পর্যটকদের কাছে ইউরোপের সবচেয়ে জনপ্রিয় শহর ফ্রান্স এর রাজধানী প্যারিস (Paris)। আর প্যারিসের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রাচীন নিদর্শনের নাম আইফেল টাওয়ার (Eiffel Tower)। ১৮৮৯ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের “সপ্তম অ্যারোঁদিসেমেন্ট” এর অন্তর্গত চ্যাম্প ডি মার্শ-এ মেলার উদ্দেশ্যে এই টাওয়ারটি নির্মাণ করা হয়। প্রচলিত আছে, টাওয়ারটির নির্মাণ কাজে ১৮,০৩৮টি পৃথক ধাতব খন্ডকে একসাথে সংযুক্ত করতে সর্বমোট ২ কোটি ৫০ লক্ষ নাট ব্যবহৃত করা হয়েছিল। আর এই কাজে নিয়োগ প্রাপ্ত ৩০০ জন কর্মীর দক্ষ হাতের নিপুন ছোঁয়া এখনও উপলব্ধি করা যায়।

সম্পূর্ণ আইফেল টাওয়ারটি নির্মাণ করতে সময় লেগেছিলো মোট ২ বছর ২ মাস ৫ দিন। পরবর্তীতে কয়েকবার এই টাওয়ারটি আংশিক পরিবর্তন করা হয়েছে। টাওয়ারটির প্রকৃত রূপ ধরে রাখতে প্রতি ৭ বছর পর পর টাওয়ারটিকে একবার করে রং করা হয়। সম্পূর্ণ টাওয়ারটিকে একবার রং করতে ৬০ টন রঙের প্রয়োজন হয়। মূল আইফেল টাওয়ারটির উচ্চতা ৩০০ মিটার। আর উপরের এন্টেনাসহ আইফেল টাওয়ারটির উচ্চতা ৩২৪ মিটার বা ১০৬৩ ফুট। সুউচ্চ এই টাওয়ারটিকে এক সময় বিশ্বের সর্বোচ্চ কাঠামো হিসাবে গণ্য করা হত। ১৯৩০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে ক্রাইসলার ভবনের নির্মাণের পর আইফেল টাওয়ার পৃথিবীর সর্বোচ্চ পরিকাঠামোর মর্যাদা হারায়।

প্রকৃত আইফেল টাওয়ারের ওজন ১০,১০০ টন। তবে এই স্থাপনাটি তৈরীতে ব্যবহৃত ধাতব কাঠামোগুলোর মোট ওজন ৭,৩০০ টন। আলোক সজ্জার জন্য টাওয়ারটিতে স্থাপন করা হয়েছে ৩৩৬ টি প্রজেক্টর ও ২০,০০০ বাতি। রাতের বেলা আইফেল টাওয়ারটির ছবি ধারণ করা ফ্রান্সের আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ বে-আইনি। তাই সেখানে ঘুরতে গেলে এই বিষয়ে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করুন। তিনটি স্তরে বিভক্ত টাওয়ারটিতে সর্বমোট ১৬৬৫ টি সিঁড়ির ধাপ রয়েছে। পাশাপাশি আছে এলিভেটরের ব্যবস্থা। টাওয়ারের চূড়া থেকে এক নজরে প্যারিস শহর দেখার অনুভূতি সারাজীবন মনে রাখার মত। প্যারিসের কথা যখনই মনে পড়বে তখনি যেন চোখের সামনে ভেসে উঠবে প্যারিসের যুগান্তকারী অনুপম সেই মুহূর্ত। 

