নীলনদ, ফারাও, পিরামিড, মমি আর প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস বিজড়িত দেশ মিশর। নীল নদের তীরে অবস্থিত মিশরের প্রতিটি জায়গায় জড়িয়ে আছে প্রাচীন ইতিহাসের গন্ধ। এই এপ্রিলেই পর্যটক সফিক এহসান ঘুরে দেখেছেন মিশরের অনেক ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান। ৫ রাত ৬ দিনের মিশর ভ্রমণের সকল অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন আমাদের ভ্রমণ গাইডে।

মূল লেখা শুরু করার আগে প্রথমেই মিশর সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক ধারণা নেয়া যাক। মিশর অত্যন্ত প্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি দেশ। এর ইতিহাস শুরু হয়েছে খৃষ্টপূর্ব ৬ হাজার বছরেরও আগে থেকে। ভৌগলিক ভাবে এটি আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর পূর্ব দিকে অবস্থিত; মিশরের দক্ষিণে সুদান, পশ্চিমে লিবিয়া, উত্তরে ভূমধ্য মহাসাগর আর পূর্বে রয়েছে ইজরায়েল ও লোহিত সাগর। মরুভূমির দেশ মিশরের মূল লোকালয় গড়ে উঠেছে এর একমাত্র নদী “নাইল” এর দুকূল ধরে।

প্রায় সাড়ে ৯ কোটি জনগণের মুসলিম প্রধান এই দেশটির প্রধান ভাষা (মিশরীয়) আরবী এবং বেশির ভাগ মানুষই ইংরেজি একদমই জানে না। জানে না মানে “ইয়েস-নো-ভেরিগুড” পর্যন্ত বোঝে না! ফলে ভাল মানের হোটেল-রেস্টুরেন্ট, শপিং মল এবং হাতে গোনা কিছু উবার ড্রাইভার ব্যতীত বেশীরভাগ মানুষের সাথেই কথপোকথন বেশ কষ্টসাধ্য! মিশরের মুদ্রার নাম “ইজিপশিয়ান পাউন্ড” যা বাংলা টাকায় প্রায় ৫ টাকার সমান।

মিশরে ডলার ভাঙ্গানো সহজ কিন্তু পাউন্ড ভাঙ্গিয়ে ডলার/টাকা কেনা বেশ কঠিন! তাই পুরো ট্যুরে আমাদেরকে খুব হিসেব করে ডলার ভাঙ্গাতে হয়েছে। একটা ভাল ব্যাপার হচ্ছে ডলারের রেট এয়ারপোর্ট কিংবা যেকোন বৈধ মানি এক্সচেঞ্জ/ব্যাংকে একই। তবে রাজধানী কায়রো ছাড়া বাকি জায়গাগুলোতে এক্সচেঞ্জ পাওয়া মুশকিল; সেক্ষেত্রে কিছুটা লসে লোকালী ভাঙ্গাতে হয়।

মিশরে সবচেয়ে দামী জিনিসের নাম পানি! ৬০০ মি.লি. পানির দাম জায়গা ভেদে ৫ পাউন্ড থেকে শুরু করে ৪০ পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে! বিদেশী দেখলেই এদের পানির দাম বেড়ে যায়… বোতলের গায়ে রেট লেখা না থাকায় যেখানে যে দাম চাইবে আপনি সেটাই দিতে বাধ্য! তবে প্রায় প্রতিটি মসজিদেই ফিল্টারের বিশুদ্ধ খাবার পানি ফ্রি তে নেয়ার ব্যবস্থা আছে। আর কিনে খেতে হলে সবচেয়ে ভাল হচ্ছে সুপার শপ থেকে ১.৫ লিটারের বোতল কিনে খাওয়া! সুপার শপে রেট চেঞ্জ করার সুযোগ নেই তাই সর্বনিন্ম দরটা ওখানেই পাওয়া যায়। আমি ২.৬৫ পাউন্ডেও পানি পেয়েছি সুপার শপে!

এ তো গেল প্রাথমিক ধারণা; চলুন এবার জানা যাক যাওয়া আসা, থাকা খাওয়া এবং ঘুরাঘুরির বিস্তারিত। ঢাকা থেকে কায়রো যাওয়ার ডাইরেক্ট কোন ফ্লাইট নেই তবে বেশ কয়েকটা কানেক্টিং ফ্লাইট আছে। আমরা গিয়েছিলাম সৌদি এয়ারলাইন্স-এ যেটা জেদ্দাতে কানেক্টিং ছিল। বাংলাদেশ থেকে সৌদি এয়ারলাইন্স-এ মূলতঃ দুই শ্রেনীর মানুষই জেদ্দা যায়। এক- ওমরা করতে; দুই- লেবার ভিসায়! (কাউকে অসম্মান করার জন্য বলছি না) এই দুই শ্রেণীর যাত্রি সর্বস্ব ফ্লাইট হওয়ায় স্টাফ এবং বিমানবালাদের সার্ভিস আমাদের বিমান বাংলাদেশের চেয়েও জঘন্য! তুলনা করলে বলা যায়- সরকারী হাসপাতালের নার্স-আয়াদের লেভেলের ব্যবহার! আমি পারতপক্ষে কাউকে সৌদি এয়ারলাইন্সে না যাওয়ার জন্য বলব। কম খরচে কুয়েত অথবা আমিরাত এয়ারলাইন্সের টিকিট কাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে এক্ষেত্রে। ২/৩ ঘন্টার ট্রানজিট বাদে প্লেনের জার্নি প্রায় ৯/১০ ঘন্টার।

কায়রো এয়ারপোর্ট নেমে ইমিগ্রেশন পার হয়ে প্রথমেই কিছু ডলার ভাঙ্গিয়ে নিন। হোটেল আগে থেকে বুকিং করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। booking.com বা এজাতীয় ওয়েবসাইট থেকে ডিটেইলস দেখে নিয়ে বুকিং দিলে বেস্ট রেট পাওয়া যায়। বেশিরভাগ হোটেলে ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টরী তবে ওয়াইফাই ফ্রি না! এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলের দূরুত্ব আগে থেকেই গুগল ম্যাপে দেখে নিন এবং অন্তত কায়রো সিটির ম্যাপটা অফলাইন ডাউনলোড করে নিয়ে যাবেন। হোটেলে যাবার জন্য এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে ট্যাক্সি নিতে পারেন। ভাড়া যা-ই বলুক আপনি প্রতি কি.মি. মোটামুটি ৫ পাউন্ড হারে হিসাব করে একটু দামাদামি করলেই সস্তায় পেয়ে যাবেন। সম্ভব হলে হোটেলে ফেরার পথেই কোন মোবাইল অপারেটরের শপ থেকে সিম কিনে নিন। সিমের দাম অনেক বেশি মনে হলেও এটা অনেক কাজে দেবে। ইন্টারনেট হাতের নাগালে পাওয়ার কারণে উবার বা হোটেল বুক করা, ড্রাইভারের সাথে কথা বলা, বাস/ট্রেনের টিকেট কাটা সহ নানা কাজে আপনাকে পুরো ট্রিপে প্রচুর স্বাচ্ছন্দ এনে দেবে।

হোটেল চেক-ইন এর ফর্মালিটি শেষ করে রুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে খেয়ে চাইলে একটু বিশ্রাম করে নিতে পারেন। অথবা বের হয়ে পরতে পারেন কায়রো শহর ঘুরতে! অন্যান্য মেগা সিটির মত কায়রো শহরও কখনও ঘুমায় না। রাত ২/৩টা পর্যন্ত রাস্তায় মানুষের ভিড় থাকে। আর সিকিউরিটি নিয়ে কোন চিন্তা নেই, সুতরাং আপনি নিশ্চিন্তে ঘুরতে পারেন!

