ভুটান (Bhutan) এর রাজধানী থিম্পু থেকে ৭২ কিলো দূরে অবস্থিত একটি সুন্দর শহর পুনাখা। পুরো শহরটা যেন বড় বড় পাহাড়, ঝর্ণা ও গাছ গাছালি দিয়ে ঘেরা। প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য ভালো লাগার মতো একটি শহর। আর তাই ভ্রমণ প্রেমিরা ভিন্ন ধরনের এক অভিজ্ঞতা পেতে প্রায়ই পাড়ি জমায় এই সুন্দর পুনাখা (Punakha) শহরে।

ভুটানের পুনাখা ভ্রমণের উপযুক্ত সময় : মার্চ থেকে মে এবং অক্টোবর থেকে নভেম্বর এই সময়টা হল ভুটানের পুনাখা ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে ভালো সময়।

পুনাখার দর্শনীয় স্থান

পুনাখার পুরো শহরটাই আসলে দেখার মতো। শহরের ভিতরে রয়েছে নানা ধরনের চমৎকার কিছু স্থাপনা ও মন্দির। যদিও পুনাখাতে দেখার মতো জায়গা কম তবে পাওয়া যাবে রোমাঞ্চকর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। পুনাখাতে দেখার মতো জায়গাগুলো হল-

পুনাখা জং : ভুটানের রাজ পরিবারের জন্য পুনাখা জং একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ জায়গা। পুনাখা শহরের অন্যান্য সকল জং ভবনের মধ্যে পুনাখা জং সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এর পাশেই দেখার মতো বেশ কিছু জায়গা আছে। এখানে এন্ট্রি ফি ৩০০ টাকা।

খামসুম ইউলির নামগাল চর্টেন : এই মন্দিরটি মূলত বিশ্বের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এখানে ট্র্যাকিং করার সুযোগ আছে। এই মন্দিরের শীর্ষ থেকে পুরো ভ্যালির সৌন্দর্যচোখে পরার মতো।

সাংচেন দর্জি লুএনড্রুপ নুনারী : বৌদ্ধদেরধ্যান করার জন্য একটি উপাসানলয়। সাদা রঙের দেয়ালে লাল,কালো ও সোনালি  রঙ দিয়ে কাঠে খোঁদাই করা একটি সুন্দর ভবন যা সবার নজরে পড়ে। এখানে ১০০ জনের ও বেশী নান (খ্রিস্টানদের ধর্মযাজক) অবস্থান করে। এখানে আভলোকেশ্বরের একটি বিশাল ১৪ ফুটের ব্রোঞ্জের মূর্তি আছে। এখান থেকে পুনাখা ভ্যালীর সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর।

জাংদো পেলরি মন্দির : ফুন্টশোলিং শহরে অবস্থিত  ভুটানের একটি ধর্মীয় ও পবিত্র স্থান এই মন্দির।   এখানে গুরু মূর্তির দেখা মিলবে। মন্দিরের ভিতরের দেয়াল গৌতম বৌদ্ধের জীবনের নানা ধরনের রঙিন চিত্র দিয়ে সাজানো।

চিমি লাখাং মন্দির : পুনাখার একটি বিশেষ ভৌতিক জায়গা নামে পরিচিত এই চিমি লাখাং মন্দির। যদি আপনি অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী হয়ে থাকেন তাহলের মন্দিরের ভিতর ও বাইরের পরিবেশ আপনাকে অন্য ধরনের এক নতুন অভিজ্ঞতা দিবে।

সাসপেনশন ব্রিজ : ভুটানের দ্বিতীয় বৃহত্তম সাসপেনশন ব্রিজ,যার উপর থেকে ভুটানের পাহাড়, উপত্যকা ও ফু ছু নদীর এক অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য চোখে পড়ে। এর চমৎকার নির্মাণশৈলী ও নজরে পড়ে সবার।

তালো মনস্ট্রি :  পুনাখা উপাত্যকা থেকে ২৮০০ মিটার উপরে ভুটানের গ্রামীণ জীবনের চিত্র দেখা যাবে এখানে। প্রকৃতির নানাবৈচিত্যের মাঝে কিভাবে ভুটানের স্থানীয়রা বসবাস করে তার এক প্রকৃত উদাহরন হলো এই গ্রাম। পুনাখা শহর থেকে এক ঘণ্টার সফর করে এখানে ঘুরে আসলে ভালো লাগবে যেকারো।

