কক্সবাজার বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভ্রমণ স্থান। বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার বছরের পুরোটা সময় জুড়েই পর্যটকদের আকর্ষণ করে। জনপ্রিয় ভ্রমণ স্থান হবার কারণে কক্সবাজার ভ্রমণ খরচ নেহায়তই কম নয়। তবে কিছু বিষয় মেনে কক্সবাজার ঘুরতে গেলে এই খরচ অনেকখানি কমিয়ে আনা সম্ভব। ভ্রমণ গাইডের এই আয়োজনে থাকছে কম খরচে কক্সবাজার ভ্রমণের আদ্যোপান্ত।

সাধারণত যেকোন স্থানে ভ্রমণের খরচ মূলত আপনার উপরেই নির্ভর করে। আপনি যদি ব্যাকপ্যাকার ধরণের ভ্রমণকারী হয়ে থাকেন এবং আপনার কাছে যদি অন্য সব সুযোগ-সুবিধার চেয়ে ঘুরে বেড়ানোই মূখ্য হয়ে থাকে তাহলে আপনার ভ্রমণ খরচ কমানো অনেক সহজ হয়ে যাবে। তবে সবাই হয়তো এইভাবে ভ্রমণ করতে পারবেন না। তাই আমরা কক্সবাজার ভ্রমণের খরচ কমানোর জন্যে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। আপনি আপনার সুযোগ সুবিধা বিবেচনা করে টিপস গুলো কাজে লাগালে ও অবাঞ্ছিত খরচের দিকে খেয়াল রাখলে কক্সবাজার ভ্রমণের খরচ অনেকাংশে কমিয়ে নিতে পারবেন।

কক্সবাজার ভ্রমণের খরচ নির্ভর করে আপনি কোন সময় যাবেন, যাওয়া আসা কিভাবে করবেন, কোথায় থাকবেন, কি খাবেন, কি কি ঘুরে দেখবেন এই সব বিষয়ের উপর। আর এই সব কিছুতে কিভাবে খরচ নিয়ন্ত্রণ করবেন তাই এখন জানবো।

কখন যাবেন

খরচ কমানোর প্রথম যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো আপনি কোন সময় কক্সবাজার ঘুরতে যেতে চান। পিক সিজন বা পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজার ভ্রমণের খরচ অন্য সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পিক সিজন ছাড়াও বিভিন্ন উপলক্ষের দিন যেমন দুই ঈদের সময়, নতুন বছর শুরুর দিন, পয়েলা বৈশাখ বা টানা সরকারি ছুটির দিন, সাপ্তাহিক বন্ধের দিন গুলোতেও অতিরিক্ত মানুষের চাপে সবকিছুতেই খরচ বেশি থাকে। তাই খরচ কমাতে এমন একটা সময় বেচে নিন যখন কক্সবাজারে কম পর্যটক থাকে। শীতকালীন সময়টা কক্সবাজারের পিক সিজন। তাই এই সময় বা অন্যান্য বিশেষ দিন গুলো কক্সবাজার ভ্রমণ পরিহার করুন।

যাওয়া আসার খরচ

খরচ কমাতে দ্বিতীয় যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো আপনি কক্সবাজার কিভাবে যাওয়া আসা করবেন। এই ক্ষেত্রে রেলপথ বেশ কার্যকরী। ট্রেনের টিকিটের দাম বাসের ভাড়া থেকে বেশ কম এবং ট্রেন ভ্রমণ তুলনামূলক ভাবে আরামদায়ক। আপনার জায়গা থেকে যদি ট্রেনে করে চট্রগ্রাম পর্যন্ত যেতে পারেন তাহলে ট্রেনকেই বেচে নিতে পারেন খরচ কমাতে। আপনি যদি একটু কষ্ট করে লোকাল ট্রেনে যান তাহলে এইক্ষেত্রে অনেক খরচ কমানো সম্ভব। চট্রগ্রাম রেলস্টেশন থেকে নতুন ব্রিজ যাবেন, সেখানে কক্সবাজার যাওয়ার লোকাল বাস পাবেন, দরদাম করে উঠে পড়ুন। যদি ট্রেনে চট্টগ্রাম যাওয়া সম্ভব না হয় তবে কক্সবাজার যাবার নন এসি বাসে যাওয়া আসা করতে পারেন। নন এসি বাসে রাতের বেলায় ভ্রমণ করলে একদিকে যেমন অস্বাভাবিক গরম অনুভূত হবে না, অন্যদিকে এক রাতের হোটেলের ভাড়া বাঁচবে। এক্ষেত্রে সরাসরি কক্সবাজার যায় এমন বাসে যাওয়াই ভালো।