তবে কিছু বিষয় মাথায় রাখবেন- মিশরে বিশেষ করে কায়রোতে বিদেশীদের জন্য প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই জিনিসপত্রের চড়া দাম। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় কায়রো থেকে লুক্সর (প্রায় ৭০০ কি.মি.) যাওয়ার জন্য লোক ট্রেনের দুই ধরনের কোচ আছে। AC-1 এবং AC-2 এর ভাড়া যথাক্রমে ১২০ ও ৬০ পাউন্ড। কিন্তু এর একটিও বিদেশীদের জন্য নয়! বিদেশীদের কিনতে হবে আলাদা টিকিট যার দাম প্রায় ৮০ ডলার মানে প্রায় ১০ গুণ! এরকমভাবে কায়রো শহরের প্রতিটি লোকাল শপে বিদেশীদের মুরগি জ্ঞান করা হয়। একটি মোবাইল সিম ১০ জিবি ইন্টারনেট সহ কাস্টমার কেয়ার থেকে কিনলে ২৫০ পাউন্ড। সেই সিম লোকাল দোকানে নেবে ৪৫০ পাউন্ড! যেকোন সুভ্যেনিয়র এরা দাম চাওয়া শুরু করবে ডলারে। তারপর সেটা চলে আসবে পাউন্ডে। আপনি ভাল বারগেইন করতে পারলে দেখা যাবে ফাইনালী ১০ ভাগের এক ভাগ দামে দিয়ে দিয়েছে! (রাস্তা ঘাটে হাতে করে নিয়ে এটা ওটা যারা বিক্রি করে তারা সব কিছুতেই বলে “তু দলার, বেরি চিপ” অর্থাৎ 2 Dollar, Very Cheap! তারপরেই সেটা হয়ে যাবে ২০ পাউন্ড। ফাইনালী ১০ পাউন্ডে ২/৩ টা দিয়ে দেবে!)

ট্যাক্সি ড্রাইভার থেকে শুরু করে ঘোড়ার গাড়ীর ড্রাইভার, ভাল করে দরদাম না করে নিলেই খবর আছে। প্রায় প্রতিটা লোকই যেন বিদেশীদের পকেট কাটার জন্য যেন মুখিয়ে থাকে! তবে স্বস্তির খবর হচ্ছে- কায়রোতেও উবার চলে এবং উবারের ভাড়া বাংলাদেশের চেয়েও সস্তা! আর অভারঅল সিকিউরিটি খুব কড়া তাই আপনি যেচে পড়ে ঠকতে না চাইলে কেউ আপনাকে জোর করে ঠকাতে পারবে না। চুরি/বাটপারী/ছিনতাই করে নেবার তো প্রশ্নই আসে না।

প্রথম পর্বঃ কায়রো ও গিজা

কায়রোতে ঘুরার জন্য অনেক ট্রাভেল এজেন্সি আছে যারা বিভিন্ন প্যাকেজে মিউজিয়াম, পিরামিড ও অন্যান্য দর্শনীয় স্থানসমূহ ঘুরিয়ে দেখায়। তবে সেগুলো খুবই ব্যয়বহুল। তারচেয়ে বরং ট্যাক্সি নিয়ে নিজেরাই চলে গেলে অনেক স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারবেন। তবে হিস্টোরিক্যাল জায়গাগুলোতে গাইড ছাড়া ঘুরলে অনেক আকর্ষনীয় তথ্য থেকে বঞ্চিত হতে হবে। সেক্ষেত্রে টিকিট কাটার পরেই অপেক্ষমাণ ভ্রাম্যমান গাইডদের সাথে দরদাম করে কাউকে নিয়ে নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। গাইডের খরচ খুব বেশিও না। শুরুতে ওরা অনেক বেশি চায় তবে আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি স্থান ভেদে গাইডের খরচ কম বেশি হলেও মোটামুটিভাবে এটা টিকিটের দামের প্রায় এক তৃতীয়াংশ। (উদাহরণ স্বরুপঃ লুক্সরের কারনক মন্দিরের টিকিট ছিল জনপ্রতি ১৫০ পাউন্ড আর আমরা গাইড নিয়েছিলাম ৫০ পাউন্ড দিয়ে)

মোহাম্মদ আলী মসজিদ কম্পাউন্ড

কায়রোতে দর্শনীয় স্থান সমূহের মধ্যে “মাস্ট ওয়াচ” হিসেবে প্রথমেই বলব ওল্ড কায়রোর সিটাডেল মোহাম্মদ আলী মসজিদ কম্পাউন্ড। এটা সকাল ৮টায় খুলে, সুতরাং হোটেল থেকে নাস্তা করে নিয়ে এটা দিয়েই সকালটা শুরু করা যেতে পারে। টিকিটের মূল্য জনপ্রতি ১৪০ পাউন্ড।

পুরো কম্পাউন্ডের ভেতর দুইটি মসজিদ, দুইটি মিউজিয়াম, ২য় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত প্রাচীন দূর্গ (সিটাডেল) আর মিলিটারী বেজ ক্যাম্প আছে। আছে লাগেজ রাখার জন্য ফ্রি লকার এবং ফ্রি ওয়াসরুমের ব্যবস্থা। এই কম্পাউন্ড-এর সব স্থাপনাতেই এর ইতিহাস বর্ণনা করা আছে তাই আলাদা কোন গাইড দরকার হয়নি আমাদের। দূর্গের প্রাচীরে দাঁড়িয়ে প্রায় পুরো কায়রো শহর এক সাথে দেখা যায়। পুরোটা ঘুরে দেখতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগবে। এখান থেকে সোজা চলে যেতে পারেন কায়রো মিউজিয়াম।

কায়রো মিউজিয়াম

কায়রোতে অনেকগুলো মিউজিয়াম আছে; আমরা যেটাতে গিয়েছিলাম সেটা গুগল ম্যাপে দেখাবে “দ্য রয়াল মামি’স হল” নামে। মিউজিয়ামে একটা মজার ব্যাপার হচ্ছে- টিকিট ৩ ধরণের। সাধারণ টিকিট ১৬০ পাউন্ড যা দিয়ে আপনি শুধুমাত্র “রয়্যাল মমি”-এর রুম ব্যতীত বাকি সব কিছু দেখতে পারবেন। “রয়্যাল মমি”-এর রুমে ঢুকতে চাইলে আপনাকে কাটতে হবে স্পেশাল টিকিট যার মূল্য ৩০০ পাউন্ড। আর মিউজিয়ামের ভেতর ছবি তুলতে চাইলে আরও ৫০ পাউন্ড দিয়ে কিনতে হবে “ফটোগ্রাফি পাস”। তবে এই পাসও শুধু মাত্র “রয়্যাল মমি” বাদে বাকি অংশের জন্য প্রযোজ্য!

বাস্তবতা হলো- “রয়্যাল মমি”-এর রুমে এক নাগাড়ে ১০/১২টা মমি পাশাপাশি সাজানো, এছাড়া আর কোন স্পেশালিটি নেই! একই রকম মমি বাইরেও আছে কয়েকটা, সুতরাং আলাদা করে ১৪০ পাউন্ড বেশী দিয়ে স্পেশাল টিকিট কাটা লস মনে হওয়া স্বাভাবিক। আর ফটো পাস পুরোপুরি লোক দেখানো। ভেতরে ঢুকার পর পাস কেউ দেখতে চায় না, সবাই গণহারে মোবাইল দিয়ে ছবি তুলতে পারে। তাই আমি বলব কায়রো মিউজিয়ামে শুধু ১৬০ পাউন্ড এর সাধারণ টিকিট কাটুন এবং আরও ৫০/৬০ পাউন্ড দিয়ে বরং একজন গাইড ভাড়া করুন। অনেক মজার ও চমকপ্রদ তথ্য জানতে পারবেন যা কোথাও লেখা নেই! (যেমনঃ মুর্তি যদি দুই হাত দুই পাশে সোজা করে ঝুলিয়ে রাখে তাহলে এর মানে হচ্ছে সে জীবিত। কিন্তু হাত যদি বুকের ওপর ক্রস করা থাকে এর মানে সে মৃত। আবার মুর্তির এক পা যদি আরেক পা থেকে সামনের দিকে এগিয়ে থাকে তার মানে সে যুদ্ধরত!)