মোও ফু ছু নদী : মো ও ফু ছু নদীর শীতল পানির মধ্যে রোমাঞ্চকর অনূভুতি পেতে পুনাখায় যারাই এখন ভ্রমনে যাবেন রাফটিং না করে আসবেন না। এ এক অন্য রকম অনুভূতি অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের জন্য।

টর্সা সংরক্ষিত প্রাকৃতিক রিজার্ভার : এটি পর্যটকদের জন্য একটি বিশেষ আকর্ষণ। পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক রিজার্ভার যা এখনো মানুষের আবাস্থল দিয়ে নষ্ট হয় নি। এর চারপাশ আলপাইন  ও পাহাড়ি গাছের বিস্তৃত পাতা দিয়ে সাজানো। এখানে নানা ধরনের বিপন্ন গাছ, উদ্ভিদ ও মনোরম লেকের দেখা মিলবে।

জিগমে দর্জি ন্যাশনাল পার্ক : ভুটানের মধ্যে এই পার্ক দ্বিতীয় বৃহত্তম ও এখানে নানা ধরনের বিপন্ন প্রানির দেখা পাওয়া যায় যেমন- তুষার চিতাবাঘ, হিমালায়ান মাস্ক হরিন, এশিয়াটিক বন্য কুকুর, লাল পাণণ্ডাসহ আরও অনেক জীব বৈচিত্যের দেখা মিলবে এই পার্কে। বিরল প্রজাতির জন্য বেশ কিছু রিজার্ভ হাউস আছে।বিশেষ করে পাখী প্রেমীদের জন্য পাখীদের রিজার্ভ হাউজ নিঃসন্দেহে ভালো লাগবে।

দোচুলা পাস : এই স্থান ভুটানিদের পুণ্যভূমি। এখানকার বৌদ্ধ মঠ পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। এই পাসের শীর্ষ থেকে হিমালয়ান রেঞ্জ দেখা যায়। থিম্পু থেকে পুনাখা যাওয়া আসার পথেই দোচুলা পাস-এ যেতে পারবেন।

এছাড়াও ঘুরে আসতে পারেন হা ভ্যালী, ন্যাশনাল লাইব্রেরি, রয়্যাল বোটানিক্যাল পার্ক, হ্যান্ডি ক্র্যাফটস এম্পোরিয়াম, পেইন্টিং স্কুল এবং ট্র্যাডিশনাল মেডিক্যাল ইন্সিটিউট এর মতো জায়গা গুলো।

ট্রেকিং করার মতো পাহাড় বা উপাত্যকা : পুনাখা ভ্যালীর আসে পাশে ট্রেকিং করার মতো বেশ কিছু পাহাড় আছে। যেমন- কামসুন ইউলি নামগেল চর্টেন, জানা গ্রাম (কিচু রিসোর্ট এর পাশে), দোচুলা থেকে থিনলেগাং ন এবং লাম্পেরি থেকে লুম্বিটসাওয়া।

কিভাবে যাবেন পুনাখা

বাই রোড কিংবা বিমানে পারোতে যে ভাবেই ভুটান আসেন আপনাকে প্রথমে থিম্পু (Thimpu) আসতে হবে। আর পুনাখা যাওয়ার জন্যে আলাদা করে থিম্পু ইমিগ্রেশন অফিস থেকে পার্মিশন নিতে হবে। থিম্পু থেকে পুনাখা যাওয়া যায় ট্যাক্সি বা গাড়ি রিজার্ভ করে। ট্যাক্সিতে ৮৫ কিলো পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে ২.৫০-৩ ঘন্টার মতো। এছাড়াও বাসে করে যাওয়া যায় পুনাখা। থিম্পু থেকে পুনাখা যাওয়ার জন্য দুই তিনটা বাস আছে যা প্রতিদিন দুপুরে পুনাখার উদ্দ্যেশে রওনা হয়। সেইক্ষেত্রে অবশ্য সময় কম লাগে।

আরও পড়ুন : ভুটান ট্যুর প্ল্যান

কোথায় থাকবেন

পুনাখায় থাকার জন্য বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল ও কটেজ আছে। যেমন-মেনদ্রেলগাং হোম স্টে, হিমালায়া ড্রাগনস নেস্ট হোটেল, পুনাটসাংচু জেমন সহ বেশ কিছু হোটেল। তবে শহর থেকে একটু বাইরের হোটেলগুলোতে থাকার খরচ কম হবে। ২৮০০-৩৫০০ টাকার মধ্যে দুই জনের জন্য ভালো ডাবল রুম পাওয়া যাবে।

