রাজশাহীর নাম শুনলেই অনেকের মনে আসে আম, সিল্ক আর পদ্মা নদী। কিন্তু এই শহরে আসলে এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু আছে। একদিন সময় হাতে থাকলেও রাজশাহী আপনাকে ক্লান্ত করবে না, বরং ধীরে ধীরে আপন করে নেবে। সকাল শুরু করতে পারেন সবুজ ক্যাম্পাসে হাঁটা দিয়ে, দুপুরে ইতিহাসের পাতায় ঢুকে পড়া, আর বিকেলে নদীর ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখা। সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো দর্শনীয় জায়গাগুলো খুব কাছাকাছি। তাই বেশি দৌড়ঝাঁপ ছাড়াই শহরের নানা স্পট ঘুরে দেখতে পারবেন। রাজশাহী এমন এক শহর যেখানে আধুনিকতা আর ইতিহাস পাশাপাশি হেঁটে চলে। যারা ভাবেন একদিনে রাজশাহী ঘোরা সম্ভব নয়, এই ভ্রমণগাইড তাদের সেই ধারণা বদলাতে বাধ্য করবে। আজকের ভ্রমণ গাইডে জানব রাজশাহীতে একদিনে ভ্রমণের জন্যে সেরা ১০টি স্থান নিয়ে।

১। রাজশাহী নভোথিয়েটার

রাজশাহী শহরের ভেতরেই রয়েছে বিজ্ঞান আর কল্পনার এক আলাদা জগৎ রাজশাহী নভোথিয়েটার। প্রায় ২.৩০ একর জায়গাজুড়ে তৈরি এই স্থাপনাটি সম্পূর্ণ সোলার-নির্ভর এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ। ঢাকার পর এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নভোথিয়েটার। ২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে এই নভোথিয়েটার তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। পরবর্তীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজশাহী নভোথিয়েটার (Rajshahi Novo Theatre) উদ্বোধন করেন ১৪ নভেম্বর ২০২৩ সালে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মহাকাশ বিষয়ে কৌতূহল তৈরি করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এখানে এলে শুধু দেখাই নয়, শেখার অনুভূতিটাও কাজ করে।

নভোথিয়েটার, রাজশাহী

২। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

​​রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (University of Rajshahi) ঢুকলেই শহরের কোলাহল যেন হঠাৎ থেমে যায়। ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় শুরু হয়েছিল মাত্র ১৬১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে। আজ এখানে পড়াশোনা করছে ৩০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী। সবুজে ঢাকা বিশাল ক্যাম্পাস, প্রশস্ত রাস্তা আর শান্ত পরিবেশ যে কোন দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করবে। এখানকার ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য জায়গাটিকে শুধু শিক্ষাঙ্গন নয়, ভ্রমণের জন্যও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

৩। বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর

রাজশাহী শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর (Varendra Research Museum) বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর হিসেবে পরিচিত। ১৯১০ সালে বরেন্দ্র অঞ্চলের ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ১৯১৩ সালে নিজস্ব ভবনে এর যাত্রা শুরু হয়। এখানে রাখা নিদর্শনগুলো হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী। পাল, সেন, মৌর্য ও গুপ্ত আমলের পোড়ামাটির ফলক, শিলালিপি, মুদ্রা ও মূর্তি একসাথে দেখা যায়। সূর্য, বিষ্ণু ও চণ্ডীর পাথরের মূর্তি কিংবা শের শাহের কামান ইতিহাসকে আরও জীবন্ত করে তোলে।

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর

৪। টি বাঁধ

পদ্মা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা টি বাঁধ (T Badh) রাজশাহীর মানুষের সবচেয়ে প্রিয় আড্ডাস্থল। ইংরেজি T অক্ষরের মতো দেখতে এই বাঁধটি নদীভাঙন রোধের পাশাপাশি বিনোদনের জায়গা হিসেবেও পরিচিত। সকালে পাখির ডাক আর হালকা বাতাস আর বিকেলে সূর্যাস্তের সময় নদীর পানিতে আলোছায়ার খেলা যে কারও মন ভালো করে দেয়। স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে পর্যটক সবাই একটু সময় কাটাতে এখানে আসে।

