ভারতের হিমাচল প্রদেশের চমৎকার একটি পর্যটন শহর শিমলা (Shimla)। ইংরেজ শাসনামলে শিমলাকে গরমের দিনের অবকাশ যাপনের জন্য “গ্রীষ্মকালের রাজধানী শহর” হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। “হিল ষ্টেশনের রানী” হিসেবে পরিচিত এই শহর প্রাকৃতিক নৈসর্গে পরিপূর্ণ। আর পর্যটকদের কাছে শীতের ওয়ান্ডারল্যান্ড হিসেবে খ্যাত শিমলাতে ঘুরে দেখার জন্য অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে।

শিমলাতে দর্শনীয় স্থান

ছোট্ট সুন্দর শহর শিমলা পর্যটকদের মুগ্ধ করার জন্য যেন বাহারি রূপের পসরা সাজিয়ে আছে। বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য উপভোগের জন্য ভারতে আগত দেশ বিদেশের পর্যটকদের পছন্দের শীর্ষে শিমলার অবস্থান।

মল রোড (Mall Road): রিজের রাস্তা ধরে হেঁটে নিচে গেলেই শিমলার মল রোড। মল রোড টি দুই ভাগে বিভক্ত। মল রোডে শিমলার বিভিন্ন প্রশাসনিক ভবনের সাথে সাথে অসংখ্য ল্যান্ডমার্ক রয়েছে। মল রোডের স্নো ফল দেখার অভিজ্ঞতা এক কথায় অসাধারণ। এই রাস্তা ধরে হাঁটলে শিমলা শহরের নাগরিক জীবনের দেখা পাবেন। এছাড়াও এখানে আছে ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট ও অসংখ্য দোকানসহ বিনোদনের নানা আয়োজন।

দ্যা রিজ (The Ridge): শহরের কেন্দ্রে মল রোডের কাছে অবস্থিত এই স্থান শিমলার সকল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল। বিশাল বড় এরিয়া নিয়ে গড়ে উঠা এই খোলা চত্বরের আশেপাশে বেশকিছু পুরনো বিল্ডিং আছে। এখানকার সূর্যাস্তের দৃশ্য দারুণ উপভোগ্য।

ক্রাইস্ট চার্চ (Christ Church): ১৮৫৭ সালে নির্মিত ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীণ গির্জাটি দ্যা রিজ থেকে হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত। ঐতিহাসিক নিদর্শন ও ধর্মীয় ভাব গাম্ভির্যপূর্ণ এই চার্চ শিমলার একটি বিখ্যাত ল্যান্ডমার্ক। নিও-গোথিক স্থাপত্যের নিদর্শন চার্চটি এলিজাবেথিয় নকশা ও চারপাশের উৎসব মুখর পরিবেশের জন্য অধিক জনপ্রিয়।

সামার হিল (Summer Hill): মল রোড কাছেই কালকা-শিমলা রেললাইনে অবস্থিত সামার হিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য পর্যটকদের কাছে পছন্দের স্থান। এই পাহাড় শিমলার বিখ্যাত সাতটি পাহাড়ের একটি অংশ যেখান থেকে পাইন, ওক, সেডার ও দেবদারু গাছের মাঝে অবস্থিত ছোট ছোট ভিলার প্যানোরমিক ভিউ খুব সুন্দর দেখা যায়।

ভ্যাইসরিগেল লজ (Viceregal Lodge): ১৮৮৮ সালে স্থপতি ব্রিটিশ হেনরি ইরউইনের ডিজাইনে নির্মিত ১৩০ বছরের পুরনো এই লজ ব্রিটিশ ভাইসরয়ের বাসভবন ছিল। বর্তমানে লজটি ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ অ্যাডভান্স স্টাডিজের সদরদপ্তর হিসেবে পরিচিত। জ্যাকোবিয়ান স্টাইলে নির্মাণ করা দৃষ্টিনন্দন ভবন শিমলার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের এক ঐতিহাসিক সাক্ষী।

সেন্ট মাইকেল ক্যাথিড্রাল (ST. Michael’s Cathedral): ১৮৮৫ সালে নির্মিত এই চার্চ শিমলার প্রথম ক্যাথলিক গির্জা। গির্জায় স্থাপিত পাঁচটি বেদি ইতালি থেকে আনা হয়েছে। গির্জায় পাথরের কারুকাজ দেখতে ও নিরিবিলি সময় কাটাতে অসংখ্য পর্যটক এখানে আসেন।

হিমাচল ষ্টেট মিউজিয়াম (Himachal State Museum): হিমাচল ষ্টেট মিউজিয়ামের ৩৫টি গ্যালারিতে হিমাচলের সংস্কৃতির বিভিন্ন প্রাচীন নিদর্শন কয়েন, নিত্য ব্যবহৃত সরঞ্জাম, মাটির জিনিসপত্র, গহনা, পেইন্টিং ও পোশাক-পরিচ্ছদ সংরক্ষিত আছে।