পুনাখা ভ্রমণ খরচ

পুনাখায় রাফটিং করলে খরচ একটু বেশী পড়বে। অফ সিজনে গেলে খরচ পড়বে ১০০০-১৫০০ রুপি আর অন সিজনে ২০০০-২৫০০ রুপি। বিমানে রিটার্ন টিকেটসহ জন প্রতি খরচ ২৫০০০ টাকা। সব মিলিয়ে ৫দিন ৪রাত থাকার জন্য জনপ্রতি ২২-২৩ হাজার টাকা খরচ হবে। তবে ৪/৫ জনের গ্রপ মিলে গেলে ৪/৫ দিনের জন্য জনপ্রতি খরচ ১৭-১৯ হাজারের মধ্যে হয়ে যাবে।

খাওয়া দাওয়া

থিম্পু থেকে পুনাখা যাওয়ার পথে দোচুলা রিসোর্ট চোখে পড়বে। এখানকার খাবার বেশ মজার। এখানে স্থানীয় খাবারের সাথে সাথে নানা ধরনের পানীয়ও পাওয়া যাবে। এছাড়াও খেমা ডাটসি, এগা ডাটসি এই ধরনের ভিন্ন খাবার গুলোও খেতে পারেন।

কেনাকাটা

স্থানীয় লোকজন ভেড়ার উল থেকে নানা ধরনের পশমি জিনিস বানায়। এই জিনিসগুলো সাধারনত পুনাখা শহরের ছোট ছোট দোকান গুলোতেই বেশী পাওয়া যায়। আবার, শহরের কেন্দ্র স্থলেও কেনাকাটা করার মতো নানা ধরনের জিনিস পাওয়া যায়। খাবারের মধ্যে নানা ধরনের শুকনো ফল পাবেন। এছাড়াও বৌদ্ধ মূর্তি, মেয়েদের নানা ধরনের জুয়েলারি এবং ঘর সাজানোর  শো-পিসসহ নানা ধরনের জিনিস পাবেন পুনাখার স্থানীয় দোকান গুলোতে।

পড়ুন : থিম্পু ভ্রমণ গাইড

ভ্রমণ টিপস

  • ভ্রমণের পূর্বেই অনুমোদিত ব্যাংকে ৫০০ টাকা ট্রাভেল ট্যাক্স জমা দিতে হবে
  • ঝামেলা এড়াতে ভারতের ট্রানজিট ভিসাসহ পাসপোর্টের কয়েকটি ফটোকপি, ন্যাশনাল আইডি কার্ডের ২-৩টি ফটোকপি এবং পাসপোর্ট সাইজের ছবি সাথে রাখুন।
  • চাকরিজীবী হলে NOC (No Objection Certificate) ও স্টুডেন্ট হলে আইডি কার্ডের ২-৩ টি ফটোকপি করে ভ্রমণের সাথে রাখুন।
  • ভারত ইমিগ্রেশনের কাছে টাকা বা ডলার রুপিতে কনভার্ট করা ভালো, কারন এখানে সবচেয়ে ভালো রেট পাওয়া যায়।
  • ভুটানের পুনাখা শহরের ভিতরের জায়গাগুলো ট্যাক্সি ভাড়া করে দেখলে ভালো তবে সেই ক্ষেত্রে আগে থেকেই দামাদামি করে নিতে হবে। আর চেষ্টা করবেন ভুটানি ড্রাইভারদের গাড়ি ভাড়া নিতে। এতে খরচ কম হবে আর মিশুক ও ভালো ড্রাইভার পাওয়া যাবে।
  • মোবাইল সিমে ইন্টারন্যাশনাল রোমিং এক্টিভেট না থাকলে ফুন্টশোলিং থেকে নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে না। তাই আলাদা করে ভুটানের টুরিস্ট সিম কিনে নিতে হবে।
  • পাহাড় বেয়ে উঠার জন্য ও ট্রেকিং করার জন্য ভালো গ্রিপ আছে এমন ট্র্যাভেলিং বা ট্র্যাকিং সু, কেডস এবং কড়া রোদ থেকে নিজেকে নিরাপদে রাখতে সানগ্লাস ওসানক্যাপ সাথে নিবেন।
  • যেকোনো জিনিস কেনার সময় দামাদামি করে কিনবেন।
  • ভুটানিদের স্থানীয়দের যেকোনো একটি উৎসবে অংশগ্রহণ করলে ভ্রমণে নতুন কিছু অভিজ্ঞতা পাবার সাথে সাথে আরও বেশী উপভোগ করতে পারবেন।
  • ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ঔষধ ও ফাস্ট এইড বক্স সাথে রাখুন।

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।