বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু বিল্ডিং বুর্জ খলিফা (Burj Khalifa) সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে অবস্থিত। মরুভূমির উপর নিখুঁত স্থাপত্যে তৈরী এই ভবন দুবাই শহরের গৌরব ও মর্যাদাকে বিশ্ববাসীর কাছে আরও সমুন্নত করছে। সর্বাধিক সংখ্যক অভিজাত হোটেল, শপিং সেন্টার এবং অফিস নিয়ে ২০১০ সালের ৪ জানুয়ারি উদ্বোধন হওয়া বুর্জ খলিফা দুবাই (Dubai) শহরের অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। দুবাই ভ্রমণে এসে যদি কেউ বুর্জ খলিফা না দেখে তাহলে তার দুবাই ভ্রমণ অপূর্ণই থেকে যাবে। তাইতো শুধুমাত্র বুর্জ খলিফা টাওয়ার দেখার জন্য বিভিন্ন দেশের মানুষ দুবাই শহরে পাড়ি জমায়।

কিভাবে ঘুরবেন বুর্জ খলিফা

বিশ্বের অসংখ্য রেকর্ডধারী বুর্জ খলিফার উচ্চতা প্রায় ২,৭১৬.৫ ফুট। এটি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু স্থিতিশীল ভবন যার মধ্যে আছে বিশ্বের সর্বোচ্চ ২০০ টি ফ্লোর, ১৬০ টি আবাসিক ফ্লোর, সর্বোচ্চ সংখ্যক আউটডোর অবজারভেশন ডেক, সবচেয়ে বেশী দূরত্বে চলাচলকারী লিফট, দীর্ঘতম আর্ট গ্যালারিসহ আরও অনেক কিছু। বুর্জ খলিফা ভবনের দেয়ালে ও চারপাশের ইন্টেরিয়রে মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক শিল্পীদের আঁকা প্রায় ১০০০ শিল্পকর্মের দেখতে পাবেন।

বুর্জ খলিফা দেখতে হলে আপনাকে প্রথমে টিকেট কাটতে হবে। টিকেট পাওয়ার পর ভেতরে প্রবেশের জন্য নিঃস্বন্দেহে আপনাকে লাইনে দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে হবে। ইন্টারেক্টিভ স্ক্রীনের মাধ্যমে স্ক্যাই স্ক্যাপারের বিভিন্ন তথ্য জানতে পারবেন। প্রবেশ করার পর টাওয়ারের বেজে হেঁটে সামনে আগানোর সময় বুর্জ খলিফার ইতিহাস, উল্লেখযোগ্য ঘটনা ও মধ্যপ্রাচ্যে এই টাওয়ারের গুরুত্ব সম্পর্কে সংক্ষেপে ব্রিফ করা হয়।

তারপর ট্রাভেলেটের মাধ্যমে ১২৪ তালায় পৌছাতে হবে। খুব দ্রুত চলাচল করা ৬৫ মিটার দীর্ঘ এই লিফট বা ট্রাভেলেটর প্রতি সেকেন্ডে ১০ মিটার উপরে উঠে। ১২৪ তালার অবজারভেশন ডেকে পৌঁছানোর পর বাঁকানো সিঁড়ি দিয়ে ১২৫ তালায় যেতে হয়। যখন লিফট থেকে নেমে অবজারভেশন ডেকে যাবেন তখন ৪৫৬ মিটার উঁচু থেকে আসে পাশের মরুভূমি ও সাগরের সাথে সাথে ৩৬০ ডিগ্রি এঙ্গেলে পুরো দুবাই শহরের চমৎকার ভিউ দেখতে পারবেন।

মূলত এই অবজারভেশন ডেক থেকে দুবাইের মনোমুগ্ধকর স্কাই ও প্যানোরেমিক ভিউ সবচেয়ে সুন্দর ভাবে চোখে ধরা পড়ে। এখানে টেলিস্কোপের সাহায্যে দূরের জিনিস গুলো কাছ থেকে দেখতে পারবেন। এই টেলিস্কোপে দিন ও রাতের দুবাই শহর আলাদা আলাদা ভাবে দেখার সুযোগ আছে। এখানে ঘুরে দেখতে প্রায় এক ঘণ্টার মতো সময় লাগে। আর তাই বুর্জ খলিফার অবজারভেশন ডেকে একটু সময় নিয়ে ঘুরে বেড়াতে ও ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা পেতে সবাই পছন্দ করে।

