সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যময় দেশ ভিয়েতনাম (Vietnam)। আর ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় হল নানা রকম ঐতিহ্যে সমৃদ্ধশালী একটি শহর। ভিয়েতনামিজরা ইতিহাস ও সংস্কৃতি আগলে রাখতে ভালোবাসে। তা বুঝা যায় হ্যানয় (Hanoi) শহর জুড়ে ঐতিহ্যের ছাপ, জাদুঘর ও টেম্পল দেখে। পর্যটকদের ঘুরে বেড়ানোর জন্য বেশ পছন্দের একটি জায়গা যেখানে দেখার অনেক কিছুই রয়েছে।

হ্যানয়ের দর্শনীয় স্থান

হোয়া লো প্রিজন মিউজিয়াম (Hoa Lo Prism Museum): ২০ শতকের দিকে ফরাসি সরকারের অধীনে থাকা  ভিয়েতনামের বিপ্লবীদের কষ্ট ও দুঃখ-দুর্দশার বিভিন্ন দিক ও মুক্তির জন্য তাদের আকুল আবেদনের নানা বিষয় এখানে প্রতীকীর মাধ্যমে প্রদর্শিত হয়েছে। জেলখানার ভিতরে ভিয়েতনামের বিপ্লবীদের কিভাবে কতটা কষ্ট দেওয়া হয়েছে পর্যটকদের শুধুমাত্র তার একটু আভাস দেওয়া হয়েছে।

ভিয়েতনাম ওয়েমেন্স মিউজিয়াম (Women’s Museum): এই চমৎকার আধুনিক জাদুঘরে ভিয়েতনামের সমাজে নারীদের ভূমিকা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। যুদ্ধের সময় নারীদের বীরত্বপূর্ণ গৌরবের স্মৃতিগুলো এখানে বিশেষ ভাবে গুরত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে কিছু বিশেষ অদ্ভুত সুন্দর পোস্টার আছে যা নিঃসন্দেহে পর্যটকদের নজর কাড়বে। এছাড়াও কারো যদি তথ্যগত প্রদর্শনী গুলো দেখতে একঘেয়েমি লাগে তাহলে এখানে প্রদর্শিত ভিয়েতনামের ক্ষুদ্রগোষ্ঠিদের পোশাক, উপজাতীয় ঝুড়ি, ফেব্রিক মোটিফ দেখলে অবশ্যই ভালো লাগবে। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই মিউজিয়াম, টিকেট ৩০ ভিয়েতনামিজ ডং।

ভিয়েতনাম মিউজিয়াম অফ এথনোলোজি (Vietnam Museum of Ethnology): ভিয়েতনামের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গুষ্টিদের উপজাতীয় শিল্প, শিল্পকর্ম ওতাদের গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্যবাহী নিত্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস সংগ্রহ করে এখানে প্রদর্শন করা হয়েছে। বিভিন্ন জাতির বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের সংরক্ষকবলা যায় এই জাদুঘরকে। কেউ যদি নৃ-তাত্ত্বিক বিষয়ে আগ্রহী হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই এই মিউজিয়ামে একবার হলেও ঘুরে আসবে। শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৭ কিলো দূরে অবস্থিত এই জাদুঘর ঘুরে আসতে ২০০,০০০০ ডং ( বাংলাদেশী ৭২৯.৪৪ টাকা) খরচ হবে। খোলা থাকে মঙ্গলবার থেকে রবিবার সকাল ৮.৩০ থেকে ৫.৩০ পর্যন্ত।

টেম্পল অফ লিটারেচার (Temple of Literature): ১০৭০ সালে নির্মিত এই টেম্পল ভিয়েতনামের সেরা পণ্ডিতদের স্থান হিসেবে গণ্য করা হতো। এখানের প্যাগোডা ও বেদিগুলোর স্থাপত্য বিশেষভাবে নজরে পড়ে। একসময় শুধু রয়্যাল পরিবারের সদস্যরাই এখানে ভর্তি হবার সুযোগ পেতো। বর্তমানে প্রাচীন স্থাপত্যের এক নিদর্শন মাত্র এই বিশ্ববিদ্যালয়। পুরো ভবনের স্থাপত্যের সাথে সাথে সুন্দর পরিবেশের জন্যই মূলত এখানে বাইরের অনেক পর্যটক একটু ঘুরে যেতে পছন্দ করে।   

