বন্দরনগরী চট্টগ্রাম কেবল বাণিজ্যিক রাজধানীই নয়, বরং পাহাড়, সমুদ্র আর সবুজের এক অপূর্ব মিলনস্থল। নাগরিক ব্যস্ততার মাঝে ক্লান্তি কাটাতে চট্টগ্রামের আশেপাশে এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে মাত্র একদিনের পরিকল্পনা নিয়ে অনায়াসেই ঘুরে আসা যায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই অঞ্চলের প্রতিটি জায়গায়ই যেন লুকিয়ে আছে নতুন কোনো বিস্ময়। আপনি যদি অল্প সময়ের মধ্যে পাহাড়ের স্নিগ্ধতা, সমুদ্রের বিশালতা আর ঐতিহাসিক নিদর্শনের স্বাদ নিতে চান, তবে চট্টগ্রাম আপনাকে সেরা অভিজ্ঞতা দিতে পারে।
ছুটির দিনে পরিবার ও শিশুদের নিয়ে একটু স্বস্তির খোঁজে কিংবা বন্ধুদের সাথে রোমাঞ্চকর আড্ডায় মেতে উঠতে ডে ট্যুর বা দিনের ভ্রমণ এখন বেশ জনপ্রিয়। চট্টগ্রামের এই দর্শনীয় স্থানগুলো আপনাকে একই সাথে দেবে প্রাকৃতিক প্রশান্তি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ছোঁয়া। চলুন জেনে নেওয়া যাক চট্টগ্রামে একদিনে ঘুরে দেখা যাবে আশেপাশে এমন কিছু দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থান।
১। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা
চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা (Chattogram Zoo) ফয়েজ লেকের পাশে ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ৬ একর জমির উপর বিস্তৃত এই চিড়িয়াখানায় বর্তমানে ৭২ প্রজাতির সাড়ে তিন শতাধিক প্রাণী রয়েছে, যার মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ভারতীয় সিংহ, আফ্রিকান জেব্রা, মায়া হরিণ, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপ অন্তর্ভুক্ত।

এখানে একটি মিনি এভিয়ারিও রয়েছে, যেখানে ৬ প্রজাতির ৩৪২টি বিদেশি পাখি দেখা যায়। চিড়িয়াখানাটি প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬:৩০ পর্যন্ত খোলা থাকে।
২। চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি
চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি (Chittagong War Cemetery) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের স্মরণে নির্মিত একটি সমাধিক্ষেত্র। চট্টগ্রাম শহরের দামপাড়া এলাকায় অবস্থিত এই স্থানে ৭৩১টি সমাধি রয়েছে, যার মধ্যে ১৭টি সমাধী অজানা সৈন্যের।

এখানে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সৈন্যদের সমাধি রয়েছে। সিমেট্রিটি সবুজ গাছ গাছালি ও ফুল বাগানে ঘেরা। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে ১২টা এবং দুপুর ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।
৩। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত
পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত (Patenga Sea Beach) চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। শহরের খুব কাছে হওয়ায় সহজে পৌঁছানো যায়।
এখানে স্পিড-বোট রাইড, সী বাইক ও ঘোড়ার পিঠে চড়ার সুযোগ রয়েছে। সন্ধ্যায় সৈকতে বাতির ব্যবস্থা থাকায় রাতেও ভ্রমণ নিরাপদ। স্থানীয় খাবারের মধ্যে ভাজা কাঁকড়া ও সামুদ্রিক মাছ জনপ্রিয়।
৪। চন্দ্রনাথ পাহাড় ও মন্দির
চন্দ্রনাথ পাহাড় (Chandranath Hill) চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত একটি পাহাড়। যার শীর্ষে চন্দ্রনাথ মন্দির অবস্থিত। এই মন্দিরটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি পবিত্র স্থান। প্রতি বছর শিবরাত্রি উপলক্ষে হাজারো ভক্ত সমবেত হন। এডভেঞ্চার ও ট্রেকিং লাভার হলে একদিনে ঘুরে বেড়ানোর জন্যে চন্দ্রনাথ পাহাড় ভ্রমণ আপনার জন্যে উপযুক্ত।
৫। নেভাল সমুদ্র সৈকত
নেভাল সমুদ্র সৈকত (Naval Sea Beach) চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকার একটি সৈকত। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রয়েছে এটি। এটি মূলত নেভাল একাডেমির অংশ হওয়ায় সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ সীমিত, তবে নির্দিষ্ট অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করা যায়।

এখানে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি, জাহাজ চলাচল ও সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের কাছেই অবস্থিত হওয়ায় এখানে খুব সহজেই যেতে পারবেন।
আরও পড়ুনঃ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার উপায়
৬। ফয়েজ লেক
ফয়েজ লেক (Foy’s Lake) চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় অবস্থিত একটি কৃত্রিম হ্রদ ও বিনোদন কেন্দ্র। ১৯২৪ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত এই হ্রদটি পাহাড় ও সবুজে ঘেরা একটি মনোরম স্থান।