কায়রো মিউজিয়ামের ভেতরটা দেখে মনে হবে অনেক অগোছালো। যেখান থেকে যে মূর্তি, মমি বা পাথর পেয়েছে তা-ই এনে এর মধ্যে ঢুকিয়েছে! ধুলোবালি মাকড়শার জাল কিছুই যেন পরিষ্কার করা হয়নি ভিনটেজ ফ্লেবারটা বজায় রাখার জন্য। দোতলা পুরো মিউজিয়াম ঘুরে দেখতে এক থেকে দেড় ঘন্টা সময় লাগবে। এখান থেকে বের হয়ে কাছাকাছি কোন রেস্টুরেন্ট থেকে লাঞ্চ করে নিন। অতঃপর চলে যান গিজা পিরামিড কম্পাউন্ডে।

গিজা পিরামিড কম্পাউন্ড

মিশরের পিরামিড বলতেই আমরা যে ছবিগুলো দেখি তা মূলতঃ এই গিজা পিরামিড কম্পাউন্ডের ছবি। এখানে পাশাপাশি তিনটি বড় পিরামিড আছে যা যথাক্রমে দাদা, বাবা ও নাতির। তিনটির সাইজ দেখলেই সহজে বুঝা যায় কোনটা কার! এই তিনটির আশপাশেই ছোট ছোট আরও অনেকগুলো পিরামিড আছে যেগুলো রানী, সর্বোচ্চ পুরোহিত ও অন্যান্য বড় পদের রাজসভাসদবর্গের। গিজা পিরামিড কম্পাউন্ডে ঢুকতে জনপ্রতি ১৬০ পাউন্ডের টিকিট কাটতে হবে। এই টিকিটে প্রথম পিরামিডের প্রায় ৫০ ফুটের মত উচু পর্যন্ত ওঠা যায়। তারপর একটা গেট আছে যেটা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে আলাদা টিকেট কাটতে হয়।

ভেতরে যারা ঢুকেছিল তারা বলেছে- মাত্র এক মিটার উচ্চতার খুবই সরু একটা পথ দিয়ে কুজো হয়ে প্রায় দশতলা বিল্ডিং এর সমান উচ্চতা উঠতে হয়। শেষ মাথায় ছোট্ট একটা রুম আছে যার ভেতর কয়েকটা মাটির কলসি/পানির পাত্র সাদৃশ্য জিনিস পত্র আছে। কোন মমি বা অন্য কোনকিছু নেই। টিকিটের দামের চেয়েও বড় কথা হলো- জায়গাটা প্রচণ্ড দুর্গম এবং প্রাকৃতিক ভাবে কোন আলো বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা নেই। কৃত্তিমভাবে শুধু আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনেকেই ভেতরে ঢুকে শ্বাসকষ্ট বোধ করেছে। একসাথে লাইন ধরে এগুতে হয় বলে এমনিতেই দম বন্ধ লাগে কিন্তু কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লেও ফেরত আসার কোন উপায় নেই! ওয়ান ওয়ে পাথ হওয়ার কারণে লাইন ধরে ঢুকে আবার লাইনের সাথেই বের হতে হবে।

এরকম বর্ণনা শুনে আমরা ভেতরে যাবার আগ্রহ করিনি। পিরামিডের সামনে ঘণ্টাপ্রতি ৩৫০ পাউন্ড রেটে ঘোড়ার গাড়ি বা উট ভাড়া পাওয়া যায়। তবে প্রথমেই উট/ঘোড়া ভাড়া না করে আগে প্রথম পিরামিডের সাথে ছবি-টবি তুলে নিন। মরুভূমির কড়া রৌদ থেকে বাঁচতে এক্ষেত্রে সান ব্লক ক্রিম, হ্যাট/ছাতা ও ফুলহাতা জামা খুব কাজে দেবে। এটা দেখা শেষ করে চলে যান “প্যানোরামা গিজা/ক্যামেল রাইডিং” স্পটে। এখানে এক সাথে তিনটা পিরামিডের দারুন ভিয়্যু পাওয়া যাবে। আমাদের কাছে উটে করে এক ঘণ্টা ঘোরা যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। বরং একে একে তিনজন উটের পিঠে উঠে শুধু ছবি তোলার জন্য ৫০ পাউন্ড দিয়ে ভাড়া নিয়েছিলাম। তবে মরুভুমিতে ঘুরে ঘুরে পিরামিড দেখার শখ থাকলে আধঘন্টা বা আরও অল্প সময়ের জন্যেও ভাড়া করা যায়। এক্ষেত্রে খুব ভাল করে দামাদামি করে নেবেন। নয়তো বানিজ্যমেলার মত উটে ওঠার পর মাথায় একটা রুমাল পরিয়ে দিয়ে সেটার জন্যেও পরে এক্সট্রা চার্জ চেয়ে বসবে!

এখানে যতটুকু ইচ্ছা সময় কাটিয়ে ৫টার একটু আগেই চলে যান স্পিংক্স এর সামনে। কারণ ৫টার পর কাউকেই আর কম্পাউন্ডের ভেতর থাকতে দেয়া হয় না। গ্রিক পুরাণ অনুসারে স্পিংক্স হচ্ছে সিংহের শরীরের নারীর মাথা বিশিষ্ট ডানাওয়ালা এক দানব। তবে মিশরে এটাকে দানব হিসেবে নয় বরং রামসেস/ফারাউনের শক্তি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রে সিংহের শরীরে রাজার নিজের মাথা বসানো থাকে। (বিঃদ্রঃ মিশরে সাধারণ রাজাকে রামসেস আর ৩০ বছরের অধিক সময় ক্ষমতায় থাকা রামসেসকে ফারাউন বলা হয়)। এখানে দাঁড়িয়ে ছবিটবি তুলে ৫টার মধ্যে আপনাকে বের হয়ে যেতে হবে।

আমরা গিজা কম্পাউন্ডে কোন গাইড ভাড়া করিনি। কারণ ইতিহাস জানার জন্য আমরা আলাদা করে ২৫০ পাউন্ড দিয়ে টিকিট কেটেছিলাম সাউন্ড এন্ড লাইট শো-এর। স্পিংক্স অফ গিজার সামনে সন্ধ্যা ৭টা থেকে এটা শুরু হয়। পিরামিডে ব্যবহৃত পাথরের সাইজ, ওজন থেকে শুরু করে তিন রাজার রাজ্যকাল ও অন্যান্য ইতিহাস সহ এক ঘণ্টাব্যপী দারুন একটা লাইট শো হয় এখানে।

অনেকেই পুরো শো’টি ভিডিও করতে ব্যস্ত থাকেন। আমার ব্যক্তিগত মতামত এই ভিডিও আপনি জীবনেও কোনদিন রিভিউ করার সময় পাবেন না। খামোখা ভিডিও বা ছবি তোলাতে সময় নষ্ট না করে মন দিয়ে শো উপভোগ করুন। কারণ পুরো শো এর ভিডিও বা ছবি আপনি ইন্টারনেটেই হাজার হাজার পেয়ে যাবেন!

