নীল নদের পশ্চিম দিকে অবস্থিত মিশরীয় শহর গিজা (Giza)। এখানে রয়েছে অমীমাংসিত রহস্যে ঘেরা পিরামিড যাকে নিয়ে যুগ যুগ ধরে আলোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণের অন্ত নেই। মধ্য যুগের সপ্তামাশ্চর্য এই পিরামিড দেখতে ও তার নানা রহস্য জানতে দূর দূরান্ত থেকে মিশর (Egypt) এর পিরামিড রাজ্যে পর্যটকরা ভিড় জমায়।

গিজার দর্শনীয় স্থান

২৬ শতাব্দীর দিকে গিজা মালভূমিতে মিশরীয় স্থাপত্য নির্মাণ করা হয়। গিজার নির্জন মরুভূমিতে দেখা মিলবে পিরামিড, মমি ও প্রাচীন সভ্যতার নানা নিদর্শন। পর্যটকদের জন্য এখানের সবচেয়ে বড় পিরামিড কিং খুফুর সমাধি, দা গ্রেট স্ফিনিক্স ও সোলার বোট মিউজিয়াম গিজার বিশেষ আকর্ষণ।

গিজা পিরামিড কম্পাউন্ড (Giza Pyramid Compound) : গিজার পৌর শহরের কিনারে অবস্থিত এই পিরামিডের মালভূমি গিজা শহরের অন্যতম প্রধান টুরিস্ট স্পট। বহু শতাব্দী ধরে পর্যটকদের বিস্ময়ে অভিভূত করে রেখেছে এই পিরামিডের রহস্য। গিজা পিরামিড মূলত খাফরে পিরামিড, মেনকাউরে পিরামিড এবং খুফু পিরামিডের সমন্বয়ে গঠিত। খুফু পিরামিড এখনো প্রাচীন সপ্তমাশ্চর্যের নিদর্শন হিসেবে তার অবস্থান ধরে রেখেছে। এই তিনটি পিরামিডই ৪,৫০০ বছরের পুরনো স্ফিনিক্স দিয়ে ঘেরা।

  • গ্রেট পিরামিড (Great Pyramid) : গ্রেট পিরামিড বা পিরামিড অফ খুফু গিজার পিরামিডের মধ্যে সবচেয়ে বড়। এর পাশেই সোলার বোট মিউজিয়াম আছে। এখানে উঠের পিঠে ঘুরে বেরানোর এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা হবে।
  • পিরামিড ও খাফরে (Piramid of Khafre) : গিজার দ্বিতীয় বৃহত্তম পিরামিড যেখানে ফারাও খাফরে সম্রাটের সমাধি অবস্থিত।
  • পিরামিড অফ মেনকাউরে  (Pyramid of Menkaure) : গিজার সবচেয়ে ছোট পিরামিড যেখানে মিশরিয় ফারাও মেনকাউরের সমাধি রয়েছে।

এই তিনটি পিরামিডের পাশে আরও বেশ কিছু ছোট ছোট পিরামিড আছে যেগুলো মূলত রানী ও অন্যান্য বড় রাজ সভাসদ বর্গের। এখানে ঢুকতে জনপ্রতি ১৬০ পাউন্ডের টিকিট কাটতে হয় যা দিয়ে সবচেয়ে বড় পিরামিডের প্রায় ৫০ ফুট উপরে উঠা যায় আর ভিতরে ঢোকার জন্য আলাদা টিকেট কাটতে হয়। তবে বিকাল ৫ টার পর আর এখানে থাকা যায় না।

সাক্কারা (Saqqara) : গিজা পিরামিড ছাড়াও আরেকটি পিরামিড আছে যা রাজধানী শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। সাক্কারার বিশাল এলাকা জুড়ে প্রাচীন সমাধি। এখানের কাছেই অবস্থিত দাশুর ও আবু সারেতে প্রথম পিরামিডের কাজ শুরু করা হয়। এখানের দা স্টেপ পিরামিড যা মূলত দেখতে অনেকটা বাঁকানো ও রেড পিরামিড যেখানে ফারাওদের চমৎকার স্থাপত্যের নিদর্শন পাওয়া যাবে, পর্যটকদের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানে একদিনের সময় নিয়ে ঘুরে আসলে ভালো।