বুর্জ খলিফার ১২৫ ও ১২৪ তালার অবজারভেশন ডেক “At the Top” হিসেবে পরিচিত। এখানে আলাদা টিকেটের ব্যবস্থা আছে, টিকেট কাটার মাধ্যমে বুর্জ খলিফা নির্মাণের মাল্টিমিডিয়া চিত্র প্রদর্শনী দেখতে পারবেন। এখানে ঘুরে ঘুরে সব দেখতে প্রায় ৯০ মিনিটের মতো সময় লাগবে। এখান থেকে দা দুবাই ফাউন্টেনের শোর আলোর ঝলকানি ও শব্দের মূর্ছনা পর্যটকদের এক অপার্থিব অনুভূতি দিবে।

আবার ১৪৮ তালায় ভূমি থেকে ৫৫৫ মিটার উঁচুতে বিশ্বের সর্বোচ্চ অবজারভেশন ডেক অবস্থিত, যা “At the Top SKY” হিসেবে পরিচিত। পর্যটকদের এখানে ভি আই পি-দের মতো সম্মান দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়। গেস্ট এম্বাসেডরের মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানিয়ে স্বাগত পর্যটকদের লাউঞ্জে সফট ড্রিঙ্কস , কফি ও খেজুর খেতে দেওয়া হয়। এই ডেকের ইন্টারএক্টিভ স্ক্রীন পর্যটকদের জন্য আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ যার হাইটেক সেন্সরের মাধ্যমে বিভিন্ন শহরের ল্যান্ড মার্কসের উপর দিয়ে হোভারিং করে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। এই ট্রিপ ১২৫ তালায় শেষ হয় যেখান থেকে আরেকবার পুরো দুবাই শহরের স্কাই ভিউ দেখার সুযোগ হবে।

এখানে দা রেসিডেন্স নামের লবিতে “ওয়ার্ল্ড ভয়েস” নামের একটি ভাস্কর্য আছে। এই ভাস্কর্যের মাঝে অবস্থিত সিম্বল যন্ত্রের মাধ্যমে উপর থেকে পানি পরার শব্দ অসংখ্য মানুষের কণ্ঠের প্রতিধ্বনির মতো ফিরে আসে। আর বর্তমানে বুর্জ খলিফার পাশে দুইটি নতুন বিলাসবহুল দ্বীপ নির্মাণের কাজ চলছে।

অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: www.burjkhalifa.ae

বুর্জ খলিফা ভ্রমণ গাইড
বুর্জ খলিফার টপ ভিউ

বুর্জ খলিফার কিছু রেকর্ড

  • বুর্জ খলিফার খনন কাজ শুরু হওয়ার মাত্র ১,৩২৫ দিন পরই এটি বিশ্বের সবচেয়ে উচু মানব নির্মিত কাঠামোর রেকর্ড গড়ে ছিল।
  • ৬ বছর ধরে নির্মাণ করা এই ভবনে কাজ চলাকালীন প্রায় ১২,০০ আন্তর্জাতিক শ্রমিক প্রতিদিন কাজ করেছে আর সব মিলিয়ে প্রায় ২২ মিলিয়ন ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে।
  • এই ভবন নির্মাণে ৩৩০,০০০ ঘন মিটার কংক্রিট, ৩৯,০০০ ঘন মিটার ষ্টীল, ১,০৩,০০০ স্কোয়ার মিটার কাঁচ ও ১৫,৫০০ স্কোয়ার মিটার এম্বোসড স্টেইনলেস ষ্টীল কাজে লেগেছে, যা রেকর্ড সংখ্যক।
  • এই ভবনে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক আউট ডোর অবজারভেশন ডেক ও অধিষ্ঠিত পরিপূর্ন ফ্লোরের রেকর্ড আছে।
  • এই বিল্ডিং এর ৭৬ তালায় অবস্থিত সুইমিং পুল ভবনের মধ্যে অবস্থিত বিশ্বের সর্বোচ্চ সুইমিং পুলের রেকর্ড অর্জন করেছে।
  • বুর্জ খলিফায় বিশ্বের দীর্ঘতম লিফট রয়েছে।