৫। পুঠিয়া রাজবাড়ী

পুঠিয়া রাজবাড়ী (Puthia Rajbari) রাজশাহীতে অবস্থিত নজরকাড়া স্থাপত্যের একটি অনন্য নিদর্শন। রাজশাহী বিভাগীয় শহর হতে ৩০ কিলোমিটার এবং রাজশাহী-নাটোর মহসড়ক থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার দূরে পুঠিয়া রাজবাড়ীর অবস্থান। এই রাজবাড়িটি উনবিংশ শতাব্দীতে ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যে নির্মিত। শিব সরোবর বা শিবসাগর, মরাচৌকি, বেকিচৌকি, গোপালচৌকি ও গোবিন্দ সরোবর পরিখা ছাড়াও রাজবাড়ীতে শ্যামসাগর নামে একটি বিশাল পুকুর রয়েছে। দুটি প্রাসাদ এবং জমিদারদের নির্মিত বেশ কয়েকটি মন্দির এখনো এখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এদের মধ্যে অন্যতম দোচালা পদ্ধতিতে নির্মিত বড় আহ্নিক মন্দির, ১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত বড় শিব মন্দির বা ভূবনেশ্বর মন্দির, চারতলা বিশিষ্ট পুঠিয়া দোল মন্দির এবং পুঠিয়া পাঁচআনী জমিদার বাড়ীর প্রাঙ্গনে অবস্থিত গোবিন্দ মন্দির। পুঠিয়া রাজবাড়ি প্রতিদিন সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

৬। রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা

পদ্মার তীরসংলগ্ন সাবেক রেসকোর্স ময়দানের ৩২.৭৬ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা শহর থেকে মাত্র ৪.২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ১৯৭২ সালে নির্মাণ শুরু হয়ে ১৯৭৪–৭৬ সালে চিড়িয়াখানা ও শিশু পার্কের কাজ সম্পন্ন হয়, যা বর্তমানে শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা (Shaheed A.H.M. Kamruzzaman Central Park & Zoo) নামে অধিক পরিচিত।

প্রবেশ গেইটে জিরাফের দেখা যাবে ভাস্কর্য ও ফোয়ারা, ভেতরে ফুল-ফল ও ঔষধি গাছ, ভাস্কর্য, নান্দ্যনিক ব্রিজ ও ছোট লেক রয়েছে। এখানে হরিণ, ঘোড়া, উদবিড়াল, অজগর, কুমিরসহ নানা পশুপাখি দেখা যায়। কৃত্রিম পাহাড় থেকে পদ্মার দৃশ্য উপভোগ করা যায় এবং প্যাডেল বোট, নাগর দোলাসহ বিভিন্ন রাইড দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।

বর্তমানে এটি রাজশাহীর অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র, এখানে স্থানীয় দর্শনার্থীর পাশাপাশি শিক্ষা সফর ও বনভোজনের জন্য প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক পর্যটকের সমাগম ঘটে।

৭। পদ্মা গার্ডেন

পদ্মা নদীর ধারে অবস্থিত এই পার্কটি ওডভার মুনক্সগার্ড পার্ক (Oddvar Munksgaard Park) নামেও পরিচিত হলেও সবাই একে চেনে পদ্মা গার্ডেন (Padma Garden) নামে। বড়কুটি থেকে দরগাপাড়া পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই পার্কটি সবুজ পরিবেশ আর খোলা জায়গার জন্য জনপ্রিয়। এখানে একটি মুক্তমঞ্চ রয়েছে যেখানে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। আশেপাশে গড়ে উঠেছে নানা ছোট বড় রেস্টুরেন্ট। পাশেই শাহ্‌ মখদুম রাঃ এর মাজার, রবীন্দ্র মুক্তমঞ্চ ও সীমান্ত নোঙর রয়েছে। বিশেষকরে সন্ধ্যার সময় জায়গাটা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