কোথায় থাকবেন

খরচ কমানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোথায় থাকবেন তার উপর নির্ভর করবে। সাধারণত কক্সবাজারে হোটেলগুলোর ভাড়া সিজনের উপর নির্ভর করে। অফ সিজনে ৩ স্টার মানের হোটেলেও ৬০০/৮০০ টাকায় এসি রুম পাওয়া যায়। মোটামুটি মানের আবাসিক হোটেল নন এসি রুম ৪০০/৫০০ টাকায় বা দুই-তিন রুমের ফ্ল্যাট ৮০০-১২০০ টাকায় পাবেন। তবে সেটা আপনার দরদামের সামর্থে উপর নির্ভর করবে। খরচ কমাতে তাই অফ সিজন বা বিশেষ দিন গুলো পরিহার করে কক্সবাজার যাওয়া শ্রেয়। বীচ থেকে যে হোটেলের দূরত্ব যত বেশি সে হোটেলের ভাড়াও বেশ কম। মেইন রোডের পেছনের দিকের কটেজ বা ছোট ছোট আবাসিক হোটেল গুলোতে ভাড়া বেশ কম হলেও আরামে থাকতে পারবেন। অফ সিজনে গেলে আগে থেকে বুকিং করার কোন প্রয়োজন নাই। নিজে গিয়েই রুম ঠিক করতে পারবেন। রিক্সাওয়ালা বা অন্যকেউ কোন হোটেলের কথা বললে তার কথা শুনবেন না। দালালদের দৌরাত্ব অনেক বেশি। যা করার নিজেই করবেন আর দামাদামি করতে লজ্জা পাবেন না। এছাড়া একসাথে কয়েকজনের গ্রুপ যদি হোন তাহলে রুম শেয়ার করে কয়েকজন মিলে থাকলে থাকার খরচ আরও কমে যাবে। হোটেলের রুম ঠিক করতে দল বেধে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, একজন গিয়ে রুম ঠিক করে বাকীদের ডেকে নিন।

কোথায় কি খাবেন

ভ্রমণের খরচ কমাতে অবশ্যই খাওয়া দাওয়ার পিছনে একটু লাগাম টানতে হবে। আপনার আশেপাশে মোটামুটি মানের রেস্তোরা খুঁজে নিয়ে খেতে হবে। দামী খাবার আইটেম গুলো বাদ রাখতে হবে। কয়েকজন থাকলে খাবার ভাগ করে খান। যেমন, জনপ্রতি ভর্তা ভাজি না নিয়ে ভাগ করে খেতে পারেন। প্রয়োজনবোধে দুই বা তিনজনের জন্য একটা সামুদ্রিক মাছ নিতে পারেন। কক্সবাজারে বিভিন্ন মানের রেস্টুরেন্ট বা খাবার হোটেল রয়েছে। তবে সুলভ মূল্যে ভাল মানের খাবার পরিবেশনের জন্য রোদেলা, ঝাউবন, ধানসিঁড়ি, পৌষি, নিরিবিলি, আল বোগদাদিয়া হোটেলের বেশ সুনাম রয়েছে।

হিমছড়ি এবং ইনানী বীচ যেতে চাইলে

কক্সবাজার যারা বেড়াতে আসেন তারা কক্সবাজারের মূল পয়েন্ট কলাতলী বীচ, সুগন্ধা বীচ, লাবনী বীচ ছাড়াও মেরিন ড্রাইভ দিয়ে হিমছড়ি বা ইনানী বীচ ঘুরতে যান। খরচ কমাতে হিমছড়ি বা ইনানী বীচ যেতে চাইলে কলাতলি থেকে লোকাল অটোরিক্সা পাবেন। তবে আপনারা যদি সংখ্যায় বেশি হোন তাহলে অটোরিক্সা রিজার্ভ করে নিতে পারেন। যেখান থেকেই গাড়ি ভাড়া করেন অবশ্যই ভালো মত দরদাম করে নিবেন। তবে পর্যটন মৌসুমে ভাড়া একটু বেশি থাকে।