স্টেপ পিরামিড ও মিউজিয়াম

এটা গিজা পিরামিডের মত অতো বড় না হলেও বয়সের দিক দিয়ে সর্বাপেক্ষা পুরোনো। তাই সময় থাকলে বাকেট লিস্টে এটাকেও রাখতে পারেন। একদিনে কভার না হওয়ায় আমরা এটাকে শেষের দিনের জন্য রেখে দিয়েছিলাম। (রিটার্ন ফ্লাইট রাতে হওয়ায় আমরা সকালে চেক আউট করে লাগেজগুলো হোটেলের দায়িত্বে রেখে স্টেপ পিরামিড গিয়ে দুপুর পর্যন্ত ওখানে থেকে শপিং মলে ঘোরাঘুরি করে একবারে ডিনার শেষ করে এসে লাগেজ নিয়ে সোজা এয়ারপোর্টের ট্যাক্সি ধরেছিলাম!)

স্টেপ পিরামিডের লোকাল নাম পিরামিড অফ ডিজসের, এটি সাক্কারায় অবস্থিত। এটিও সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে কিন্তু ঢুকতে হয় ৪টার মধ্যে। মিউজিয়াম সহ পিরামিডে প্রবেশ ফি ১৫০ পাউন্ড। প্রথমেই মিউজিয়াম পড়বে তাই ট্যাক্সি/উবার নিয়ে মিউজিয়াম পর্যন্ত যাওয়া ভাল। সেখান থেকে হেঁটে গিয়ে পিরামিড দেখে ফেরার সময় পিরামিডের গেটের সামনে থেকে ফেরার ট্যাক্সি/উবার ধরা যায়। অথবা প্যাকেজে ট্যাক্সি ভাড়া করতে পারেন, সেক্ষেত্রে খরচ বেশি হলেও হাঁটাহাটি কম করা লাগবে। স্টেপ পিরামিডের সামনেও আপনি গাইড ভাড়া করতে পারেন তবে এখানে খুব বেশি ইতিহাস জানার মত কিছু নেই। তবে গাইড থাকলে সবগুলো স্থাপনা ঘুরে দেখাবে যেটা একা একা ঘুরার মত আগ্রহ পাবেন না।

হাতে সময় থাকলে কায়রোতে আরও যা যা করা যেতো তা হচ্ছে- কায়রো টাওয়ারে ওঠা (যদিও আলি মসজিদ কম্পাউন্ড থেকেই পুরো কায়রো দেখা যায়!), অন্যান্য মসজিদ ও গির্জাগুলো ভ্রমণ, খান এল-খালিলি নামক ঐতিহাসিক বাজার ভ্রমণ ও সস্তায় কেনাকাটা আর অবশ্যই অবশ্যই রিভার ক্রুজে ডিনার! ক্রুজে ডিনারের সাথে ফ্রিতে লাইভ “বেলি ড্যান্সও” দেখতে পারবেন। আমার মতে কায়রোতে পুরোপুরি দুইদিন দুই রাত কাটানোই যথেষ্ট। মাঝে একদিন আলেক্সেন্দারিয়ার জন্য বরাদ্দ রাখলে জার্নি ও বিশ্রামের ব্যালেন্স হয়ে যাবে!

আলেক্সন্দারিয়া

আলেক্সেন্দারিয়া হচ্ছে কায়রো থেকে ২২০ কিলোমিটার দূরবর্তী একটি পোর্ট সিটি। ভূমধ্যসাগর বিধৌত এই শহরটি খৃষ্টপূর্ব প্রায় ২০০০ বছর আগে থেকেই গ্রীক ও রোমান শাষণামলেও ছিল বানিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র। “দ্য গ্রেট কিং” আলেক্সেন্ডারের শাষনামলে এটাকে মিশরের রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। খৃষ্টপূর্ব ২৮০-২৪৭ সালের দিকে তৈরি হওয়া “আলেক্সেন্দারিয়া বাতিঘর” ততকালীন সময়ের সুউচ্চতম মানবসৃষ্ট টাওয়ার/স্থাপনা হিসেবে সপ্তাশ্চর্যের একটি ছিল। ১৬০০ শতাব্দীতে অটোম্যান শাষণামলে ধর্মীয় ও ব্যবসায়ীক দিক থেকে কায়রোর গুরুত্ব বাড়তে থাকার আগ পর্যন্ত এটিই ছিল মিশরের সবচেয়ে ব্যস্ততম শহর। এমনকি এখনও এটি মিশরের ২য় জনবহুল শহর হিসেবে পরিচিত।

ডে আউটিং এর জন্য আলেক্সেন্দারিয়া খুবই চমৎকার একটি জায়গা। এখানে ঐতিহাসিক স্থানসমূহ ছাড়াও সমূদ্রে ডাইভিং করে বা স্পীডবোটে চড়ে বা সেইলিং করে সময় কাটানো যায়। খাবার হিসেবে সী-ফুড মাস্ট ট্রাই!

আলেক্সেন্দারিয়া যাবার জন্য ভোর বেলা থেকে শুরু করে মাঝরাত পর্যন্ত ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাস আছে। কায়রোতে GO BUS এবং BLUE BUS নামের দুইটা বাস সার্ভিস আছে। দুইটাই মার্সিডিস বেঞ্জ এর এসি বাস এবং সার্ভিস বেশ ভাল! কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে সকালে ৮টা নাগাদ বাসে উঠে পরতে পারেন। ৮০-১০০ পাউন্ড ভাড়া নেবে, সময় লাগবে আড়াই ঘন্টার মত। বাস থেকে নেমে প্রথমেই দেখে ফেলুন-

পম্পে’স পিলার

দুইটি স্পিংক্স আর একটি বিশাল লম্বা পিলার সম্বলিত এই স্থানের প্রবেশ মূল্য ৮০ পাউন্ড। ভেতরে ছবি তোলার দারুন সব জায়গা পাবেন। পিলারের নিচে এখনও খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। সুরঙ্গ ধরে যেটুকু যাওয়া যায় তার ভেতর পথরের তৈরি মহিষের মূর্তি সহ আরও কিছু গুহা ও প্রাচীন নিদর্শন দেখতে পাবেন। এখানে মোটামুটি ঘণ্টাখানেক সময় কাটিয়ে সরাসরি সী-বীচে চলে যেতে পারেন।

সিটাডেল অফ কাইটবে

সিটাডেল বলতে বোঝায় দূর্গ বা প্রাসাদ। এটার ঠিক পাশেই আলেক্সেন্দারিয়ার বাতিঘর (লাইট হাউজ অফ আলেক্সেন্ডার) ছিল যা পরে (৯৫৬-১৩২৩ খৃষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে) তিনটি বড় ভূমিকম্পে পুরোপুরি ভেঙ্গে যায়। কাইটবে দূর্গ এক সময় সৈন্যবাহিনীর ঘাটি ছিল।

দূর্গে ঢুকতে ৬০ পাউন্ড দিয়ে টিকিট কাটতে হবে। ভেতরে কয়েকটি পুরোনো কামান ছাড়া তেমন কোন ঐতিহাসিক নিদর্শন নেই, তবে দূর্গের পেছনের দিক থেকে ভূমধ্যসাগরের যে ভিউ পাওয়া যায় তা দেখেই এক বেলা অনায়াসে পাড় করে দেয়া যাবে! এখান থেকে বেরিয়ে পার্শ্ববর্তী কোন রেস্টুরেন্ট থেকে লাঞ্চ করে নিতে পারেন। ডাইভিং বা সেইলিং এর জন্য বোট ভাড়া পাওয়া যায় এখান থেকেই।