ওয়েস্ট লেক (West Lake): শহরের সবচেয়ে বড় লেক, জা হো তেয় (Ho Tay) হিসেবেও পরিচিত। এই লেক টায় হো (tai ho) শহর কে ঘিরে রেখেছে। এখানের দক্ষিন দিকে খাবারের বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট আছে আর পূর্ব দিকে রাস্তার ধারে রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে, কাপরের দোকান ও বেশ কিছু বিলাসবহুল হোটেল আছে। লেকের পাশে এখানের রেস্টুরেন্টগুলোতে খেতে সবাই বেশ পছন্দ করে আর লেকের মনোরম পরিবেশ ও ভালো লাগার মতো। শহরের শোরগোল থেকে একটু দূরে এসে সময় কাটাতে অনেকেই চলে আসে এখানে। আবার লেকের পাশের রাস্তা দিয়ে অনেকে বাইসাইকেল চালাতেও পছন্দ করে।

হোয়ান কিএম লেক (Hoan Kiem Lake): কথিত আছে, ১৫শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সম্রাট লি থাইকে স্বর্গ থেকে পাঠানো এক জাদুকরী তলোয়ার যুদ্ধের পর এক বিশাল আকৃতির কচ্ছপ ছিনিয়ে নেয় তারপর আবার স্বর্গে এই তলোয়ারের প্রকৃত মালিকের কাছে পাঠানোর জন্য তলোয়ার সহ কচ্ছপটা লেকের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়। সেই কারনে এই লেকের নামকরন করা হয় হো হোয়ান কিএম যার অর্থ হল পুনরুদ্ধারকৃত তলোয়ারের লেক। মিথ হোক বা সত্য, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য পর্যটক এই লেক দেখতে এখানে আসে।

লটে অবজারভেশন ডেক (Lotte Observation Deck): হ্যানয় শহরের পশ্চিমে অবস্থিত এই ভবনের ৬৫ তালা থেকে হেনয় শহরের সৌন্দর্য সবচেয়ে সুন্দর ভাবে দেখা যায়। এই সুউচ্চ টাওয়ারে হোটেল, খাবার রেস্টুরেন্ট, রুফটপ বারের সাথে সাথে নিচের তালায় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও আছে। সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত যেকোনো সময়ে যেতে পারবেন এই টাওয়ারে।

লং বিএন ব্রিজ (Long Bien Bridge): আমেরিকার যুদ্ধের স্মৃতিবিজারিত এই ব্রিজ অসংখ্যবার বোমা হামলার কবলে পড়েছে তবে প্রতিবার দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। বিখ্যাত আর্কিটেক্ট গাস্টভ আইফেল এই ব্রিজের ডিজাইনার। রাতের বেলায় এই ব্রিজের সৌন্দর্য মুগ্ধ করার মতো।

ওয়ান পিলার প্যাগোডা (One Pillar Pagoda): এই প্যাগোডা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য পবিত্রতার প্রতীক। একটা পিলারের উপর নির্মিত এই প্যাগোডা পিছনে লোককাহিনী প্রচলিত আছে। ফরাসীদের ধ্বংসের কারনে বর্তমানে একটি কাঠের প্যাগোডা বানানো হয়েছে আগের জায়গায়। বলা হয়ে থাকে এই প্যাগোডার পিছনের গাছের নিচে বসেই বৌদ্ধদেব ক্ষমতা পেয়েছিল।  

হো চি মিন মোসোলিয়াম (Ho Chi Minh Mausoleum): ভিয়েতনামের বিপ্লবি নেতা হো চি মিনের সমাধি। হো চি মিনের দেহাবশেষ এখানে সংরক্ষিত আছে যা সবসময় সামরিক বাহিনী দিয়ে সুরক্ষিত থাকে। সমাধি ঘিরে বিভিন ধরনের গাছের সমাহার আর সমাধির বাইরের দিক ধূসর গ্রানাইট পাথর দিয়ে তৈরি আর ভিতরে কালো, ধূসর লাল মসৃণ পাথর। বিপ্লবি এই নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে অনেকেই আসে এখানে।   

ফাইন আর্টস মিউজিয়াম (Fine Arts Museum) : এখানে ভিয়েতনামের স্থানীয় শিল্পীদের বিভিন্ন আর্টের প্রদর্শনী করা আছে। এখানে ঘুরে আসলে ভিয়েতনামের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে জানার সুযোগ হবে।