জনি’স ওয়াক্স মিউজিয়াম (Wax Museum): জাদুঘরটিতে বিভিন্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যাক্তিবর্গের মোমের ভাস্কর্য রাখা আছে। জাদুঘরে জনপ্রতি প্রবেশ ফি ২৫০ রুপি।

গেইতি হেরিটেজ কালচারাল কমপ্লেক্স (Gaiety Heritage): ১৮৮৭ সালে স্থাপিত কমপ্লেক্সটিতে ব্রিটিশ বাসিন্দাদের বিনোদনের জন্য নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। বর্তমানে এখানে বিভিন্ন ধরনের শো ও প্রদর্শনী হয়ে থাকে। এখানে অবস্থিত চার্চ সকাল ১১ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। কমপ্লেক্সে জনপ্রতি প্রবেশ ফি ১০ রুপি।

শিমলা ভ্রমণ গাইড
শিমলা শহর ছবি: gksimaginary

কোটগড় (Kotgarh): শিমলা থেকে ৮২ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ৬,৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত কোটগড় মূলত আপেলের বাগানের জন্য বিখ্যাত। এখানে হেতু পিক ও মন্দির, তানজুব্বার লেক ও দেরথু মাতা টেম্পল সহ বেশকিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে।

জাখু (Jakhoo): হিন্দুদের হনুমান দেবতাকে উৎসর্গ করে নির্মাণ করা প্রাচীন এই মন্দির শিমলার সর্বোচ্চ পিক জাখো হিলে অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৪৫৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই মন্দিরে প্রতি বছর “দশেরা” উৎসব হয় যা দেখতে হাজার হাজার পর্যটক ভিড় জমায়।

কুফরি (Kufri): শিমলা থেকে ২১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কুফরিতে আছে হিমালায়ান ন্যাচার পার্ক, কুফরি ফান ওয়ার্ল্ড, মাহাশু পিক, শিমলা রিসার্ভ ফরেস্ট সাংচুরি, শিমলা ওয়াটার ওয়াইল্ড লাইফ সাংচুরি ও নাগ টেম্পল। এছাড়া কুফরিতে ইয়াক রাইড, মাহাসু পিক থেকে স্কাইং ও ছালিতে ট্র্যাকিং করার সুযোগ আছে।

ফাগু (Fagu): শিমলা থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই স্থানে শীতের সময় স্কাইং ও উইন্টার স্পোর্টস অনেক বেশী জনপ্রিয়। ফাগুর গিরি উপত্যকা থেকে শিমলার ও চারপাশের চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়।

এছাড়া হাতে সময় শিমলার নালদেহরা এবং তত্তপানির মতো জায়গা গুলোও ঘুরে আসতে পারেন।

শিমলা কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে হানিফ, শ্যামলী বা ঈগলের বাসে বেনাপোল যেতে হবে। তবে হানিফের সার্ভিসই বেশী জনপ্রিয়। বেনাপোল থেকে বর্ডার পার হয়ে ট্যাক্সিতে ৪০-৫০ রুপি খরচ করে বনগাঁও রেল ষ্টেশন যেতে হবে। বনগাঁও থেকে লোকাল ট্রেনে কলকাতা গিয়ে হাওড়া রেল ষ্টেশন চলে যান। হাওড়া থেকে দিল্লি যাওয়ার জন্য ফরেন রিজারভেশন ব্যুরোর অফিস থেকে ফরেইনার হিসেবে টিকেট কাটতে হবে। দিল্লি পৌঁছে মেট্রো লাইন ধরে কাশ্মীর গেট ষ্টেশন পৌঁছে যান। কাশ্মীর গেট ষ্টেশন থেকে দিল্লির বিভিন্ন স্টেটের বাস ছাড়ে।

ট্রেনে যেতে চাইলে দিল্লি থেকে কালকা হয়ে তারপর শিমলা যেতে হবে। এছাড়া ঢাকা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও স্পাইস জেটের সরাসরি দিল্লিগামী ফ্লাইট আছে। দিল্লি থেকে শিমলা যাওয়ার জন্য ডোমেস্টিক ফ্লাইট আছে। তাই ঢাকা থেকে বিমানে দিল্লি গিয়ে তারপর প্লেনে বা বাসে সহজে শিমলা যেতে পারবেন।