মন্তাজা প্যালেস

ডাইভিং বা সেইলিং ছাড়াও আলেক্সেন্দারিয়াতে প্রচুর লাইব্রেরি বইপ্রেমীদের জন্য আছে। তবে আমরা বিকালটা কাটিয়েছিলাম মন্তাজা প্যালেস ও তার বাগানে। এখানে কোন টিকিট নেই কারণ প্যালেসের ভেতরে ঢোকা যায় না! তবে বাগান ও প্রাসাদ সংলগ্ন সমূদ্র তট সবার জন্য উন্মুক্ত।

এখানে সেই অর্থে কোন বালুময় বীচ নেই তবে অল্প কিছুটা জায়গা আছে যেখানে আপনি চাইলে সাগরের পানিতে পা ভিজিয়ে হাঁটতে পারেন।বিকালটা এখানে কাটিয়ে চাইলে সন্ধ্যার দিকের বাসে কায়রো ফিরতে পারেন অথবা একেবারে ডিনার করে রাতেও ফিরতে পারেন।

দ্বিতীয় পর্বঃ লুক্সর

কায়রোর মতই ইতিহাস সমৃদ্ধ মিশরের আরেকটি প্রাচীন শহর হচ্ছে লুক্সর! ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে কায়রোর চেয়ে অনেক বেশি ভাল লেগেছে লুক্সরকে। সাধারণত লোকজন কায়রো থেকে আগে হুরঘাদা যায়, সেখান থেকে লুক্সর। কিন্তু আমাদের হাতে সময় কম ছিল বলে আমরা সরাসরি লুক্সর চলে গিয়েছি। হুরঘাদাও আলেক্সেন্দারিয়ার মতই একটি পোর্ট সিটি। তবে এটা লোহিত সাগরের পাড়ে অবস্থিত। হুরঘাদা মূলত ইতিহাসের জন্য নয়, বরং মেরিন ডাইভিং, প্যারাসেইলিং, জীপ সাফারি ও অন্যান্য এক্টিভিটির জন্য প্রসিদ্ধ।

কায়রো থেকে লুক্সর যাবার জন্য বাস এবং ট্রেন আছে। তবে বিদেশীদের জন্য ট্রেনের যে ভাড়া তাতে আমাদের কাছে বাসই অনেক বেশি সাশ্রয়ী মনে হয়েছে। জার্নি করার অভ্যাস থাকলে রাতের বাসে যাওয়া যেতে পারে। এতে সময়ের সদ্ব্যবহার ও এক রাতের হোটেল ভাড়া বেঁচে যাবে! ভাড়া লাগবে ২০০-২৫০ পাউন্ড এর মত। প্রায় ৬৫০ কিলোমিটারের এই জার্নিতে সময় লাগে ৮/৯ ঘণ্টা। বলে রাখা ভাল, এসি বাস হলেও সিটগুলো চেয়ারকোচ নয়। তাই সারারাতের জার্নির ধকল একদম কম হবে না। আশার কথা হলো রাস্তায় কোন ঝাকুনি নেই; ট্রেনের মতই নিরবিচ্ছিন্ন জার্নি! আমরা রাত এগারোটার বাসে উঠে পরদিন সকাল আটটা নাগাদ পৌছেছি। আগে থেকেই (ট্যাক্স ভ্যাট সহ ৪৪০ পাউন্ডে) বুক করে রাখা হোটেলে চেক ইন করে প্যাকেট খাবার দিয়ে নাস্তা সেরে হোটেলের সুইমিং পুলে গোসল করে বিছানায় একটু গড়িয়ে নিয়েছি। দুপুরে বের হয়ে লাঞ্চ সেরে আমরা গিয়েছিলাম লুক্সর মিউজিয়ামে।

লুক্সর মিউজিয়াম

কায়রোর তুলনায় লুক্সর মিউজিয়াম অনেক বেশি গুছানো ও পরিপাটি। এন্ট্রি ফি ১৪০ পাউন্ড। খোলা থাকে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা ও বিকাল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।

কায়রো মিউজিয়াম লোকজনের কোলাহল আর পায়চারীতে যেমন গমগমে এখানে তেমনটা নয়। এর ভেতরে গাইড নিয়ে প্রবেশ নিষেধ বা নিলেও কথা বলা যাবে না। প্রতিটি নিদর্শনের গায়ে নেমপ্লেট ও বর্ণনা দেয়া আছে তাই জোরে কথা বলা বা ধারাবর্ণনা করা নিষিদ্ধ। এখানে ছবি তোলাতে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই তবে ট্রাইপড লাগিয়ে ফটো বা ভিডিগ্রাফি করতে চাইলে আলাদা টিকেট নিতে হবে।

লুক্সর মিউজিয়ামে মূলতঃ বিভিন্ন সময়ে রাজা/ফারাউনদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, যুদ্ধের সারঞ্জাম, রাজা-রানী ও দেব-দেবীদের মূর্তি আছে। এখানে মোটামুটি ঘণ্টাখানেক সময় কাটিয়ে চলে যাওয়া যেতে পারে কারনক টেম্পলে।

কারনক টেম্পল

কারনক টেম্পলে দুই ধরনের টিকিট আছে। ১৫০ পাউন্ডের টিকিট দিনের বেলার জন্য প্রযোজ্য। সন্ধ্যা ৭টা থেকে এখানেও সাউন্ড এন্ড লাইট শো দেখায় যেটার টিকিট ২৫০ পাউন্ড। একই জায়গা দিনের আলোতে আর রাতের অন্ধকারে দেখিয়ে দুইবার টিকিট বিক্রির এই আইডিয়াটা আমার কাছে অভিনব লেগেছে! তবে দুইবারে দেখার ফ্লেভার সম্পূর্ণ দুই রকমের। কেউ যদি গিজা স্পিংক্স এর লাইট শো দেখে থাকে তাহলে সে কারনকের রাতের শো ইগনোর করতে পারে।

দিনের বেলায় গেলে সম্পূর্ন মন্দিরের ইতিহাস ও স্থাপনাসমূহ দেখা ও ছবি তোলা যাবে। এক্ষেত্রে একজন গাইড সাথে নিলে ভাল হয়। এটা মূলতঃ ওদের মৃত্যুর দেবতা “আমোন”-এর মন্দির। পুরো মন্দিরের দেয়াল ও স্থাপনা জুড়ে তারই ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে প্রাচীন সাংকেতিক হরফে। এর বিশাল আকৃতির পিলারগুলো একেকটা একেক রাজার সময়ে তৈরি এবং প্রতিটি পিলারে ঐ রাজার ইতিহাস প্রাচীন হরফে লেখা আছে। পুরোটা ঘুরে দেখতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় প্রয়োজন।

রাতের শো এন্ট্রি গেট থেকে শুরু হয়। হেঁটে কিছুদূর যাবার পর থামতে হয়। সেখানে লেজার লাইট এবং সাউন্ড দিয়ে কিছু ইতিহাস বর্ণনা করা হয়। তারপর আবার হেঁটে কিছুটা গিয়ে আবার বর্ণনা। এভাবে কয়েক ধাপে থেমে থেমে ফাইনালী অডিটরিয়ামে নিয়ে যায়। পুরো ব্যাপারটাতে যথেষ্ট নাটকীয়তা আছে যা খুব মজা লেগেছে আমাদের।

