কম খরচে দেশের বাইরে ভ্রমণের ক্ষেত্রে পর্যটকদের পছন্দের দেশ ভুটান (Bhutan)। এখানে দেখার মতো যেমন আছে অনেক স্থাপত্যশিল্প তেমনি পাওয়া যাবে রাফটিং করার মতো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। আর তাই প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসে ভুটানের থিম্পু, পুনাখা ও পারো শহরের পর্যটন স্থানগুলো দেখতে। আর সার্কভুক্ত দেশ হওয়াতে বাংলাদেশীদের জন্য ভুটান ভ্রমণ আরও সুবিধাজনক।

ভুটান বেড়ানোর উপযুক্ত সময়

থিম্পু অর্থাৎ ভুটান ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস। আবহাওয়া ও ভুটানের প্রকৃতির সৌন্দর্য সব বিবেচনা করে এই তিন মাস বেড়ানোর জন্যে ভাল সময়।

কিভাবে ভুটান যাবেন

ভুটান ও বাংলাদেশের দূরত্ব বেশ কম। তাই ট্রানজিট ভিসার ব্যবস্থা করতে পারলে বাই রোডে যেতে পারেন ভুটান। সেই ক্ষেত্রে বাসে বুড়িমারী স্থল বন্দর পৌঁছে ইমিগ্রেশন শেষ করে চ্যাংড়াবান্ধা থেকে বাসে করে যেতে হবে ময়ানামতি। ময়নামতি বাইপাস রাস্তা থেকে কিছুক্ষন পর পর শিলিগুড়ির বাস পাওয়া যায়। শিলিগুড়ি জয়গাঁ থেকে  ইন্ডিয়া স্থল বন্দর এ গিয়ে ইমিগ্রেশন শেষ করে ভুটান গেটে যেতে হবে। ভুটান গেটে থেকে এন্ট্রি পারমিশন নিয়ে ভুটানের রাজধানী শহর থিম্পু (Thimpu) তে যেতে পারবেন।

পড়ুন : ভুটান ভিসার বিস্তারিত

সড়ক পথে ভুটানে যাওয়া অনেক ঝামেলার মনে হয় অনেকের কাছে তাই সেই ক্ষেত্রে বিমানে যাওয়া সুবিধাজনক। তবে বিমানে যাতায়াতে খরচ বেশী হয় বলে অনেকেই খরচ কমানোর জন্য সড়ক পথেই ভুটানে যেতে পছন্দ করে। আর সার্কভুক্ত দেশ হওয়ায় বিমানে যাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু মাত্র এন্ট্রি পারমিট লাগে। ড্রুক এয়ারলাইন্স এ সরাসরি ঢাকা থেকে ভুটানের পারো (Paro) তে যাওয়া যায়।

ভুটান ভ্রমণ খরচ

যেকোনো বাইরের দেশ ভ্রমনের ক্ষেত্রে কয়েকজন মিলে গ্রুপ করে বা কোনও ট্র্যাভেল গ্রুপের সাথে গেলে খরচ যেমন অনেক কম হয় তেমনি এককভাবেও কোনও সমস্যায় পড়তে হয় না। আর সমস্যা হলেও সবাই মিলে একটা সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়। আর তাই একক ভাবে বা নিজের পরিবার নিয়ে যেতে চাইলে তখন খরচ একটু বেশী হবে, এটা মাথায় রেখেই ভ্রমণের পুরো পরিকল্পনা করতে হবে।

বিমানে একক ভাবে ৪/৫ দিনের জন্য ভুটানে গিয়ে থিম্পু, পারো ও পুনাখা ঘুরে আসতে ২৫,০০০ -২৮,০০০ টাকা খরচ হবে। তবে গ্রুপ করে গেলে যেমন ৪/৫ জন বা ৬/৭ জন, তাহলে খরচ কিছুটা কম হবে।

আর বাই রোডে গেলে খরচ কিছুটা কমে যাবে। দলগত ভাবে গেলে ৪-৫ দিনে থিম্পু, পারো ও পুনাখা ঘুরে বেড়াবার জন্যে জনপ্রতি ১৬,০০০-১৮,০০০ টাকা খরচ হবে। আরও কম খরচে ভ্রমণ সম্ভব যদি আপনি ব্যাকপ্যাকার ধরণের ট্রাভেলার হয়ে থাকেন।

ভ্রমণ প্ল্যান – কিভাবে সাজাবেন ট্যুর

৫-৬ দিনের জন্য ভুটানে গেলে থিম্পু, পারো সহ পুনাখা ভালো ভাবে ঘুরে আসতে পারবেন। সেই ক্ষেত্রে নিচের ভ্রমণ পরিকল্পনা কাজে লাগাতে পারেন-

