বাংলাদেশে ভ্রমণ প্রেমীদের কাছে আকর্ষণের শীর্ষে রয়েছে কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিন দ্বীপের নাম। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত এবং বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ দেশি বিদেশি পর্যটকে বিমোহিত করে। কাছাকাছি হওয়ায় অনেকেই কক্সবাজার এবং সেন্টমার্টিন একই সাথে ভ্রমণ করতে পছন্দ করে। তাই ভ্রমণ গাইডের আজকের ট্যুর প্ল্যানে থাকছে একই সাথে কক্সবাজার এবং সেন্টমার্টিন ভ্রমণ কিভাবে করবেন তার বিস্তারিত তথ্য সম্পর্কে।

ট্যুর প্ল্যান এক : ২ দিন + ২ রাত

এই ট্যুর প্ল্যানে প্রথমে কক্সবাজার গিয়ে সেখানে সারা দিন ও রাত থেকে পরদিন সকালে সেন্টমার্টিন গিয়ে সারাদিন ও রাত থেকে ফিরে আসতে হবে। এই প্ল্যানে যে সব জায়গা ঘুরবেনঃ

  • কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত (লাবনী, সুগন্ধা ও কলাতলী বীচ)
  • হিমছড়ি
  • ইনানী সমুদ্র সৈকত
  • সেন্টমার্টিন দ্বীপ
  • ছেঁড়া দ্বীপ

প্রথম দিন

ঢাকা থেকে কক্সবাজার সড়ক, রেল এবং আকাশপথে যাওয়া যায়। যেহেতু হাতে মাত্র ২ দিন ২ রাত সময় তাই আপনার জায়গা থেকে যেভাবেই যান চেষ্টা করতে হবে যেন কক্সবাজার পৌঁছে ১২ টার মধ্যে হোটেলে চেক ইন করতে পারেন।

পড়ুনঃ কক্সবাজার যাওয়ার উপায়

কক্সবাজারে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। আগে থেকে হোটেল বুকিং দেওয়া না থাকলে পছন্দ ও বাজেটমতো হোটেল ঠিক করে নিন। হোটেলে উঠে কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে সময় নষ্ট না করে চলে যান সমুদ্র দর্শনে। ঘন্টাখানেক সমুদ্রের জলে গা ভিজিয়ে ২ টার মধ্যে হোটেলে ফিরে আসুন। ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবারের জন্য হোটেলের নিজস্ব রেস্টুরেন্ট বা কাছের কোন রেস্টুরেন্ট বেছে নিন। খাওয়া দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে অটো, জীপ বা সিএনজিতে চড়ে বেরিয়ে পড়ুন হিমছড়ি ও ইনানীর উদ্দেশ্যে। ইজিবাইক বা সিএনজি করে হিমছড়িতে যাওয়া আসার ভাড়া লাগবে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা (৫০০-৮০০ ইনানী সহ)। হিমছড়ির ঝর্ণা দেখে ঘুরাঘুরি শেষ করে ইনানী বিচে সূর্যাস্থ দেখতে চলে যান। সূর্যাস্থ দেখে কক্সবাজার ফিরে চাইলে বিশ্রাম নিতে পারেন অথবা বার্মিজ মার্কেটে ঢু মারতে পারেন।

এর ফাকে সেন্টমার্টিন যাওয়ার খোঁজ খবর করে নিতে পারেন। চাইলে নিজে নিজে কক্সবাজার থেকে ১৫০ টাকা বাস ভাড়ায় টেকনাফ এসে সেন্টমার্টিনগামী জাহাজের টিকেট করতে পারেন। তবে অনেকে জটিলতা এড়াতে বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির সাহায্য নিয়ে থাকেন। কক্সবাজারে রাস্তার পাশে সেন্টামার্টিন সহ কক্সবাজারের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার জন্য অনেক ট্রাভেল এজেন্সীর অফিস পাবেন। আপনার প্রয়োজন মত দরদাম করে সেন্টমার্টিনের কোন একটি প্যাকেজ সাজিয়ে নিন। বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সিকে প্যাকেজ ভেদে ৭০০ থেকে ১৫০০ টাকা প্রদান করতে হবে।

দ্বিতীয় দিন

যদি ট্রাভেল এজেন্সির থেকে কোন প্যাকেজ নেন তবে খুব ভোরে এজেন্সির বাস আপনার হোটেলের সামনে থেকে টেকনাফ নিয়ে যাবে। আপনার প্যাকেজের সাথে নাস্তা থাকলে কক্সবাজার থেকে বাস ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে নাস্তা পেয়ে যাবেন। সকাল ৮ টা থেকে সাড়ে ৮ টার মধ্যে বাস সেন্টমার্টিনের জাহাজ জেটির কাছে এসে নামিয়ে দেবে। সেন্টমার্টিনগামী সকল জাহাজ সকাল ৯ টা ৩০ মিনিটে টেকনাফ ছেড়ে যায়।

কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যেতে অবস্থা ভেদে প্রায় এক থেকে দুই ঘন্টা সময় লাগে। টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনে প্রতিদিন সকাল থেকে আসা-যাওয়া করে কেয়ারী সিন্দাবাদ, বে ক্রুজ, আটলান্টিক, ফারহান ইত্যাদি জাহাজ। জাহাজের যাওয়া ও আসার টিকেট ভাড়া শ্রেণিভেদে জনপ্রতি ৬৫০ থেকে ১৫০০ টাকা। সেন্টমার্টিনগামী জাহাজে টিকেটের ধরণ অনুযায়ী আসন থাকলে সেখানে বসতে পারবেন। জাহাজ দুপুর ১২ টা থেকে ১২ টা ৩০ মিনিটের মধ্যে সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৌঁছায়।

কক্সবাজার সেন্টমার্টিন ট্যুর প্ল্যান
ছবি: ভ্রমণ গাইড

সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৌঁছে আগে থেকে হোটেল ঠিক করা না থাকলছ হোটেল ঠিক করে নিন। হোটেলের মান, জেটি থেকে দূরত্ব এবং সিজন ভেদে রুম প্রতি ১০০০ থেকে ৫০০০ টাকায় রাত্রিযাপন করতে পারবেন। হোটেল ঠিক করে বেরিয়ে পড়ুন সেন্টমার্টিনে সমুদ্র স্নানের উদ্দেশ্যে। সমুদ্র স্নান সেরে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য কেয়ারি মারজান রেস্তোরাঁ, বিচ পয়েন্ট, হোটেল আল্লার দান, বাজার বিচ, আসাম হোটেল, সি বিচ, সেন্টমার্টিন, কুমিল্লা রেস্টুরেন্ট, রিয়েল রেস্তোরাঁ, হাজী সেলিম পার্ক ও হোটেল সাদেক-কে বেছে নিতে পারেন। অথবা যে রিসোর্টে আছেন তাদের কাছে বলে রাখলে তারাও খাবারের ব্যবস্থা করে দিবে।

পড়ুনঃ সেন্টমার্টিনের সকল হোটেল ও রিসোর্ট

বিকেল বেলা জেটি ঘাট থেকে ট্রলারে বা বোটে করে চলে যান ছেঁড়া দ্বীপ ভ্রমণে। ছেঁড়া দ্বীপে সূর্যাস্থ দেখে হোটেলে ফিরে আসুন। রাতে বারবিকিউ করতে চাইলে উপরে উল্লেখিত যেকোন খাবার হোটেল কিংবা আপনার হোটেল বা রিসোর্টের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। এক্ষেত্রে নিজেরা মাছ বাচাই করে কিনে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। পরদিন ভোরে উঠে হেঁটে বা সাইকলে নিয়ে সেন্টমার্টিন দ্বীপ ঘুরে দেখুন। অথবা আগের দিন বিকেলে ছেঁড়া দ্বীপ না গিয়ে থাকলে এই সকালের সময়টাতে ঘুরে আসতে পারেন। দুপুরে খাওয়া দাওয়া শেষে জাহাজ ছাড়ার সময়ের আগেই ঘাটে চলে আসুন। টেকনাফ পৌঁছে সেখান থেকে আপনি আপনার গন্তব্যে ফিরে চলুন।

ট্যুর প্ল্যান দুই : ৩ দিন + ৩ রাত

এই ট্যুর প্ল্যানে প্রথমে কক্সবাজার গিয়ে সেখানে সারা দিন ও রাত থেকে পরদিন সেন্টমার্টিন গিয়ে সেখানে দুই দিন ও দুই রাত থেকে ফিরে আসতে হবে। এই প্ল্যানে যে সব জায়গা ঘুরবেনঃ

  • কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত (লাবনী, সুগন্ধা ও কলাতলী বীচ)
  • হিমছড়ি
  • ইনানী সমুদ্র সৈকত
  • সেন্টমার্টিন দ্বীপ
  • ছেঁড়া দ্বীপ

প্রথম দিন

৩ দিন ৩ রাতের কক্সবাজার ভ্রমণে যথারীতি রাতের বাসে রওনা দিন। কক্সবাজার পৌঁছে হোটেলে চেক ইন করে দুপুরে সমুদ্র স্নানের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ুন। ঘন্টাখানেক সমুদ্রের জলে গা ভিজিয়ে ছবি তুলে ২ টার মধ্যে হোটেলে ফিরে আসুন। দুপুরের খাবার খেয়ে হালকা বিশ্রাম নিয়ে অটো বা সিএনজি ভাড়া নিয়ে হিমছড়ি ও ইনানী বিচে চলা যান। ইনানী বীচে সূর্যাস্থ দেখে কক্সবাজার ফিরে বার্মিজ মার্কেটে কেনাকাটা সেরে নিতে পারেন।

