প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর মালদ্বীপ (Maldives) হল অসংখ্য দ্বীপের দেশ। ছোট ছোট প্রায় ১২০০ দ্বীপের মধ্যে একটি হল মালদ্বীপের রাজধানী মালে আইল্যান্ড (Male Island)। প্রায় ১.৫ কিলো লম্বা ও ১ কিলো চওড়া এই দ্বীপ বিশ্বের জনবহুল শহরের মধ্যে একটি। আর পর্যটকদের বিশেষ আকর্ষণ এই দ্বীপের প্রতি। আবার হানিমুন কাপলদের জন্য একটি উপযুক্ত জায়গা হল এই মালে আইল্যান্ড।

কিভাবে যাবেন মালদ্বীপের মালে দ্বীপে

মালদ্বীপে যাওয়ার জন্য ঢাকা থেকে মালদ্বীপের সরাসরি ২-৩ টি ফ্লাইট  আছে। তবে বাংলাদেশিরা মালদ্বীপিয়ান এয়ার ও শ্রীলঙ্কান এয়ার লাইনস এ বেশী যাতায়াত করে । ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে সরাসরি মালদ্বীপের মালে ইন্টারন্যাশনাল বিমান বন্দরে (Velana International Airport) যাওয়া যায়। তারপর ইমিগ্রেশন শেষ করে এয়ারপোর্ট থেকে ৪ কিলো দূরত্বে মালেতে ট্যাক্সি করে যেতে পারবেন। অথবা চাইলে এয়ারপোর্টের সামনে থেকে ফেরী বা স্পিডবোটে করে যেতে পারবেন মালে আইল্যান্ডে। আবার চাইলে, বাংলাদেশ থেকে প্রথমে শ্রীলঙ্কার বান্দারনায়াকে আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট (Bandaranayake International Airport) থেকে ট্রানজিট সেশন শেষ করে অন্য ফ্লাইটে মালদ্বীপের মালে ইন্টারন্যাশনাল বিমান বন্দরে যাওয়া যায়। শ্রীলঙ্কা থেকে বিমানে মালদ্বীপ যেতে ১ ঘণ্টা সময় লাগে। এই ক্ষেত্রে খরচ কম হয় আর এক সাথে দুই দেশ ঘুরা হয়।

কোথায় থাকবেন

মালে শহরে থাকার জন্য বেশ কিছু রিসোর্ট আছে। যেমন- সামারসেট ইন, দা মেলরসে , হোটেল জেন মালে, হোটেল ওক্টেভে কমের মধ্যে ভালো সার্ভিস পাওয়া যাবে। এই হোটেল গুলোতে ওয়াইফাই ও এসি সহ ভালো রুম পাবেন। আর রিসোর্টের মধ্যে কুরুম্বা মালদিপ, হলিডে আইল্যান্ড রিসোর্ট, প্যারাডাইস আইল্যান্ড রিসোর্ট, সান আইল্যান্ড এন্ড স্পা, বান্দোস আইল্যান্ডে থাকতে পারেন। 

খরচ

মালদ্বীপে থাকা খাওয়ার খরচ একটু বেশী। বিমানে ঢাকা থেকে মালদ্বীপে যাওয়া ও আসা ৪৩,০০০-৬০,০০০ টাকা খরচ হবে। কত আগে টিকেট কাটবেন তার উপর বিমান ভাড়া নির্ভর করবে। আর শহরের মধ্যে থাকলে এক রাতে ৩,০০০-৭,০০০ টাকায় দুইজন থাকা যাবে আবার আইল্যান্ডের কাছাকাছি রিসোর্টে রাতে থাকতে হলে জন প্রতি ১৬,০০০-২৮,০০০ টাকা খরচ হবে। আর যদি সাধারন মানের খাবার খেয়ে থাকেন তবে প্রতিবেলা ৪০০-৫০০ টাকার মধ্যে হয়ে যাবে। আর প্যাকেজের মাধ্যমে স্পীড বোট ভাড়া করে ঘুরতে চাইলে ১৫,০০০-১৭,০০০ টাকা খরচ হবে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিমানে যাতায়াত সহ ৩ রাত ২ দিন মালে থাকলে ৯০,০০০-১,০০,০০০ টাকা খরচ হবে। কম খরচে বেড়াতে চাইলে যত আগে সম্ভব বিমান টিকেট করে নিবেন। থাকার জন্যে লোকাল রিসোর্টে বা গেস্ট হাউজে থাকার চেষ্টা করবেন। এবং যাতায়াতের জন্যে সরকারী ফেরী ব্যবহার করবেন।

কিভাবে ঘুরবেন মালে আইল্যান্ড

চারদিকে নারিকেল, সুপারি গাছসহ সহ অন্যান্য নানা গাছ গাছালি তে পরিপূর্ণ ছোট্ট একটি দ্বীপ মালে। আর পর্যটকদের পছন্দের এই মালে আইল্যান্ড সবসময়ই লোকারণ্য থাকে। এই আইল্যান্ডে পাবেন সাগরের মাঝে নগরায়নের ছোঁয়া। নীল সাগর থেকে আসা মিষ্টি হাওয়া শরীর মনকে করে তুলে প্রানবন্ত, এখানে আসলে ভ্রমণের সকল ক্লান্তি যেন নিমিশেই চলে যায়। এখানকার প্রায় সব রিসোর্টগুলোর ইনফিনিটি পুল থেকে মালদ্বীপের আসল সৌন্দর্য দেখা যায়আর সহজেই নানা ধরনের জল খেলায় মেতে উঠতে পারবেন। আর সাঁতার জানা থাকলে বীচে সাঁতার কাটার মজা নিতে ভুলবেন না। মালে আইল্যান্ডের পূর্ব দিকে ভারুনুলা রালহুগান্ধু ( Varunulaa Raalhugandu) তে ফেরি তে গিয়ে অদ্ভুত সুন্দর সূর্যাস্ত দেখতে পারবেন। সার্ফিং ও স্নোকেলিং করার জন্য একটা উপযুক্ত জায়গা এই মালে আইল্যান্ড, তাই এখানে সার্ফিং করার ও মজা পাবেন।