লুক্সর টেম্পল

লুক্সর টেম্পল রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে তাই আমরা এটা ঐদিনের সবার শেষে রেখেছিলাম। ইন ফ্যাক্ট লুক্সর মন্দিরের রাতের ভিউটাই বেশি আকর্ষনীয়। এন্ট্রি গেট থেকে মুল মন্দির পর্যন্ত লম্বা রাস্তা ও দু’পাশের আলোকসজ্জা দারুন লাগবে। এখানেও বেশ কিছু মূর্তি আর স্থাপনা রয়েছে। এখান থেকে শেষ করে মাঝরাত পর্যন্ত নীল নদের পাড়ে বসে আড্ডা দিয়ে ডিনার করে হোটেলে ফিরেছি আমরা।

হট বেলুন রাইড

আপনি যদি লুক্সর এসে হট বেলুন রাইড না নেন তাহলে বিরাট মিস করবেন! অনলাইনের বিভিন্ন সাইট থেকে বা হোটেলে (এমনকি ট্যাক্সি ড্রাইভারদের) বলে আগের রাতেই হট বেলুন-এর বুকিং কনফার্ম করে নিন। সীজনাল ফ্যাক্ট ভেদে হট বেলুনে জনপ্রতি ৪৫-৬০ ডলার করে নেবে। আমাদেরকে আমাদের ট্যাক্সি ড্রাইভার (আহমেদ) বুকিং করে দিয়েছিল। (এজন্য অবশ্য কোনপ্রকার রিসিট ছাড়া তাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাসের ওপর ১০০ পাউন্ড দিয়ে রেখেছিলাম আগেরদিন বিকেলে। তবে ওদের প্রত্যেকটা ট্যাক্সির গায়ে নাম্বার দেয়া আছে যা দিয়ে পুলিশকে ইনফর্ম করে আধ ঘণ্টার মধ্যে যে কাউকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব!) তবে লুক্সরের সবচেয়ে ভাল লাগার জায়গাটা হলো- এখানে প্রত্যেকটা মানুষকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত আর আন্তরিক মনে হয়েছে। কায়রোর মানুষগুলোর মত এরা ধান্ধাবাজ প্রকৃতির না। ছোট্ট একটা শহরে প্রায় সবাই সবাইকে চেনে বলে মনে হলো। বেশ সহজ সরল সুখি একটা শহর এই লুক্সর!

হট বেলুনের বুকিং দেবার সময় আপনার পাসপোর্ট-এর ফটোকপি আর হোটেলের নাম এবং রুম নাম্বার বলে রাখতে হবে। হোটেলেও আগে থেকে বলে রাখতে হবে যে পরদিন ভোরে আপনার বেলুন রাইড আছে, তারা যেন নির্দিষ্ট সময়ে আপনাকে একটা “ওয়্যাক আপ কল” দেয়। সেই সাথে ওরা আপনার নাস্তাও প্যাকেট করে রেখে দেবে। বেলুন রাইড শুরু হয় শেষ রাত থেকে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত। তাই আপনাকে মোটামুটি ৩:৩০ টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে রেডি থাকতে হবে। ৪টার মধ্যে আপনাকে হোটেল থেকে সাইটে নেবার জন্য গাড়ি আসবে। গাড়িতে করে নদীর পশ্চিম পাশে নিয়ে যাওয়া এবং রাইড শেষে আবার হোটেলে পৌছে দেয়া পর্যন্ত ওদের প্যাকেজ। (তবে আমরা রাইড শেষে ওখান থেকেই কিংস ভ্যালী চলে গেছি) রাইডিং সাইটে পৌঁছাতে প্রায় ৫টা বেজে যায়। এখানে আপনাকে ৮ জনের দলে ভাগ করে দিয়ে রাইডিং ও ল্যান্ডিং-এর সময়ের নিয়ম কানুন বুঝিয়ে দেয়া হবে। হট বেলুন প্রায় ২৫০০ মিটার পর্যন্ত উপরে ওঠে। ওপর থেকে সূর্যোদয় আর পুরো লুক্সরকে একসাথে দেখার ফিলিংস বলে বুঝানোর মত না।

বেলুন ল্যান্ড করাটা বেশ কষ্ট সাপেক্ষ এবং বাতাসের মতিগতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। আপনার ভাগ্য ভাল থাকলে এটা রাইডিং সাইটের আশপাশেই ল্যান্ড করতে পারে কিংবা কয়েক মাইল দূরে গিয়ে কারও গম ক্ষেতের ওপরও ল্যান্ড করতে পারে! তবে যেখানেই ল্যান্ড করুক গাড়ি আপনাকে সেখান থেকেই পিক করবে। বেলুন থেকে নামতে নামতে মোটামুটি ৭টা বেজে যায়। এখান থেকে হোটেলে গিয়ে ফ্রেস হয়ে আবার শুরু করা যায়। তবে তাতে প্রায় ২/৩ ঘণ্টা সময় নষ্ট হবে। আমরা তাই ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলে রেখেছিলাম যে ল্যান্ডিং সাইট থেকেই যেন আমাদের পিক করে বাকি স্পটগুলো ঘুরিয়ে দেখায়।

উল্লেখ্য লুক্সরে উবার নেই। তবে সারাদিনের জন্য ট্যাক্সি ভাড়া করলে তুলনামূলক বেশ সস্তায় পাওয়া যায়। আমরা মাত্র ৩০০ পাউন্ডে আহমেদকে (মিশরের সকল ট্যাক্সি/বোট/ঘোড়াওয়ালার ডাক নাম হয় আহমেদ নয়তো মোহাম্মদ!) ভাড়া করেছিলাম। চুক্তি ছিল নদীর পশ্চিম পাড়ের সবগুলো দর্শনীয় স্থান ঘুরিয়ে দুপুরের পর আমাদেরকে হোটেলে ড্রপ করবে। ফ্রিতে সে আমাদের গাইডের মত অনেক তথ্য ও সাজেশন দিয়েছিল। এই ভদ্রলোকের মোবাইল নাম্বার কারও দরকার হলে আমার কাছ থেকে নিয়ে নিতে পারেন। আহমেদ আমাদের সবচেয়ে বড় উপকারটা করেছিল মসজিদের ভেতরে ফিল্টারের ঠাণ্ডা পানির সন্ধান দিয়ে! আমাদের যার যা কিছু ছিল সব ভর্তি করে ঠাণ্ডা পানি নিয়ে সারাদিন সেই পানি খেয়েছি। মরুভুমিতে পানির চেয়ে দামী জিনিস যে আর কিছু নেই তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি মিশরে গিয়ে। তবে লুক্সরে মসজিদ ছাড়াও অনেক বাসার মালিক রাস্তার পাশে ফ্রি ফিল্টার পানির ব্যবস্থা করে রেখেছেন যা দেখে সত্যি খুব ভাল লেগেছে। পুরো লুক্সর ট্যুরে আমদের এক বোতল পানিও টাকা দিয়ে কিনে খেতে হয়নি!