এখানে আরও দেখতে পারবেন গিজা মরভূমিতে আবুসির সময়ে নির্মিত প্রথম পিরামিড “পিরামিড অফ সাহুরে (Pyramid Of Sabhure)”। মিশরের সবচেয়ে উত্তরের পিরামিড “পিরামিড অফ ডিজেদেফ্রে (Pyramid Of Djedefre)”, ধারনা করা হয় খুফুর উত্তরসূরি ও তার ছেলে ডিজেদেফ্রে এই পিরামিড নির্মাণ করেন)

গ্র্যান্ড ইজিপ্সিয়ান মিউজিয়াম (Grand Egyptian Museum) : নতুন হওয়া এই জাদুঘর পর্যটকদের জন্য এক বিশেষ আকর্ষণ। ৪,৮০,০০০ স্কয়ার মিটার জায়গা জুড়ে গড়ে উঠা এই জাদুঘর বিশ্বের সবচেয়ে বড় নৃ-তাত্ত্বিক জাদুঘর। এখানে মূলত কিং তুতানখামেনের সমাধি থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন শিল্প সংরক্ষিত আছে। আর এই জাদুঘরের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম কিং তুতানখামেনের পুরো সংগ্রহ পর্যটকদের দেখার সুযোগ হবে।

ফারাওনিক ভিলেজ (Pharaonic Villege) : মিশরের প্রাচীন গ্রামের রেপ্লিকা ও তুতানখামেনের সমাধি নিয়ে গড়ে উঠা একটি জীবন্ত জাদুঘর। প্রতিদিনসকাল ৯ টা থেকে সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই জাদুঘর। এখানে নৌকা ভ্রমণের সুযোগ আছে। গাইডের মাধ্যমে এই প্রাচীন গ্রামীণ আবহে গড়ে তোলা জাদুঘর ঘুরে দেখলে অনেক ইতিহাস জানা যাবে ভালো ভাবে।

সোলার বোট মিউজিয়াম (Solar Boat Museum): ১৯৮৫ সালে নির্মিত এই জাদুঘরে পুনর্নির্মাণ করে খাফু সোলার (গ্রেট পিরামিডের কাছ থেকে পুনরুদ্ধারকৃত বার্জ নৌকা) প্রদর্শনী করে রাখা হয়েছে।

গ্রেট স্ফিনিক্স অফ গিজা (Great Sphinx Of Giza) : নীল নদীর তীরে অবস্থিত গিজা মালভূমির পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে মুখ করে দাড়িয়ে আছে এই চুনা পাথরের মূর্তি যার দেহ সিংহের কিন্তু মাথা মানুষের। দেখতে দানবের মতো মনে হলেও মিশরীয়রা এই মূর্তিকে ফারাউনের শক্তি হিসেবে মনে করতো।

গিজা চিড়িয়াখানা (Giza Zoo) : গিজা শহরের এই চিড়িয়াখানায় গিজার সবচেয়ে বড় পার্ক অবস্থিত যার চারপাশে সবুজের সমাহার। প্রায় ৮০ একর জায়গা নিয়ে গড়ে উঠা এই চিড়িয়াখানায় অনেক বিপন্ন প্রায় প্রাণী রয়েছে। এছাড়াও এখানে বেশ কিছু অদ্ভুত ও বিরল প্রজাতির গাছের দেখা মিলবে।

অরমান গার্ডেন (Orman Garden) : মিশরের মধ্যে অন্যতম একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন। এই বাগান ১৮৭৫ সালে খিদিভ ইসমাইল পাশার রাজত্বে খিদিভের প্রাসাদের অংশ ছিল। এখানে অনেক প্রজাতির ফুলের গাছ চোখে পড়বে। বসন্তের সময় যখন প্রায় সব গাছে ফুল ফুটে তখন চারপাশটা রঙ্গিন হয়ে উঠে আরখুব সুন্দর লাগে দেখতে। এখান থেকে ইচ্ছে হলে ফুল ও কিনতে পারবেন। ছুটির দিনে অনেকেই এখানে পরিবার নিয়ে পিকনিক করতে আসে।