এখানে বোট রাইড, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট ও অ্যামিউজমেন্ট পার্কের সুবিধা রয়েছে। পরিবারসহ দিনব্যাপী ভ্রমণের জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান। চট্টগ্রাম শহর থেকে সহজেই পৌঁছানো যায়।
৭। বাঁশবাড়িয়া ও গুলিয়াখালী সৈকত
বাঁশবাড়িয়া ও গুলিয়াখালী সৈকত (Bashbaria and Guliakhali Sea Beach) চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় অবস্থিত দুটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সৈকত। বাঁশবাড়িয়া সৈকত তার দীর্ঘ বালুকাবেলা ও স্বচ্ছ জলের জন্য পরিচিত, যেখানে জোয়ারের সময় সৈকতের সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়।
গুলিয়াখালী সৈকত সবুজ ঘাসে ঢাকা ম্যানগ্রোভ বন ও ছোট ছোট খালের জন্য বিখ্যাত। এই দুটি সৈকত প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য আদর্শ স্থান।
৮। মহামায়া লেক
মহামায়া লেক (Mohamaya Lake) চট্রগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম কৃত্রিম হৃদ। যা ১১ বর্গ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান।

লেকের টলটলে পানি আর পাহাড়ের মিতালী ছাড়াও এখানে পাহাড়ি গুহা, রাবার ড্যাম ও অনিন্দ্য সুন্দর ঝর্ণা রয়েছে। বোটে চড়ে লেকে ঘুরার পাশাপাশি চাইলে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝর্ণার শীতল পানিতে ভিজে শরীর ও মনকে প্রশান্তি দিতে পারেন। এখানে আছে কায়াকিং করার সুবিধা। চাইলে তাবুতে রাতে ক্যাম্পিং করে থাকতেও পারবেন।
৯। সিআরবি
সিআরবি (CRB Building) চট্টগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর স্থান। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই এলাকা বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এখানে শতবর্ষী গাছ, সবুজ উদ্যান ও শান্ত পরিবেশ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। সিআরবি এলাকায় প্রায়ই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এর আয়োজন করা হয়। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এখানে সহজেই যাওয়া যায়।
১০। প্রজাপতি পার্ক
প্রজাপতি পার্ক (Butterfly Park) চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় অবস্থিত দেশের প্রথম প্রজাপতি পার্ক। প্রায় ৬ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই পার্কে ১,২০০ প্রজাতির প্রজাপতির আবাসস্থল রয়েছে। এখানে প্রজাপতি মিউজিয়াম, কৃত্রিম হ্রদ, ঝর্ণা, বাচ্চাদের জন্য রাইড ও রেস্টুরেন্ট সুবিধা রয়েছে।
পার্কটি প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে এই পার্কে সিএনজি বা লোকাল বাসে পৌঁছানো যায়।
১১। ডিসি হিল (নজরুল স্কয়ার)
ডিসি হিল (DC Hill) চট্টগ্রাম শহরের একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থান। যা নজরুল স্কয়ার নামেও পরিচিত। এখানে কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মরণে একটি মঞ্চ ও উদ্যান রয়েছে। ডিসি হিল বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক ও কবিতা পাঠের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় সহজেই যেতে পারবেন।
১২। বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার
বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার (Shrine of Bayazid Bostami) চট্টগ্রাম শহরের বায়েজিদ এলাকায় অবস্থিত একটি পবিত্র স্থান। এটি সুফি সাধক হযরত বায়েজিদ বোস্তামীর স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠিত। মাজার সংলগ্ন পুকুরে ‘বায়েজিদ বোস্তামীর কচ্ছপ’ নামে পরিচিত বিরল প্রজাতির কচ্ছপ দেখা যায়। প্রতিদিন অনেক ভক্ত ও দর্শনার্থী এখানে আসেন।
১৩। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার (Chittagong Central Shaheed Minar) ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে নির্মিত একটি স্মৃতিস্তম্ভ। এটি শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। শহীদ মিনারটি চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক চেতনার প্রতীক।
১৪। জাম্বুরি পার্ক
জাম্বুরি পার্ক (Jamboree Park) চট্টগ্রাম শহরের একটি আধুনিক পার্ক, যা সবুজ উদ্যান, হাঁটার পথ ও খেলার মাঠ নিয়ে গঠিত। এটি পরিবার ও শিশুদের জন্য একটি আদর্শ বিনোদন কেন্দ্র।

১৫। বাটালি হিল
পার্বত্য জেলা চট্টগ্রামের জিরো পয়েন্ট থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার দূরে টাইগারপাস এলাকায় অবস্থিত শহরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের নাম বাটালি হিল (Batali Hill)। বাটালি হিল পাহারের রাস্তা প্যাঁচানো হবার কারণে এটি জিলাপি পাহাড় নামেও পরিচিত।
২৮০ ফুট উচ্চতার বাটালি হিলের চূড়া থেকে চট্টগ্রাম শহর এবং বঙ্গোপসাগর দেখা যায়। পাহাড়ের উপর থেকে বঙ্গোপসাগরের মনোমুগ্ধকর সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করার পাশাপাশি বিশ্রাম নেওয়ারও সুব্যবস্থা আছে।
এছাড়াও চট্টগ্রাম জেলায় অবস্থিত আরও অনেক বেড়ানোর স্থান আছে। চট্টগ্রাম জেলার সকল ভ্রমণ স্থানের তথ্য পেতে ভিজিট করুন চট্টগাম জেলার দর্শনীয় স্থান পেইজটি।
ভ্রমণ সংক্রান্ত যে কোন তথ্য ও আপডেট জানতে ফলো করুন আমাদের ফেসবুক পেইজ এবং জয়েন করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।