আরও পড়ুনঃ মানালি ভ্রমণ গাইড

শিমলা ভ্রমণ খরচ

ঢাকা থেকে দিল্লি যেতে নূন্যতম ১,৮০০-২,০০০ টাকা খরচ হবে। আর দিল্লি থেকে কালকা হয়ে শিমলা যেতে ৮০০-১২০০ টাকা খরচ হবে। শিমলাতে থাকা খাওয়া ও ঘোরাঘুরি সহ ৩ রাত ২ দিন থাকতে জনপ্রতি ১২,০০০-১৫,০০০ থাকা খরচ হবে। তবে প্লেনে যাতায়াত করলে খরচ প্রায় দ্বিগুণেরও বেশী হবে। আবার প্যারাগ্লাডিং, জিপ লাইনিংয়ের মতো এডভেঞ্চার রাইডের জন্য বাড়তি খরচ যুক্ত হবে।

কোথায় থাকবেন

শিমলার মল রোড, জাখু টেম্পলের কাছে থাকার জন্য বেশকিছু ভালো মানের হোটেল আছে। রাজ হোম স্টে, থিরাম শিমলা, নিউ সান্সার মল রোড, মেহদুদিয়া গেস্ট হাউজ, হোটেল ভাটিকা, কাভ্যা হোম স্টে, আমারভিলা হোটেল, আডোব রুমস হোটেল সি শিমলা ইত্যাদি হোটেল ও গেস্ট হাউজে একরাতের জন্য দুইজনের থাকতে ৫৫০-১০০০ টাকা খরচ হবে।

কোথায় কি খাবেন

শিমলার ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে ছা ঘোস্ট (দই দিয়ে ভেড়ার মাংস), মুর্গ আনারদানা (ডালিমের সাথে মুরগির স্টু) ও ডাল ছানা বিশেষভাবে জনপ্রিয়। এছাড়াও Qila, The Devicos, Baljee’s & Fascination, Cecil এর মতো রেস্টুরেন্টে ভালো মানের খাবার পাবেন। আর খাবারের মধ্যে ফালাফেল, মাদ্রা (বিভিন্ন মশলার মিশ্রণে তৈরি ডাল), ধাম (ডাল, রাজমা, ভাত, দই, গুঁড় দিয়ে সাজানো এক ধরনের বিশেষ প্ল্যাটার), সিদু ( এক ধরনের বিশেষ রুটি), থুকপা (নুডুলস সুপ), বাবরু (ডালের বড়ার সাথে তেঁতুলের চাটনি) ও মাশ ডালের মতো খাবার খেতে পারেন। দ্যা রিজে ঐতিহ্যবাহী কিছু স্ট্রীট ফুডগুলোর স্বাদ নয়ে দেখতে পারেন।

কোথায় কি কিনবেন

শিমলার লাখ্যার বাজার, হিমাচল ইউরোপিয়ান, লোয়ার বাজার, তিব্বতিয়ান মার্কেট ও দ্যা রিজ শপিংয়ের জন্য প্রসিদ্ধ। এখান থেকে স্থানীয় বিভিন্ন জিনিসের সাথে পশমি কাপড়, হিমাচলের বিশেষ হ্যাট, হ্যান্ডি ক্র্যাফটস, হাতে বানানো ঐতিহ্যবাহী কাঠের ও মাটির জিনিস কিনতে পারবেন।

শিমলা ভ্রমণ পরামর্শ

  • পাহাড়ে অবস্থিত টুরিস্ট স্পটগুলোতে চলাফেরা করার ক্ষেত্রে সাবধানে থাকবেন।
  • মন্দিরগুলোতে অসংখ্য বাঁদর আছে যেগুলো সুযোগ পেলেই পর্যটকদের জিনিসপত্র কেড়ে নেয় তাই ছোট ছোট জিনিসপত্র সাবধানে রাখবেন।
  • শিমলা ভ্রমণে গেলে সাথে মানালি যুক্ত করুন। একসাথে ঘুরে দেখলে খরচ কম হবে আর এটিই সবার কাছে জনপ্রিয়।
  • দালাল হতে সতর্ক থাকুন।
  • ট্রেন ও বাসের যাবতীয় তথ্যের জন্য WHERE IS MY TRAIN, IXIGO, HRTC ও UBER ব্যবহার করুন।
  • ডুয়েল কারেন্সি থাকলে অনলাইনে ট্রেনের টিকেট কাটতে সুবিধা হবে।
  • ট্রেনে যাতায়াতের ক্ষেত্রে শুকনো খাবার ও পানির বোতল সাথে রাখুন।
  • আগে থেকে টয় ট্রেনের টিকেট বুকিং না দিয়ে কালকা গিয়ে টিকেট কাটবেন তাতে খরচ কম হবে।
  • যেসকল জায়গায় যাবেন সেসব স্থানের অফলাইন ম্যাপ মোবাইলে ডাউনলোড করে রাখুন।

Feature Image : VResorts

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।