাও অনেকগুলো স্পটে ওভাবে খুঁজে খুঁজে গিয়েছিলাম। এই পদ্ধতিটা অনেক মজার ছিলো আমাদের জন্য।

পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে পরামর্শ

‘গোয়া’ খুব সাজানো-গোছানো সুন্দর একটি অঞ্চল। ছবির মতন সুন্দর এই স্থানটিতে এমনিতেই ময়লা-আবর্জনার স্তুপ বা যেখানে-সেখানে অপরিচ্ছন্নতার কোন ছাপ না থাকলেও, ব্যক্তিগতভাবে আমার পর্যবেক্ষণ বলে, স্বয়ং ভারতীয়রাও পর্যটক হিসেবে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন নয়।

কিন্তু একজন পরিবেশ-সচেতন শিক্ষিত ভ্রমণকারী হিসেবে, অবশ্যই আপনাকে পরিবেশ নষ্ট হয় এমন কোন কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে শুরু টিস্যু ও অন্যান্য আবর্জনা যত্রতত্র ফেলবেন না দয়া করে। পরিবেশ-দূষণ করা অন্যায়, আমরা সবাই এই অন্যায় করা থেকে বিরত থাকবো বলে আশা করছি।

বিশেষ দ্রষ্টব্য

এই ভ্রমণ-পরিকল্পনার সার্বিক পরামর্শদাতা হিসেবে আমাদের দু’জনের বন্ধু Razone Rahi -কে বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিতে চাই। বন্ধুর আন্তরিক পরামর্শ ছাড়া এই ভ্রমণ সুসম্পন্ন করা কঠিন হতো। আর ‘গোয়া’র জীবনটার মূল ভাবনাটুকু হলো এক কথায়-

“No Tension! No Hurry! Enjoy your life as your wish.”

সবার জন্য শুভ কামনা।

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।