এখানকার মাস হুনি (টুনা মাছ, নারিকেল, পিয়াজ ও লেবু দিয়ে তৈরি এক ধরনের খাবার যা রোশি দিয়ে খেতে হয়) ও নানা ধরনের ঠাণ্ডা পানীয় না খেয়ে আসবেন না, আবার যদি বাঙ্গালি খাবার খেতে চান তাহলে মালে শহরের “ঢাকা ফুড” নামের বাঙ্গালি রেস্টুরেন্টে যেতে পারেন কম খরচে বাঙ্গালি খাবার পেয়ে যাবেন এখানে। তবে আন্ডার ওয়াটার রেস্টুরেন্টে খেতে অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা হবে। মালে আইল্যান্ডের পাশাপাশি মালে শহরের মধ্যে আরও কিছু দর্শনীয় স্থানে যেতে পারেন । যেমন-আর্টিফিশিয়াল বীচ( Artificial Beach), ওল্ড ফ্রাইডে মস্কো ( Old Friday Mosque), ন্যাশনাল মিউজিয়াম (National Museum), সুলতানস পার্ক, ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারি, চীনা মালদ্বীপ ফ্রেন্ডশীপ ব্রিজ, ফিশ মার্কেট ও গ্রান্ড ফ্রাইডে মস্কো।

এছাড়া মালে থেকে কাছাকাছি অবস্থিত বিভিন্ন রিসোর্ট আইল্যান্ড থেকে ঘুরে আসতে পারেন। সেখানে গিয়ে থাকতে চাইলেও থাকতে পারবেন। তবে রিসোর্ট আইল্যান্ড গুলোতে খরচ অনেক বেশি। ডে ট্রিপের অপশন থাকলে প্যাকেজ আকারে ঘুরে আসতে পারেন। কম খরচে রিসোর্ট আইল্যান্ড ঘুরতে চাইলে লোকাল রিসোর্ট আইল্যান্ড গুলোতে ঘুরতে পারেন।

মালে ভ্রমণ টিপস

  • মালদ্বীপে যেতে হলে আগে থেকে ভিসা নেওয়ার দরকার হয় না, এখানে ৩০ দিন মেয়াদের অন এ্যারাইভাল ভিসা নিতে হয়।
  • জব করলে NOC, বিজনেস করলে ট্রেড লাইসেন্স ও স্টুডেন্ট হলে আইডি কার্ড ও দরকারি কাগজের ফটোকপি সাথে রাখবেন।  
  • জানুয়ারী থেকে মার্চ এই তিন মাস মালদ্বীপ যাওয়ার জন্য উপযুক্ত সময়। তবে অফ সিজনে গেলে খরচ কম হবে।
  • বিমানের টিকিটের ক্ষেত্রে ১-২মাস আগে বুকিং দেওয়ার চেষ্টা করুন তাতে বিমানের টিকেট কমে পাওয়া যাবে।
  • মালদ্বীপ যেতে হলে শ্রীলঙ্কা হয়ে যেতে হয়। তাই সময় থাকলে শ্রীলঙ্কা ঘুরে তারপর মালদ্বীপ গেলে দুটো দেশই ঘোরা হয়ে যাবে। 
  • টুরিস্ট সিজনে মালে আইল্যান্ডে ঘুরতে হলে আগে থেকেই হোটেল বুকিং দেওয়া ভালো, তাতে খরচ কম হবার সাথে সাথে শেষ সময়ের বাড়তি ঝামেলাও এড়ানো যায়।
  • মালদ্বীপের  ট্র্যাভেল এজেন্সির মাধ্যমে বিভিন্ন হোটেল বা রিসোর্ট বুকিং দিলে কিছু স্পেশাল অফার পাওয়া যায়।
  • মালে আইল্যান্ডহেঁটে দেখার জন্য কম হিলের হাটার মতো স্যান্ডেল বা জুতা সাথে নিবেন।
  • ঢাকা থেকে পৌঁছাতে রাত হয়ে যাবার কারনে রাতে মালে থাকার জন্য যেকোনো কম খরচের হোটেলে থাকার চেষ্টা করুন যদি পরেরদিন অন্য কোন আইল্যান্ডে যেতে চান।
  • বিলাসবহুল দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও একটু বুদ্ধি করে যাতায়াত সহ শপিং খরচ কম করলে টাকা সাশ্রয় হবার সাথে সাথে ভালো ভাবে ঘোরা যাবে।
  • মালদ্বীপের মালের কিছু রিসোর্টে  ডে ট্রিপেরও ব্যবস্থা করে থাকে তাই রিসোর্ট ভাড়ার সাথে ট্রিপের প্যাকেজ নিলে খরচ কমের মধ্যে হয়ে যাবে।
  • এখানে স্কুবা ডাইভিং না জানলে তার কোর্স করার ব্যবস্থা আছে।
  • রিসোর্টে থাকলে খাবার খরচ প্যাকেজের মধ্যে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। আর বাইরে খেলে মেন্যু বার থেকে লোকাল খাবারবেছে খাবেন, এখানে লোকাল খাবারের দাম কম।
  • এখানকার অধিকাংশ ক্যাফে এলকোহল মুক্ত।

Feature Image : Nattu

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।