একুরিয়াম গ্রট্টো গার্ডেন (Aquarium Grotto Garden) : এখানে একসময় অনেক মাছ ছিল তবে বর্তমানে কিছু ছোট ছোট মাছের একুরিয়াম আছে। এখানের চারপাশের পরিবেশ বেশ সুন্দর, বিকালে অনেকেই এখানে হাঁটতে আসে। তবে বাচ্চাদের জন্য খেলার আলাদা একটা স্পেস আছে তাই বাচ্চাদের নিয়ে ঘোরার জন্য ভালো একটি জায়গা। এখানে বেশ কিছু ক্যাফে আছে।

এছাড়াও যেতে পারেন উম কিলথুম মিউজিয়াম (Umm Kulthum Museum), সাফারি পার্ক, ডেজার্ট ইজিপ্ট সাফারি (Desert Egypt Safari) এর মতো জায়গায়।

পড়ুন : মিশরের দর্শনীয় স্থান

কিভাবে যাবেন গিজা

মিশরের কায়রো (Cairo) থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের রাস্তা পার হলেই যাওয়া যায় গিজা শহরে। যেতে পারবেন মেট্রো ট্রেন, গাড়ি বা বাসে। মেট্রো ট্রেনের ক্ষেত্রে কায়রো শহরের মেট্রো লাইন ২ থেকে এল গিজা স্টেশনে চলে যেতে পারবেন। এখান থেকে গিজা পিরামিড মাত্র ৪ কিলো দূরে।

ট্যাক্সি বা গাড়িতে যাওয়ার ক্ষেত্রে, কায়রো শহরের মেইন রোড থেকে হাত নাড়লেই যেকোনো ট্যাক্সি পেয়ে যাবেন গিজা তে যাওয়ার জন্য। আবার আগে থেকেই কোনও গাড়ি বা ট্যাক্সি বুকিং দিয়ে রাখতে পারেন হোটেল থেকে পিক আপ করার জন্য। সময় লাগবে ৩০-৪০ মিনিট। তবে রাস্তায় জ্যাম বেশী থাকলে ৬০-৯০ মিনিট ও লাগতে পারে।

আর সবচেয়ে সস্তায় যাওয়ার উপায় হল বাসে যাওয়া। বাসে যাওয়ার ক্ষেত্রে কায়রো শহরের ডাউন টাউন থেকে ৩৫৫ ও ৩৫৭ নাম্বার বাসে গিজা পিরামিডে যাওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন

এখানে থাকার খরচ অনেক বেশী। তবে অফ সিজনে গেলে খরচ একটু কম পড়বে। হোটেল গুলোর মধ্যে- মণ্ডি পিরামিড ভিউ, পিরামিড ইন মোটেল, থমাস, ফারাউন পিরামিড ভিউ ইন, হ্যাপি ডেইজ পিরামিড ইন, রয়্যাল পিরামিড হোটেল, পিরামিড ফ্যামিলি ইন, গিজা পিরামিড ইন, ড্রিম পিরামিড ইন, পিরামিড প্লাজা হোটেল, প্যারোনোমা পিরামিড ইন, গ্রেট ভিউ গেস্ট হাউজ এর মতো হোটেল ও গেস্ট হাউজ গুলোতে  ৮,০০০-১৮,০০০ টাকার মধ্যে দুই জনের থাকার রুম পেয়ে যাবেন। অনলাইন বুকিং সাইট গুলো থেকে বুকিং দিতে পারবেন।