৮। শিশু পার্ক

রাজশাহী জেলা সদরের নওদাপাড়া বড় বনগ্রামে অবস্থিত শিশু পার্ক রাজশাহী শহরের একটি অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র। নয়নভিরাম পিকনিক স্পট, সব বয়সীদের জন্য দেশি-বিদেশি রাইড, সুবিশাল লেক এবং নৌকা ভ্রমনের সুব্যবস্থা ২০০৬ সালে নির্মিত এই পার্কটিকে শহরবাসীর কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে। এই শিশু পার্ক শহীদ জিয়া শিশু পার্ক (Shahid Zia Shishu Park) নামে অধিক পরিচিত।

শিশু পার্ক

৯। রাজশাহী কলেজ

রাজশাহী কলেজ (Rajshahi College) বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৮৭৩ সালের ১ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত এই কলেজটি মাত্র ছয়জন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করছিল। দুবলহাটি রাজা হরলাল রায় বাহাদুরের দান করা জমি ও আর্থিক সহায়তায় এর ভিত্তি গড়ে ওঠে। একসময় পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গ, বিহার ও আসামের শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসত। ঢাকা কলেজ ও চট্টগ্রাম কলেজের পর এটিই দেশের তৃতীয় বৃহত্তম প্রাচীন কলেজ।  কলেজের প্রধান ভবনটি ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত, যা দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

১০। সাফিনা পার্ক ও রিসোর্ট

গোদাগাড়ীর দ্বিগ্রাম খেজুরতলায় প্রায় ৪০ বিঘা জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা সাফিনা পার্ক ও রিসোর্ট (Safina Park and Resort) সব বয়সের মানুষের কাছে জনপ্রিয়। ২০১২ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি এই পার্কে ঢুকলেই চোখে পড়বে নানা ফুল, ফল ও ঔষধি গাছ। ভেতরে রয়েছে ফোয়ারা ও কৃত্রিম পশুপাখির ভাস্কর্য। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, ট্রেন, থ্রিডি সিনেমা ও কিডস স্পোর্টস জোন আছে। পার্কের দুইটি লেকে নৌকা ভ্রমণ করা যায় এবং অনুমতি নিয়ে মাছ ধরার সুযোগও রয়েছে।

ভ্রমণ টিপস

  • রাজশাহী ভ্রমণ শুরু করতে পারেন পুটিয়া রাজবাড়ি থেকে, কারন এটি শহরের একটু বাইরে অবস্থিত, তাই আগে ঘুরে নেওয়া ভালো।
  • রাজশাহী শহর ঘুরে দেখার জন্য অটোরিকশা রিজার্ভ করে নেওয়া ভাল।
  • নভোথিয়েটার বুধবার বন্ধ থাকে আর বৃহস্পতি বার, শুক্রবার এবং বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষিত ছুটির দিনগুলোতে বরেন্দ্র জাদুঘর বন্ধ থাকে।
  • দুপুর বা রাতে রাজশাহীর বিখ্যাত কালাই রুটি বা সাহেব বাজারের বিখ্যাত সব রেস্তোরাঁয় খাবারের স্বাদ নিতে পারেন।

ভ্রমণ সংক্রান্ত যে কোন তথ্য ও আপডেট জানতে ফলো করুন আমাদের ফেসবুক পেইজ এবং জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে

শেয়ার করুন সবার সাথে

দৃষ্টি আকর্ষণ: যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের দেশের সম্পদ। প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন। অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল নাও থাকতে পারে। অনুগ্রহ করে আপনি কোথাও ভ্রমণে যাওয়ার পূর্বে বর্তমান তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে নিয়ে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এইসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই বাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।

মন্তব্য জানান

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।