এছাড়াও যেতে পারেন এনগোচ সান প্যাগোডা (Ngoc Son Pagoda), মোজাইক ওয়াল, ট্রানকুওচ প্যাগোডা (Tran Quoc Pagoda), ওল্ডকোয়াটার্স, বাচ মা টেম্পল (Bach Ma Temple), হেরিটেজ হাউজ (Heritage House), ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ভিয়েতনামিজ হিস্ট্রি এর মতো জায়গায়।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সরাসরি হ্যানয় যাবার কোনও প্লেন নেই। ঢাকা থেকে সিংগাপুর বা থাইল্যান্ডের ব্যাংকক বা মালেয়শিয়ার কুয়ালালামপুর হয়ে তারপর যেতে হয় হানয় শহরে। থাই লায়ন এয়ারলাইন্স, থাই এয়ারলাইন্স, মালিন্দো এয়ারলাইন্স, চীনা সাউথার্ন বা মালেয়শিয়ান এয়ারলাইন্স দিয়ে হ্যানয় যেতে হয়। বিভিন্ন এয়ারলাইন্স এ যেতে সময় বিভিন্ন লাগে। তবে ৭ থেকে১০ ঘণ্টায় যাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশী সময় লাগে মালেয়শিয়ান এয়ারলাইন্সে, প্রায় ২৩ ঘণ্টার মতো। 

ভ্রমণ খরচ

ঢাকা থেকে থাই লায়ন বা মালন্দো এয়ারে হ্যানয় যেতে জনপ্রতি ২২,০০০-৩০,০০০ টাকা খরচ হবে। আর যাওয়া আসা এবং থাকা খাওয়া সহ ৭০,০০০-৮০,০০০ টাকার মধ্যে ২ রাত ৩ দিন থাকতে পারবেন। বিমানের টিকেট আগে কেটে রাখলে ভাড়া তুলনামূলক কম হবে।

কোথায় থাকবেন

ওল্ড কোয়ার্টারে থাকার জন্য বেশ কিছু ভালো হোটেল আছে। যেমন- গ্রিন হাউজ, দা হানোয়িন হোটেল, সামারসেট গ্র্যান্ড হানয়, হ্যানয় কাবলিস হোটেল গুলোতে ১৫০০-২৫০০ এর মধ্যে দুইজন থাকার রুম পেয়ে যাবেন। তবে এখানে কম খরচে পর্যটকরা হোস্টেলে থাকতে বেশী পছন্দ করে, যেমন- হানয় ওল্ড কোয়ার্টারর্স বেকপ্যাকার্স হোস্টেল, দা ফাস্ট হোস্টেল, মিউ হস্তেল, হানই ইকো গ্রীন হোস্টেল, ডেইজি হোস্টেল, হানয় কজি হোস্টেল থাকলে ৪০০-৮০০ টাকার মধ্যে এক রুমে দুইজন থাকতে পারবেন।

কি ও কোথায় খাবেন

ওল্ড কোয়ার্টারে খাবারের বেশ কিছু ভালো রেস্টুরেন্ট আছে। এখানে ১০০-১৫০ টাকার মধ্যে বেশ ভালো খাবার পাবেন। খাবারের মধ্যে গই চুয়ান (এক ধরনের স্প্রিং রোল), এগ নগ লাটে, ফ্রাইড বানানা, ক্যারামেল পুডিং এবং ডেজার্ট সুপ খেয়ে দেখতে পারেন। আর পানীয়য়ের জন্য “বিয়া হৈ” বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।

কিছু টিপস

  • হোয়ান কিএম লেকে শুক্রবার থেকে রবিবার যাওয়া সবচেয়ে ভালো কারণ এই দিনগুলোতে সন্ধ্যা ৭টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ট্রাফিক বন্ধ থাকে আর তাই মেলার মতো এক পরিবেশ গড়ে উঠে চারদিকে।
  • ওল্ড কোয়ার্টারে হোটেল ভাড়া নিলে হাঁটা দূরত্বে কাছাকাছি অনেক জায়গায় ঘুরতে পারবেন।
  • সময় থাকলে অপেরা হাউজের কোনও শো দেখলে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা হবে।
  • এখানের ওয়াটার পাপেট শো পর্যটকদের জন্য এক বিশেষ আকর্ষণ।
  • এখানে ডং জুয়ান মার্কেটে কেনাকাটা করতে পারবেন। এখানে কম দামে স্থানীয় জিনিস কিনতে পারবেন।

ফিচার ইমেজ : Worldtravelguide.net

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।