ভ্যালি অফ দ্যা কিংস

এটা আসলে নিউ ভ্যালী গভারনরেট-এর প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের একটি সম্পত্তি। এখনও খোঁড়াখুঁড়ি চলছে এবং পুরো এলাকা থেকে সকল জনসাধারণকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বিশাল দুই-তিনটা পাহাড় জুড়ে বিভিন্ন রাজ্যকালের রাজাদের কবর। মূলতঃ পিরামিডের যুগের রাজারা যখন প্রত্যেকে নিজের সমাধির ওপর পিরামিড বানাতে শুরু করেছিল তখন পিরামিডগুলোতে ডাকাতদের আনাগোনা প্রচুর বেড়ে গিয়েছিল। প্রতিটা পিরামিড মানেই একটি করে রাজার কবর আর কবর মানেই মমি, সাথে অসীম ধন সম্পদ। একেকটা রাজার মমির ওপরের ঢাকনাতেই নানা রকমের দামী দামী রত্ন-পাথর থাকতো। রাজার চেহারার মুখোশ বানানো হতো প্রায় ১১ কেজি খাঁটি স্বর্ণ দিয়ে! সেই সাথে মমির আশপাশে থাকতো আরও নানা রকমের ধনরত্ন। তো পিরামিডের ভারি ভারি পাথর আর নানা রকম দরজা দিয়েও যখন কবর ডাকাতি থামানো যাচ্ছিলো না তখন লুক্সরের রাজারা নতুন বুদ্ধি বের করলো। তারা এই বিশাল পাহাড়ের সুগভীর গুহার ভেতরে খুঁড়ে খুঁড়ে পুরো পাহাড়টাকেই নিজেদের পারিবারিক কবরস্থান বানিয়ে ফেলল! বাহিরের জনগণ এর খোঁজও জানতো না। ফলে অধিকাংশ কবরই ডাকাতদের কবল থেকে বাঁচানো গিয়েছিল।

বেলুন রাইড শেষ করেই প্রথমে কিংস ভ্যালীতে চলে গেলে অনেকটাই সময় বেঁচে যায়। সকাল ৮টা থেকে এটা চালু হয় তাই একদম সকাল সকাল চলে গেলে ভিড়টাও অনেক কম থাকে। কিংস ভ্যালীর এন্ট্রি টিকিটের দাম ২০০ পাউন্ড। এটা দিয়ে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত ৬২+ গুহার মধ্যে মাত্র ৩টি সাধারণ গুহায় ঢোকা যাবে। এর বাইরে বিশেষ কিছু গুহা আছে যেগুলোর ভেতর রাজাদের মমি বা অন্যান্য জিনিস রয়েছে। সেগুলোর প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদা টিকেট! সবগুলো কিনতে গেলে প্রায় ২০০০ পাউন্ড খরচ হয়ে যাবে। আমরা তাই বেছে বেছে এক্সট্রা দুইটা টিকেট কিনেছিলাম। একটা হলো ৬২ নাম্বার গুহার “টুম্ব অফ কিং টুকানখামুন” (২৫০ পাউন্ড)। এটার ভেতরে রাজার মমি, মমির কফিন ও অন্যান্য কক্ষ আছে। আরেকটা হলো ৯ নাম্বার গুহার “টুম্ব অফ কিং রামসেস ৬” (১০০ পাউন্ড)। এটার ভেতরটাও বেশ সুন্দর ও দর্শনীয়।

এছাড়াও যেকোন তিনটা গুহার মধ্যে কাউন্টার থেকে সাজেস্ট করে ২, ৮ আর ১১ নাম্বারটায় ঢুকার জন্য। এগুলোই নাকি সবচেয়ে আকর্ষনীয়! আর এই ফ্রি টিপস এর জন্য তারা আবার বকসিসও চায়! বাস্তবে এইগুলা হচ্ছে সবচেয়ে কাছাকাছি এবং আপনি যাতে আগে আগে ঘুরা শেষ করে তাড়াতাড়ি বের হয়ে যান এজন্যই এই বাজে বুদ্ধি দেয়! আমরা তাই ওদের কথা না শুনে ম্যাপ দেখে দেখে সবচেয়ে দূরেরগুলো দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এতে করে পুরো এলাকাটাও ঘুরা হয়ে গেছে আমাদের। তবে বেশির ভাগ গুহাই এখনও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। অনেকগুলো উন্মুক্ত হওয়া সত্যেও লোক না থাকায় তালা দেয়া থাকে! তবে আমরা সকাল সকাল যাওয়ায় এবং প্রতিটা পাহাড়ের একদম শেষ মাথা পর্যন্ত উঠায় ছবি তোলার জন্য অনেক চমৎকার সব জায়গা পেয়েছি। সেই সাথে দুচোখ ভরে পুরো ভ্যালীটা দেখারও সুযোগ পেয়েছি!

পাহাড়ের চিপাচাপায় অনেক পানির বোতল ও খাবারের প্যাকেট পড়ে থাকতে দেখে মনে হয়েছে শুধু বাঙালি না, চাইনিজ ও অন্যান্য দেশের লোকজনও আমাদের মতই অসচেতন! বেড়াতে গিয়ে প্লীজ কেউ এই কাজটা করবেন না সেটা যে দেশই হোক। পৃথিবীটাকে যতটুকু সুন্দর পেয়েছেন তারচেয়ে আরেকটু বেশি সুন্দর করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যাবার চেষ্টা করুন সবসময়।

এখানেও ছবি তোলার জন্য আলাদা পাস লাগে এবং প্রতিটি গুহার ভেতর সিসি টিভি ক্যামেরা ও লোক লাগানো আছে। তবে সুবিধা হলো- তাদের আড়ালে আবডালে অহরহই ছবি তোলা যায় আর ওরা দেখে ফেললেও ৫/১০ পাউন্ড বকসিস দিলেই খুশ! কাজেই এখানেও এক্সট্রা পাস নেবার কোন যুক্তিকতা নেই। তবে টিকিট কাউন্টারের পাশেই পাহাড়ে ওঠার জন্য ৪ পাউন্ড করে ট্রেইলারের টিকিট কেটে নেবেন। এটা আপনাকে মূল ফটক পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে ওঠার পরিশ্রম থেকে মুক্তি দেবে।

আল-দেইর আল-বাহারি টেম্পল

কিংস ভ্যালী ঘুরতে আমাদের প্রায় ২ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছিল। সেখান থেকে ফেরার সময় আমরা গিয়েছি আল-দেইর নামক এক প্রখর বুদ্ধিমান ও প্রচণ্ড ক্ষমতাধর এক রানীর বানানো মন্দিরে। রাজার মৃত্যুর পর রাজ্য বেদখল হবার ভয়ে রানী আল-দেইর তার শিশু সন্তানকেই রাজা হিসেবে সিংহাসনে বসানোর ঘোষণা দেন। যেহুতু রাজপুত্রকে কেউ চিনতো না তাই রানী নিজেই নকল দাড়ি লাগিয়ে নিজের ছেলের নাম নিয়ে সিংহাসনে বসেন এবং অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। আশপাশের ক্ষমতাসীন রাজারা জানতোই না যে রাজপুত্র একজন শিশু এবং তার মা নিজে রাজা সেজে রাজ্য পরিচালনা করছে। বরং রানীর শাসনামলে আগ বাড়িয়ে যুদ্ধ করতে এসে অনেকেই নিজের রাজ্য হারিয়েছে! রণকৌশল, শক্তি আর বুদ্ধিতে তারা কখনোই রানীর সাথে পেরে না উঠে আপাতত সিংহাসন দখলের চেষ্টায় ক্ষ্যান্ত দেন। এই সুযোগে রানী তার সাম্রাজ্যকে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করে রেখে যান। এমনকি রানী মারা যাবারও বহুদিন পর রাজপুত্র সিংহাসনে বসার উপযুক্ত হয় এবং ততদিন পর্যন্ত কেউ জানতোই না যে রাজাবেশী রানী মারা গেছে। এমনকি রানীর মৃত্যুর কারণ, সঠিক সময় এবং সমাধীর হদিস আজও পর্যন্ত কেউ জানতে পারেনি!