কক্সবাজার ভ্রমণ খরচ

কক্সবাজার ভ্রমণে কেমন খরচ হতে পারে তার একটা তুলনামূলক চিত্র দেখতে পাবেন এইখানে। খরচ এমনই হবে তা হয়তো না, তবে আপনার খরচ কেমন হতে পারে তার একটা ধারণা হবে। আমরা খরচের যে চিত্র দিচ্ছি তা মূলত ২ জনের জন্যে কক্সবাজার ২ রাত থাকা খাওয়া ও ঢাকা থেকে যাওয়া আসা সহ। মনে রাখবেন আপনারা যত বেশি মানুষ হবেন, খরচ তত কম হবে যদি সব কিছু শেয়ার করে করেন।

খুব কম খরচের প্ল্যান (জনপ্রতি)

ঢাকা – কক্সবাজার যাওয়া আসা (ট্রেন + বাস) – ৪৫০ + ৩০০ = ৭৫০ টাকা
কক্সবাজার থাকা (২ রাত শেয়ার বেসিস) – ৩৫০ + ৩৫০ = ৭০০ টাকা
খাওয়া খরচ ( ২দিন, ৬ বেলা ) – ৮০ * ৩ + ৮০ * ৩ = ৪৮০ টাকা
আশেপাশে ঘুরাঘুরি খরচ – ৩০০ টাকা
অন্যান্য খরচ – ৩০০ টাকা

সর্বমোট খরচ – ২৫৩০ টাকা জনপ্রতি (যদি শুধু এক রাত থাকার জন্যে যান তাহলে খরচ কমে হবে ২২০০ টাকা মাত্র)

মোটামুটি খরচের প্ল্যান (জনপ্রতি)

ঢাকা – কক্সবাজার যাওয়া আসা (বাস) – ৮০০ + ৮০০ = ১৬০০ টাকা
কক্সবাজার থাকা (২ রাত শেয়ার বেসিস) – ৪৫০ + ৪৫০ = ৯০০ টাকা
খাওয়া খরচ ( ২দিন, ৬ বেলা ) – ১০০ * ৩ + ১০০ * ৩ = ৬০০ টাকা
আশেপাশে ঘুরাঘুরি খরচ – ৫০০ টাকা
অন্যান্য খরচ – ৫০০ টাকা

সর্বমোট খরচ – ৪১০০ টাকা জনপ্রতি (যদি শুধু এক রাত থাকার জন্যে যান তাহলে খরচ কমে হবে ৩৬০০ টাকা মাত্র)

আরও কিছু টিপস

  • দলগত ভাবে কয়েকজন মিলে ভ্রমণে গেলে খরচ অনেক কিছুতেই কম হয়।
  • হোটেল থেকে বীচে যেতে আসতে হাটার চেষ্টা করুন।
  • কোন কিছু খাওয়ার আগে দাম ও পরিমাণ নিশ্চিত হয়ে নিন।
  • প্রয়োজন না হলে বীচ মার্কেট থেকে কোন কিছু কিনবেন না। যদি কিনতেই হয় তবে ভালো করে দরদাম করে নিবেন।
  • যে কোন যানবাহনে কোথাও যাওয়ার আগে ভাড়া জিজ্ঞেস করুন। প্রয়োজনে দরদাম করুন।
  • ফেরার সময় আপনার গাড়ির ছাড়ার সময় সন্ধ্যা বা রাত হলে হোটেলে কতৃপক্ষের সময় অনুযায়ী হোটেল চেক আউট করুন। হোটেল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে ল্যাগেজ-ব্যাগ হোটেলে রাখার ব্যবস্থা করতে পারবেন।
  • ঝুঁকি এড়াতে বেশী রাতে একা একা সাগর সৈকতে ঘোরাফেরা করবেন না।
  • সমুদ্র সৈকতে নামার ক্ষেত্রে সাবধান থাকুন।
  • যে কোন প্রয়োজনে টুরিস্ট পুলিশের সহায়তা নিন।

আশা করি ভ্রমণ গাইডের এই প্রচেষ্টা আপনার কক্সবাজার ভ্রমণ খরচ কমাতে সাহায্য করবে। কক্সবাজার ভ্রমণ সম্পর্কে আরও কোন তথ্য জানার থাকলে আমাদের জানাতে পারেন। কক্সবাজার ভ্রমণের বিস্তারিত তথ্য জানতে পড়ুন আমাদের কক্সবাজার ভ্রমণ গাইড

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।