শৈল শহরের রানী নামে পরিচিত দার্জিলিং (Darjeeling) ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এই শহরের আবহাওয়া বছরের বেশিরভাগ সময় ঠাণ্ডা থাকে। দার্জিলিং যেন মেঘের স্বর্গরাজ্য তাই এর অন্য পরিচিতি মেঘ পাহাড়ের দেশ হিসেবে। দার্জিলিং-এর দুনিয়াজোড়া খ্যাতি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, বিখ্যাত চা এবং রেলওয়ের জন্য। ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই দার্জিলিং তাঁর অপূর্ব রুপ এবং উপযোগী জলবায়ুর কারণে অবকাশ যাপনের আদর্শ স্থান হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য নয় দার্জিলিং-এ অবস্থিত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এশিয়ার শিক্ষার্থীদের সমানভাবে আকর্ষণ করে।

দার্জিলিং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দার্জিলিং জেলার একটি শহর। এটি ভূপৃষ্ঠ থেকে ৭,১০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। কাঞ্চনজঙ্ঘার অনুপম সৌন্দর্য এবং টাইগার হিলের সূর্যোদয় দেখার জন্য প্রতিবছর হাজার পর্যটক এখানে ভিড় করেন। কার্শিয়ং, শিলিগুড়ি ও মিরিক হল এই জেলার অপর তিন প্রধান শহর।

দার্জিলিংয়ে কি দেখবেন

দার্জিলিংয়ে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে উচ্চতায় অবস্থিত ‘ঘুম’ রেলওয়ে স্টেশন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০,০০০ ফুট উচ্চতা থেকে সূর্যোদয় দেখার সুযোগ রয়েছে এখানে। পৃথিবীর ঘুম মোনাস্ট্রির অবস্থান এই দার্জিলিংএ। এছাড়াও এখানে আছে বাতাসিয়া লুপ স্মৃতিসৌধ, বিলুপ্ত-প্রায় পাহাড়ি বাঘের আবাস দার্জিলিং চিড়িয়াখানা, হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট, প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী তেনজিং-রক-এর স্মৃতিস্তম্ভ, ১৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কেবল কার ভ্রমণ, হ্যাপি ভ্যালি টি গার্ডেনে ব্ল্যাক টি, শরণার্থী কেন্দ্র তিব্বতিয়ান সেলফ হেলপ্ সেন্টার, ৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত দার্জিলিং গোরখা স্টেডিয়াম, দার্জিলিং মিউজিয়াম, পৃথিবীর বিখ্যাত জাপানিজ টেম্পল, আভা আর্ট গ্যালারি, শতবর্ষের প্রাচীন দিরদাহাম টেম্পল, রক গার্ডেন, গঙ্গামায়া পার্ক, হিমালয় কন্যা কাঞ্চন-জংঘা এবং ভিক্টোরিয়া ফলস্।

দার্জিলিং ভ্রমণের সময়

শীতের শুরু এবং শেষ এই দুই সময় দার্জিলিং ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত অর্থাৎ বসন্ত ও শরৎকাল দার্জিলিং ভ্রমণের সমচেয়ে সুন্দর সময়। দার্জিলিং-এ সাধারণত মার্চ থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত বসন্তকাল থাকে এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত থাকে শরৎকাল। বর্ষা মৌসুমে দার্জিলিং-এ পাহাড় ধস ঘটে শীতের শুরুতে ও শেষে এই ঝুঁকি থাকে না।

দার্জিলিংয়ে বেড়ানোর খরচ

মনে রাখা ভাল ভ্রমণ খরচ সাধারণত ভ্রমণকারীর চাহিদার উপর নির্ভর করে। যদি ট্যুর এজেন্ট ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে ঢাকা থেকে দার্জিলিং ভ্রমণে যান তবে থাকা, খাওয়া, যাতায়াত বাবদ জনপ্রতি ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। বুড়িমারি দিয়ে দার্জিলিং ভ্রমণ করলে কলকাতার রুটের তুলনায় অনেকাংশেই খরচ কম হবে।

দার্জিলিং কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে রাতে শ্যামলীর বাসে যাত্রা করলে ভোরের মধ্যে বুড়িমারি সীমান্তে পৌছে যাবেন। নাস্তা এবং দুই পারের ইমিগ্রেশনের প্রক্রিয়া শেষ চ্যাংড়াবান্দা থেকে বাসে জিপ স্টেশনে চলে আসুন। আর অবশ্যই টাকা বা ডলার সরকার অনুমোদিত ডিলারের কাছে থেকে রুপিতে পরিবর্তন করে নিতে ভুলবেন না। শিলিগুড়ি জিপ স্টেশন থেকে দার্জিলিংগামী টাটা সুমো বা কমান্ডার জিপের টিকিট কেটে সরাসরি দার্জিলিং চলে আসতে পারবেন। চ্যাংড়াবান্দা থেকে শিলিগুড়ি আসতে দেড় ঘন্টা এবং শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলং যেতে আড়াই ঘন্টা সময় লাগে।