১ম দিন

যদি বাসে ভ্রমণ করেন তাহলে গাবতলী বা কল্যাণপুর থেকে রাতের বাসে রওনা দিয়ে সকালে বুড়িমারী বর্ডার এসে পৌছাবেন। বুড়িমারী থেকে ভারত ইমিগ্রেশন শেষ করে চ্যাংড়া বান্দা থেকে ময়নামতি বাইপাস হয়ে জয়গাও ইমিগ্রেশন থেকে এক্সিট সিল লাগিয়ে ভুটান গেট চলে যান। ভুটান গেটে ইমিগ্রেশন শেষ করে ফুন্টশোলিং থেকে থিম্পু যেতে হবে। এর মধ্যে সকালের নাস্তা বুড়িমারী বাজারে করে নিতে পারবেন আর দুপুরের খাবার ফুন্টশোলিং পৌঁছেও করতে পারবেন। মূলত ইমিগ্রেশনেই সময় বেশী লাগে। তাই ইমিগ্রেশন শেষ করে দুপুর বা বিকালের দিকে বাস বা ট্যাক্সিতে থিম্পু পৌছাতে প্রায় রাত ৮-১০টা বেজে যায়। থিম্পু পৌঁছে হোটেলে চেক ইন করে রাতের খাবার হোটেলেই খেয়ে নিন। আর যেহেতু থিম্পু পৌছাতে পৌছাতে রাত হয়ে যাবে তাই হিসেবে প্রথম দিন ওভাবে কিছু দেখা সম্ভব হবে না।

আর বিমানে ভুটানে গেলে হোটেলে না উঠে ট্যাক্সি ভাড়া করে পারো শহরের ভিতরের কিছু জায়গা দেখে নিতে পারেন। আর কিছু জায়গা ফেরার দিনের জন্য রেখে দিন তাতে সুবিধা হবে। তারপর নতুন কোন ট্যাক্সি বা গাড়ি ভাড়া করে থিম্পু শহরে চলে যান।

২য় দিন

২য় দিনে থিম্পু শহরটা ঘুরে দেখুন। তবে অবশ্যই সকাল সকাল নাস্তা খেয়ে বের হবেন। যদি পায়ে হেঁটে কাছাকাছি জায়গা গুলো দেখেন তাহলে খরচ ও কম হবে আর ঘুরে ঘুরে নানা জায়গা দেখা যাবে। হাঁটা দূরত্বের মধ্যে থিম্পু শহরে দেখতে পারবেন- সিটি ভিউ পয়েন্ট, মেমোরিয়াল চর্টেন, ক্লক টাওয়ার, থিম্পু নদী, থিম্পু জং, লাইব্রেরি, থিম্পু ডিজং ও পার্লামেন্ট হাউস। আর শহর থেকে একটু দূরের জায়গা গুলো দেখতে হবে ট্যাক্সিতে করে। যেমন- ন্যাশনাল তাকিন সংরক্ষিত চিড়িয়াখানা, বুদ্ধ দর্দেনমা স্ট্যাচু, থিম্পু ন্যাশনাল মেমোরিয়াল চর্টেন। এর মধ্যে বাইরে কোথাও দুপরের খাবার খেয়ে নিন। আর তাসিং ডিজং বা থিম্পু দিজং এর পাশেই ইমিগ্রেশন অফিস। ওখানে আবেদনপত্র পূরণ করে পুনাখা শহরে ঢোকার পারমিট নিতে হবে। এর মধ্যেই আগামী দিন সকালে পুনাখা যাবার বাসের অগ্রিম টিকেট কেটে রাখতে হবে। কারন থিম্পু থেকে সারদিনে মাত্র ২ টা বাস পুনাখাতে যায়। আবার ট্যাক্সি শেয়ার করেও পুনাখা যেতে পারেন। সেই ক্ষেত্রে সময় ১ ঘণ্টা কম লাগবে।

থিম্পু ভূটান ভ্রমণ গাইড
থিম্পু, ভুটান

৩য় দিন

সকাল সকাল থিম্পু থেকে পুনাখা (Punakha) চলে যাবেন। এখানে আসলে গাড়ি ভাড়া করে পুরো শহরটা দেখে নিলে ভালো হবে। প্রথমেই যেতে পারেন দোচুলা পাস কারন ওখানে যাওয়া বেশ সময় সাপেক্ষ আর ফেরার পথে আরও কিছু স্থান দেখতে পারবেন। দো চুলা পাস ঘুরতে ৩.৫ থেকে ৪ ঘণ্টার মতো লাগবে। তারপর ফেরার পথে পুনাখা জং (Punakha Dzong), ন্যাশনাল লাইব্রেরি, আর্ট স্কুল, ফোক হেরিটেজ মিউজিয়াম এই জায়গা গুলো দেখে আসতে পারেন। এরপর এই দিন হয়ত আর সময় হবে না। আর রাফটিং না করলে পুনাখার আসল মজা আসলে পাওয়া যাবে না। তাই এই দিন পুনাখাতে থেকে যাওয়া ভালো।