গিজা ভ্রমণ খরচ

কায়রো থেকে গিজা পিরামিডে যাওয়ার ভাড়া ৩০-৪০ পাউন্ড ( বাংলাদেশী থাকায় ১৫৩-২০৩ টাকা)। আর গিজা পিরামিডের ইতিহাস জানার জন্য স্ফিনিক্স অফ গিজার সামনে সাউন্ড এন্ড লাইট শো নামে একটি শো হয় যার খরচ ২৫০ পাউন্ড (বাংলাদেশী টাকায় ১৩০০ টাকা) আর উঠের পিঠে ঘুরে পুরো গিজা মালভূমি ঘুরতে খরচ হবে ৩৫০-৪০০ পাউন্ড (বাংলাদেশী টাকায় ১৮০০-২০০০)। তবে অনেকে গাইড নিয়ে ঘুরে ঘুরে পিরামিড দেখতে পছন্দ করে তাতে খরচ বেশ কম হবে। আবার মিউজিয়ামে ঘুরতে গেলে খরচ হবে  ১৫০-২০০ পাউন্ড ( বাংলাদেশী টাকায় ৭৬৪ থেকে ১০১৯ টাকা)। সব মিলিয়ে এখানে খাওয়া ঘোরা ও বাংলাদেশ থেকে বিমানে যাতায়াত সহ গিজাতে ৩ দিন ২ রাত থাকতে ২,০০,০০-২,৫০,০০০ টাকা খরচ হবে।

কোথায় খাবেন

গিজা পিরামিডের কাছে বেশ কিছু ভালো রেস্টুরেন্ট আছে। যেমন- আন্দ্রেয়া মারিওউতেয়া (Andrea Mariouteya), ফেলফেলা (Felfela), আলফ্রেডো রেস্টুরেন্ট, পিরামিডস রেস্তুরেন্ট, সান জে রেস্টুরেন্ট এন্ড লজ এর মতো রেস্টুরেন্টের খাবার বেশ ভালো। আর গিজা পিরামিডের ভিতরে স্ফিনিক্সের পাশে একটি বুফে রেস্টুরেন্ট আছে। ওখানে দাম বেশী হলেও খাবারের মান ভালো। 

আরও পড়ুন : কায়রো ভ্রমণ গাইড

গিজা ভ্রমণ টিপস

  • এখানে পানির দাম সবচেয়ে বেশী তাই সবসময় সাথে পানির বোতল রাখার চেষ্টা করবেন।
  • এখানে পাউন্ডের চেয়ে ডলার ভাঙ্গানো সহজ আর ডলারের রেট প্রায় সবখানে একই।
  • পিরামিডের মালভূমি দেখতে গেলে উঠের পিঠে উঠেও হাফ ডের একটা ট্রিপ নিয়ে নিতে পারেন। এতে কম সময়ে অনেক গুলো পিরামিড দেখতে পারবেন।
  • এখানে পিরামিড বললে অনেকেই চিনতে পারে না সেই ক্ষেত্রে আরবি অক্ষর “হারাম” বা তিনকোনা কিছু ইশারা দিয়ে বুঝাতে হবে।
  • মরুভূমির কড়া রোদ থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য অবশ্যই সাথে সান ব্লক ক্রিম, হ্যাট ও ছাতা সাথে রাখবেন।
  • গিজা পিরামিডের ভিতরে ওয়ান ওয়ে রাস্তার বেশ কিছু দুর্গম জায়গা আছে সেখানে না যাওয়াই ভালো।
  • প্যানরোমা গিজা থেকে প্রথম তিনটি পিরামিডের চমৎকার ভিউ দেখা যায়।
  • ট্যাক্সি না নিয়ে কম খরচের মধ্যে উবার নিয়ে সরাসরি গিজার মরুভূমিতে যেতে পারবেন।
  • এখানে ট্যাক্সির প্রকারভেদ আছে, সাদা ট্যাক্সিতে মিটার ও এসি থাকে আর ভাড়া একটু কম, তাই সবসময় সাদা ট্যাক্সিতে উঠার চেষ্টা করবেন।
  • পিরামিড ভালো ভাবে দেখতে চাইলে কায়রো শহরের চেয়ে রাতে থাকার জন্য গিজাভালো হবে।
  • পিরামিডের বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার কথা বলে পর্যটকদের কাছ থেকে কৌশলে গাইডরা টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, তাই জেনে বুঝে শুনে টাকা খরচ করবেন।

ফিচার ইমেজ : Internet

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।