আর কলকাতা হতে দার্জিলিং যেতে চাইলে কলকাতার শিয়ালদহ রেল স্টেশন থেকে সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটের দার্জিলিং মেল ট্রেন ছেড়ে যায়। কলকাতা থেকে ট্রেনে দার্জিলিং যেতে চাইলে ট্যুরিস্টদের জন্য নির্ধারিত কাউন্টার ফেয়ারলি প্যালেস থেকে টিকেট সংগ্রহ করুন। কলকাতা থেকে পরদিন সকাল ১০টায় নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে ট্রেন পৌঁছাবে। দার্জিলিং-এ পৌঁছানোর সবচেয়ে কাছের রেলওয়ে স্টেশন হচ্ছে নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশন। এই রেলস্টেশন থেকে দার্জিলিং-এর দূরত্ব 88 কিলোমিটার। সারা ভারত থেকে দার্জিলিংগামী সকল ট্রেনই নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে থামে। জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে রিকশায় শিলিগুড়ি জিপ স্টেশন এসে দার্জিলিংগামী টাটা সুমো বা কমান্ডার জিপের দার্জিলিং পৌঁছাতে পারবেন।

দার্জিলিং কোথায় থাকবেন

দার্জিলিং-এ বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় ঠেকাতে দালাল ছাড়া নিজেই হোটেল ঠিক করার চেষ্টা করুন। রুম বুক করার আগে হোটেলে গরম পানি আর রুম হিটারের ব্যবস্থা আছে কিনা জেনে নিন। এছাড়াও ভ্রমণের জন্য সহায়ক হোটেলের অন্যান্য কোন সেবা (যেমন রেন্ট এ কার) থাকলে সে সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন।

সিজনে সাধারণত অগ্রিম হোটেল বুকিং দিয়ে যাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ। চলুন জেনে নেই কিছু হোটেলের নাম এবং যোগাযোগের নাম্বার।

বাজেট হোটেল:

নিশিকুড়া লজ, লাদেন লা রোড, ফোনঃ ৯১-৩৫৪-২২৫৯১২৪
ডেকেলিং হোটেল, ৫১, গান্ধী রোড, দার্জিলিং – ৭৩৪১০১, ফোন নম্বর: ০৯৬-৭৯-৭৩৪০৪৮

মাঝারি মানের হোটেল:

ওল্ড বেলভিউ হ্যারিটেজ হোটেল, নেহরু রোড, দ্য মল, দার্জিলিং। ফোনঃ+৯১-৩৫৪-২২৫৭০৪৬।
হোটেল সেভেন সেভেনটিন, এইচ.ডি.লামা রোড, দার্জিলিং – ৭৩৪১০১ ফোনঃ +৯১-৩৫৪-২২৫৪৭১৭, ৯১-৩৫৪-২২৫৫০৯৯।

শীর্ষ মানের হোটেল:

উইন্ডামেয়্যার হোটেল, অবজারভেটরি হিল, চৌরাস্তা, দার্জিলিং – ৭৩৪১০১, ফোনঃ +৯১ ৩৫৪ ২২৫৪০৪১, ৯১-৩৫৪-২২৫৪০৪২।
ওয়েবসাইট: http://www.windamerehotel.com
মেফেয়ার দার্জিলিং: গভর্নর হাউসের বিপরীতে, দার্জিলিং – ৭৩৪১০১ ফোনঃ +৯১-৩৫৪-২২৫৬৩৭৬, ৯১-৩৫৪-২২৫৬৪৭৬, ৯১-৩৫৪-২২৫২৪৭৪।
ওয়েবসাইট: http://www.mayfairhotels.com/mayfair-darjeeling

দার্জিলিংয়ে খাবার-দাবার

দার্জিলিংয়ের হোটেলগুলোতে বাঙালি, ইন্ডিয়ান, থাই, ফ্রেঞ্চ সহ অনেক ধরনের খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। চাইলে দার্জিলিং-এর স্থানীয় লোকদের খাবারের স্বাদ নিয়ে দেখতে পারেন। স্থানীয়রা ভাতের সাথে গরুর মাংস এবং মসুর ডাল খেতে খুব পছন্দ করেন। এছাড়াও জনপ্রিয় স্থানীয় খাবারের মধ্যে রয়েছে গানড্রাক (গাঁজানো সরিষা পাতা), মম (মাংস বা সবজি দিয়ে পিঠার মত খাবার), থুপকা (মাংস এবং নুডলস দিয়ে তৈরি ঘন স্যুপ) এবং চ্যাং (স্থানীয় বিয়ার)।

দার্জিলিংয়ে কেনাকাটা

দার্জিলিং শহরের লাডেন-লা রোডে বেশকিছু ছোট-বড় মার্কেট ও দোকান রয়েছে। এইসব মার্কেট থেকে নিশ্চিন্তে প্রয়োজনীয় শীতের পোশাক, হাতমোজা, মাফলার, সোয়েটার, লেদার জ্যাকেট, নেপালি শাল, শাড়ি, লেদার সু, সানগ্লাস এবং প্রিয়জনদের জন্য গিফট আইটেম কিনতে পারেন। এখানে প্রতারনার কোন আশংকা নেই। তবে ভ্রাম্যমাণ দোকান বা ফেরি থেকে কোন কিছু না কেনাই ভাল।

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।