আইফেল টাওয়ার ফ্রান্স
রাতের আইফেল টাওয়ার

আইফেল টাওয়ারটির আরেক নাম ট্যুর আইফেল। ফ্রান্সের মানুষের কাছে এই টাওয়ারটি ট্যুর আইফেল নামেই বেশি পরিচিত। সম্পূর্ণ এই টাওয়ারটি নির্মাণ করতে প্রায় ৭,৮০০,০০০ গোল্ড ফ্রাঙ্কস ব্যয় হয়েছিল। গুস্তাভো আইফেল -এর নামানুসারে আইফেল টাওয়ারের নামকরণ করা হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার গুস্তাভো আইফেল ছিলেন রেল সেতুর নকশা প্রণয়নকারী। তিনি তার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের আলোকে আইফেল টাওয়ার নির্মাণ করেছিলেন। বর্তমানে ফ্রান্স ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইফেল টাওয়ারের প্রতিকৃতি নির্মাণ করা হয়েছে। ১৯৯১ সালে আইফেল টাওয়ার ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্বের ঐতিহ্যপূর্ণ শীর্ষ স্থান হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।

আইফেল টাওয়ার পরিদর্শনের সময়

শরৎ ও বসন্তকাল আইফেল টাওয়ার পরিদর্শনের সবচেয়ে সেরা সময়। বিশেষ করে ক্রিসমাসের সময় প্যারিসে সবচেয়ে বেশি পর্যটকদের আনাগোনা থাকে। তখন প্যারিস ভ্রমণে অন্যান্য সময়ের চেয়ে একটু বেশি সুবিধা পাওয়া যায়।

আইফেল টাওয়ারের টিকেট সংক্রান্ত তথ্যাবলী

অনলাইন কিংবা আইফেল টাওয়ার পরিদর্শন স্থলে গিয়ে সরাসরি আইফেল টাওয়ারের টিকেট সংগ্রহ করা যায়। আইফেল টাওয়ার পরিদর্শনকারীর বয়সের উপর ভিত্তি করে টিকেটের মূল্য নির্ধারিত হয়। তবে শূন্য থেকে চার বছরের শিশুদের জন্য আইফেল টাওয়ারে প্রবেশ সম্পূর্ণ ফ্রি। আইফেল টাওয়ারে প্রবেশের জন্য কিছু নির্ধারিত ধার্যমূল্য নিম্নরূপ দেয়া হলো :

১. সিঁড়ির মাধ্যমে প্রবেশ

বয়স 4-11 = € 3.00 (ইউরো)
বয়স 12-24 = € 3.50 (ইউরো)
প্রাপ্তবয়স্ক = € 5.00 (ইউরো)
(বিঃদ্রঃ সিড়ির মাধ্যমে কেবল নিচ তল থেকে দ্বিতীয় তল পর্যন্ত যাওয়া যায়।)

২. লিফটের মাধ্যমে প্রবেশ

নিচ তল থেকে দ্বিতীয় তল পর্যন্ত
বয়স 4-11 = € 4.00 (ইউরো)
বয়স 12-24 = € 7.00 (ইউরো)
প্রাপ্তবয়স্ক = € 8.50 (ইউরো)

নিচ তল থেকে সর্বোচ্চ তল পর্যন্ত
বয়স 4-11 = € 10.00 (ইউরো)
বয়স 12-24 = € 13.00 (ইউরো)
প্রাপ্তবয়স্ক = € 14.50 (ইউরো)

আইফেল টাওয়ার খোলা ও বন্ধের সময়সূচী

সারাবছর নির্দিষ্ট সময়সূচী মেনে আইফেল টাওয়ার পরিদর্শনের সুযোগ রয়েছে। ১৫ জুন থেকে ৩০ অগাস্ট পর্যন্ত সকাল-সন্ধ্যা পরিদর্শনের জন্য খোলা থাকে। আর বছরের অন্যান্য সময় সকাল ১০টা থেকে রাত্রি ১১টা পর্যন্ত টাওয়ারের ভিতরে প্রবেশ করা যায়। এছাড়া পর্যটন মৌসুমে পরিদর্শনের সময় আরো বাড়িয়ে দেয়া হয়।

আইফেল টাওয়ারের অবস্থান ও যাতায়াত ব্যবস্থা

প্যারিসের যেকোন জায়গা থেকে স্থানীয় বিভিন্ন পরিবহনে সহজেই আইফেল টাওয়ার যাওয়া যায়। পর্যটন মৌসুমে জ্যামের কারণে আইফেল টাওয়ার পরিদর্শনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগতে পারে।

লেখক: ট্রাভেলার তানভীর
ছবি: পিক্সাবে

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।