পুনাখা ভুটান ভ্রমণ
পুনাখা, ভুটান

৪র্থ দিন

এই দিন সকাল সকাল বের হয়ে লাখাং মন্দির, পেলিরি মন্দির, তালো মনস্ট্রি দেখে ফু ছু নদীতে রাফটিং এর জন্য যেতে পারেন। এই দিন আসলে রাফটিং এ বেশী সময় দিলে ভালো লাগবে। আর রাফটিং এর সাথেই সাসপেনশন ব্রিজ (Suspension Bridge) দেখা হবে। সময় থাকলে ন্যাশনাল পার্ক আর টর্সা ন্যাচারাল রিজার্ভার দেখে আসতে পারেন। তবে হ্যাঁ, সন্ধ্যার মধ্যে পুনাখা থেকে থিম্পু হোটেলে ফিরে আসলে ভালো কারণ পরের দিন আবার পারোর উদ্দ্যেশে রওনা দিতে হবে। তাই রাতে ভালো ঘুমের দরকার আছে।

৫ম দিন

পুনাখা থেকে সকাল সকাল পারো যেতে পারবেন ট্যাক্সি বা গাড়ি ভাড়া করে। সকালে চলে যেতে পারেন চেলে লা পাসে যা ভুটানের সবচেয়ে উঁচু রাস্তা। এখান থেকে জলমহরি পর্বত দেখা যায়। তারপর এক এক করে গাড়ি বা ট্যাক্সি ভাড়া করে টাইগারস নেস্ট (Tiger Nest), ন্যাশনাল মিউজিয়াম, রিনপুং জং, পারো মনস্ট্রি (Paro Taktsang), কিচু মনস্ট্রি, পারো চু সহ আরও কিছু জায়গা ঘুরে দেখবেন। পারোতে একদিন থেকে তাং সাং দেখলে ভালো হবে কারন শহর থেকে তাং সাং ৮০ কিলো দূরে। আর রাতে পারোতেই থাকা ভালো আর সন্ধ্যার মধ্যেই সকালে ফুন্টশোলিং যাবার টিকিট কেটে রাখতে হবে।

পারো, ভুটান ভ্রমণ
পারো, ভুটান

আর বিমানে ঢাকায় ফিরতে হলে পারো থেকে আর ফুন্টশোলিং যেতে হবে না, পারোতেই থেকে যেতে হবে। তারপর পারো বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ড্রুক এয়ারলাইন্স এ ঢাকায় ফেরা যাবে। আর সেই ক্ষেত্রে পারোর বাকি জায়গা গুলো দেখে নিতে পারবেন যা আগে দেখা বাকি ছিল। তাই বিমানে ভুটান আসা যাওয়া করলে এক দিন সময় কম লাগতে পারে।

৬ষ্ঠ দিন

এই দিন সকাল সকাল রওনা দিতে হবে কারন জয়গাঁও ও বুড়িমারীতে ইমিগ্রেশনের ব্যাপার আছে। তাই সময় থাকলে তাং সাং দেখে নিতে পারেন যদি আগের দিন ট্যাক্সি টিক করে রাখেন। তারপর ফুন্টশোলিং এসে ইমিগ্রেশন শেষ করে এক্সিট সিল নিয়ে নিন। বাসে যাবার ক্ষেত্রে আবার আগের মতোই ভুটান গেট থেকে জয়গাও – ময়নামতি বা হাসিমারা- চ্যাংড়া বান্ধা – বুড়িমারী বর্ডার হয়ে ঢাকায় ফিরতে হবে।

ভুটান ভ্রমণের ক্ষেত্রে কিছু টিপস

  • ভুটানে কম খরচে ভ্রমণ করতে হলে অফ সিজনে যাওয়া ভালো। তাই মার্চ, এপ্রিল ,অক্টোবর ও নভেম্বর অন সিজনের এই চার মাস বাদ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন আর কম দামে বিমানের টিকেট পেতেকমপক্ষে তিন মাস আগে বিমানের টিকেট বুকিং দেওয়ার চেষ্টা করবেন।
  • ভুটানে এটিএম বুথ সবসময় কাজ করে নাআর বুথে টাকা বেশী থাকে না তাই ভুটানের এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে চাইলে এই ব্যাপারে খেয়াল রাখবেন।
  • একটি ইউনিভার্সাল অ্যাডাপ্টার সাথে রাখুন , আপনার মোবাইল চার্জ দেওয়া ছাড়াও আরও অন্যান্য অনেক কাজে আসবে এই অ্যাডাপ্টার।
  • যেকোনো স্থান বিশেষ করে জং, মন্দির বা কোনও ধর্মীয় স্থ্যান পরিদর্শনের সময় সেই জায়গার নির্দেশনাবলী মেনে চলার সবসময় চেষ্টা করবেন।

ফিচার ইমেজ : Pixabay.com

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।