দ্বিতীয় দিন

পরদিন ভোর ৬ টায় সেন্টমার্টিন দ্বীপ যাওয়ার জন্য টেকনাফের বাসে রওনা দিন। (উপরের প্ল্যানে আরও বিস্তারিত আছে তা পড়ে নিন)। টেকনাফের জাহাজ জেটিতে পৌঁছাতে ২ ঘন্টার মত সময় লাগবে। আর জাহাজে করে সেন্টমার্টিন যেতে সময় লাগবে আড়াই থেকে তিন ঘন্টা। সব ঠিক থাকলে দুপুর ১২ টা থেকে সাড়ে ১২ টার মধ্যেই সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৌঁছে যাবেন। দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে বিকেলের সময়ে আশেপাশে ঘুরে বেড়ান।

দ্বিতীয় দিন

পরদিন ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠে সাইকেল ভাড়া নিয়ে অথবা পায়ে হেটে পুরো সেন্টমার্টিন দ্বীপ ঘুরে দেখতে পারেন। পায়ে হেটে দ্বীপ ঘুরতে বের হলে অবশ্যই সাথে খাবার পানি নিয়ে নিবেন। পায়ে হেটে দ্বীপ ঘুরে দেখতে ৪ ঘন্টার মত সময় লাগবে। দ্বীপ ঘুরে হোটেলে ফিরে সকালের নাস্তা সেরে সাগর সৈকতে ফুটবল কিংবা ভলিভল খেলায় মেতে উঠতে পারেন। সমুদ্র স্নান সেরে হোটেলে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেলে বিকেল চলে যান ছেঁড়া দ্বীপে। ছেঁড়া দ্বীপে সূর্যাস্ত দেখে ফিরে আসুন নিজ হোটেলে। সন্ধ্যার সময়টা জেটি ঘাটে আড্ডায় কাটিয়ে দিন। কেনাকাটা করার প্রয়োজন হলে বাজার থেকে করে নিন। আর রাতে ক্যাম্পিং কিংবা বারবিকিউইয়ের আয়োজন করে ফেলুন। নিজের রিসোর্তে বারবিকিউ এর কথা আগেই বলে রাখতে পারেন। অথবা বাজার কিংবা আশেপাশের রেস্টুরেন্টে পছন্দমত মাছ কিনে সেখানেই বারবিকিউ করে খেয়ে নিতে পারেন রাতের খাবার।

তৃতীয় দিন

সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে বিদায়ী সমুদ্র স্নানের পর ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকুন। দুপুরের খাবার খেয়ে জাহাজ ছাড়ার সময়ের আগেই চলে যান জেটি ঘাতে। টেকনাফ এসে সেখান থেকে সরাসরি ঢাকায় আসার বিভিন্ন বাস পাওয়া যায়। আপনার পছন্দের বাসে বাড়ির পথে রওনা দিয়ে দিন।

এই পুরো পরিকল্পনা উল্টো ভাবেও সাজাতে পারেন যদি আপনার সুবিধা হয়। মানে হলো আপনি প্রথমে সেন্টমার্টিন গিয়ে সেখানে ঘুরে তারপর ফেরার পথে টেকনাফ থেকে কক্সবাজার গিয়ে সেখানে ঘুরে আপনার গন্তব্যে ফিরে আসুন।

প্রয়োজনীয় গাইড লাইন

সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজার ভ্রমণ পরিকল্পনা আরও সুন্দর করে সাজাতে পড়ে নিন আমাদের আরও কিছু গাইডলাইন। এতে করে জায়গা গুলো সম্পর্কে যেমনা আরও বিস্তারিত জানতে পারবেন তেমনি সুন্দর করে প্ল্যান করে ফেলতে পারবেন নিজের মত করেইঃ

কিছু টিপস

  • ভালো ভ্রমণের জন্যে প্রয়োজন ভাল একটি পরিকল্পনা। তাই ভাল করে পরিকল্পনা করে নিন। জেনে নিন কখন কি করবেন।
  • সিজনে অর্থাৎ ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী মাসে সরকারি ছুটির সময়ে পর্যটকের চাপ বেশি থাকে। সেই সময় গেলে আগে থেকে সব কিছু ঠিক করে নিন।
  • একটু নিরিবিলি পরিবেশ ও খরচ কমাতে ছুটির দিন ব্যাতিত ভ্রমণ করুন।
  • সেন্টমার্টিন ভ্রমণে জাহাজে যাওয়াটাই নিরাপদ।
  • সবকিছুতে ভালো করে দরদাম করে নিবেন।
  • খরচ কমাতে শেয়ার করে হোটেলে থাকা, খাওয়া এবং যাতায়াত করুন।
  • সমুদ্রে নামার ক্ষেত্রে সাবধান থাকুন।

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।