তো এমন বিখ্যাত রানীর বানানো মন্দিরের নাম আল-দেইর আল-বাহারি মন্দির যাতে মানুষের শরীরে মহিষের মাথা সম্বলিত এক অবতার ছিল প্রধান দেবতা। ১০০ পাউন্ড এর টিকিট ও ২ পাউন্ডের ট্রেইলার ভাড়া দিয়ে আমরাও দেখে এলাম সেই মন্দির। ভেতরের রুমগুলোতে ঢোকার উপায় নেই। বাইরের দিক থেকেই দেখে আসতে হয় এটা।

মেডিনেট হাবু টেম্পল

রানীর মন্দির শেষ করে আমাদের ট্যাক্সি ড্রাইভার জানালো পুরো লুক্সর ও নিউ ভ্যালী গভারনরেট-এ এরকম প্রায় শ’ খানেক মন্দির ও কবর আছে। প্রতিদিনই খুঁড়ে খুঁড়ে নতুন নতুন স্থাপনা আর মূর্তি বা নিরদর্শন পাওয়া যাচ্ছে। সবগুলো ঘুরে দেখতে হলে কয়েক সপ্তাহ লেগে যাবে। সবগুলো দেখতেও প্রায় একইরকম! তাই এতোগুলোতে না গিয়ে বরং রিসেন্ট ডিসকভার করা একটায় যাওয়া যাক। তার কথা মত আমরা গেলাম হাবু মন্দিরে। এটাতে ঢুকতে খরচ করতে হয় ৮০ পাউন্ড।

সত্যি বলতে লুক্সরের সবগুলো মন্দির ও কবরই আসলে মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা ধুলোবালি মাখা একেকটা ধ্বংসাবশেষ। প্রতিটির গায়েই প্রাচীন বর্ণমালায় লেখা অজস্র ইতিহাস যা প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য বিশাল মূল্যবান হলেও আমাদের মত সাধারণ মানুষের জন্য একেবারেই অবোধ্য। টুরিস্টরা দেখলাম গণহারে সব কিছুর ছবি তোলে। আমার ধারণা একদিন পরে তারা নিজেরাই আর বলতে পারবে না যে কোনটা কিসের ছবি! পাথরের সাথে আপনি ছবি তুলতেই পারেন, তবে প্রতিটি স্পটে যদি কেবল ছবিই তোলেন তাহলে আপনার ফোনের ম্যামোরিতে কয়েক লাখ গার্বেজই জমা হবে শুধু!

বস্তুত মাটি খুঁড়ে বের করা এইসব স্থাপনাগুলোর মাহত্ব এর বিশলতায়; এর প্রাচীনতায়; এর পেছনের ইঞ্জিনিয়ারিং আর কারিগরি সুনিপনতায়! একেকটা প্রায় ৫/৬ হাজার বছরের পুরোনো অথচ এখনও কী সাবলীল। সেই যুগের মানুষগুলোও কেউ ৫/৬ ফুটের বেশী লম্বা ছিল না অথচ একেকটা পিলার, দেয়াল প্রায় ৩০/৪০ ফুট উচু। কোন কোন পাথর প্রায় ৩০০ টন ওজনের আর ৩০ মিটার পর্যন্ত লম্বা! এতোবড় পাথরকে বহু দূর থেকে যোগাড় করে মরুভুমির ওপর দিয়ে টেনে এনে তার ওপর এতো সুনিপুণ ভাবে খোদাই করে এভাবে হাজার হাজার বছর ধরে দাড় করিয়ে রাখার পেছনে যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা সেগুলোই আসলে উপলব্ধির বস্তু। নচেৎ পুরো মিশর জুড়ে বালু আর পাথর ছাড়া সাদা চোখে দেখার মত কিছু নেই!

ব্যানানা আইল্যান্ড

নীল নদের পশ্চিম পাড়ের এসব কিছু ঘুরে দেখে এই পাড়ে ফিরতে ফিরতে আমাদের প্রায় দুপুর দেড়টা বেজে গেছে। এপাড়ে এসে লাঞ্চ করে আমরা ১৫০ পাউন্ড দিয়ে লুক্সর মিউজিয়ামের সামনে থেকে নৌকা ভাড়া করি ব্যানানা আইল্যান্ড যাবার জন্য। আইল্যান্ড বলা হলেও এটি মূলত মূল ভুখন্ডের একটা ব্যক্তি মালিকানাধীন কলা বাগান যাতে আদতে দেখার মত কিছু নেই। তবু এই কলা বাগান দেখার জন্য ৩০ পাউন্ড দেয়া লাগে। মূলতঃ নীল নদের বুকে নৌকা ভ্রমণ করাটাই এখানে মূখ্য। আমার ব্যক্তিগত মতামত ওখানে না নেমে বরং আক্ষরিক অর্থেই ম্যাপে যে দ্বীপটা দেখায় সেখানে নামা ভাল।

এটা আমাদের দেশে পদ্মার বুকে জেগে ওঠা একটা বালুচরের মত। বড় বড় ঘাস আর অনাবাদী বালুর মাঠ। সেখানে বুক পানিতে নেমেও পায়ের কাছে ভেসে বেড়ানো মাছের ঝাঁক দেখা যায়! ওখানে যাবার জন্য ইঞ্জিন চালিত ও পাল তোলা দুই ধরণের নৌকাই পাওয়া যায়। ভাড়া এক সমানই। আমাদের কোন তাড়া ছিল না তাই সেইলিং বোট ভাড়া করি। স্বচ্ছ নদীর পানিতে নিজস্ব একটা পাল তোলা নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর অনুভূতি সত্যি অসাধারণ! দ্বীপে নেমে আমরা নীল নদের পানিতে গোসলও করেছি। অনেক এক্সাইটিং ছিল ব্যাপারটা। নীল নদের একটা মজার ব্যাপার হলো আমরা সাধারণত নদীর স্রোত দক্ষিণমূখি দেখে অভ্যস্ত হলেও এর স্রোত উত্তরের ভূমধ্যসাগরের দিকে বহমান! ফেরার সময় বাতাসের গতি ভাল না থাকায় অনেক সময় লেগেছে আমাদের। ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। পুরো সন্ধ্যাটা নদীর পাড়েই শুয়ে বসে কাটিয়ে সে রাতেই আমরা কায়রোর বাস ধরি। কারণ পরদিন রাতেই আমাদের ফিরতি ফ্লাইট ছিল।

সময় সল্পতার জন্য আমরা আশোয়ান যেতে পারিনি। সেখানেও লুক্সরের মত অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। লুক্সরে আমরা খাবার খেয়েছি নদীর পাড়ের মেরিনা ক্যাফে এন্ড রেস্টুরেন্ট থেকে। তুলনামূলক ভাবে এখানেই খাবার সস্তা এবং মান বেশ ভাল। এখান থেকে ফ্রিতে নদীর পাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। নদীর পূর্ব পাড় পুরোটাই পার্কের মত করে সাজানো। সন্ধ্যা বা মাঝরাত পর্যন্ত আড্ডা দেবার জন্যেও এই জায়গাটা বেস্ট!

সর্বপরি ছোটবেলায় বইয়ে পড়া মিশর বাস্তবে ঘুরে আসাটা অনেকটাই স্বপ্নের মত ছিল। সব মিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য ছিল ব্যপারটা। ঘুরাঘুরিতে প্রতিটি স্থানের টিকিট ও খাবার ব্যতীত অন্য সবকিছুই বেশ সস্তাই মনে হয়েছে আমাদের কাছে। আর সবচেয়ে বেশি ভাল লেগেছে ওদের দেশের মানুষ। রাত ১২/১টাতেও রাস্তায় মানুষের যে স্বতঃস্ফুর্ত চলাফেরা তা আমাদের দেশে চিন্তাও করা যায় না। একটি মুসলিম প্রধান দেশে নারীরা শিশুরা পার্কে বাজারে বা রাস্তায় যেরকম নির্লিপ্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে তা প্রমাণ করে নিজ দেশে ওরা কতটা নিরাপদ! সহজ সরল প্রাণবন্ত ঐ দেশটাতে এমনিভাবে শান্তি বজায় থাকুক চিরকাল…

লেখা ও ছবিঃ সফিক এহসান

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।