কিভাবে যাবেন বুর্জ খলিফা

দুবাই মলের পাশে ডাউন টাউনে বুর্জ খলিফা অবস্থিত। দুবাই মেট্রোতে যাওয়ার ক্ষেত্রে রেড লাইন দিয়ে বুর্জ খলিফা ষ্টেশনে যেতে হবে। এখান থেকে F13 নাম্বার বাসে দুবাই মল (Dubai Mall) বাস স্টপেজে নামতে হবে। আর দুবাই মলের নিচ তালায় বুর্জ খলিফার প্রবেশ পথ।

দুবাইতে কোথায় থাকবেন

বুর্জ খলিফাতে সম্প্রতি আরমানি হোটেল-এর লবি উদ্বোধন করা হয়েছে। তাই ইচ্ছে হলে সেখানে থাকতে পারেন তবে সেক্ষেত্রে একরাত থাকতে হলে জনপ্রতি প্রায় ৩৯,০০০ টাকা গুনতে হবে। এছাড়াও বুর্জ খলিফার কাছে তাজ দুবাই, দুসিত থানি দুবাইয়ের মতো হোটেল গুলোতে ৫,৫০০ থেকে ৬,৫০০ টাকার মধ্যে দুইজন রাত্রিযাপন করতে পারবেন। বুর্জ খলিফা থেকে একটু দূরের হোটেল যেমন- মারিয়ানা হোটেল, স্পোর্ট হোটেল, হলিডে ইন দুবাই, গ্র্যান্ড সিনা ইত্যাদি হোটেল গুলোতে ১,৬০০ থেকে ২,০০০ টাকায় দুইজনের জন্য থাকার রুম পাবেন।

বুর্জ খলিফার টিকেট খরচ এবং সময়সূচী

রবিবার থেকে বুধবার প্রতিদিন সকাল ১০ টা হতে রাত ১০ টা পর্যন্ত এবং বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার সকাল ১০ টা হতে মধ্যরাত পর্যন্ত বুর্জ খলিফা উন্মুক্ত থাকে। আর অবজারভেশন ডেকের “এট দ্যা টপ স্ক্যাই” সকাল ১১ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে ক্লোজিং টাইমের ৪৫ মিনিট আগে এখানে নতুন কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না।

লেভেল ১২৫ ও ১২৪ মিলিয়ে “এট দ্যা টপে” পিক সময়ে (৩.৩০ থেকে ৬ টা পর্যন্ত , মূলত সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত) প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য এন্ট্রি ফি ২১০ দিরহাম (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪৮২৮ টাকা) আর ৪-১২ বছরের বাচ্চাদের জন্য এন্ট্রি ফি ১৭০ দিরহাম (বাংলাদেশি টাকায় ৩৯০৮ টাকা)।

আবার অফ পিক সময়ে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য এন্ট্রি ফি ১৩৫ দিরহাম ও বাচ্চাদের জন্য ১০০ দিরহাম। আর লেভেল ১২৫, ১২৪ ও ১৪৮ মিলিয়ে “এট দা টপ স্কাইে” ট্রাভেলের খরচ জনপ্রতি ৫০০ দিরহাম ও বাচ্চাদের জন্য ৩৭০ দিরহাম। এখানে অডিও গাইডের জন্য বাড়তি ২৫ দিরহাম খরচ করতে হবে।

আরও পড়ুন : দুবাই মল ভ্রমণ গাইড

কোথায় ও কি খাবেন

বুর্জ খলিফার ১২২ তালায় রেস্টুরেন্ট ও বার রয়েছে। “এট মোসফিয়ার” (At.Mosphere) বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য কারণ এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ উচ্চতার রেস্টুরেন্ট। এখানে নাস্তা, দুপুরের খাবারসহ রাতের খাবার ও খেতে পারবেন, আর এখানের অয়ট কুইজিন (ফ্রেঞ্চ খাবার) , স্যান্ডডুইস, স্কোনস (ক্রিম ও ডিম দিয়ে তৈরি ছোট বিস্কিট) বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও আরমানি, দা বুর্জ ক্লাব, সাম মাছ রেস্টুরেন্টে বেশ ভালো খাবার পাওয়া যায়।

কিছু টিপস

  • অনলাইনে বুর্জ খলিফার প্রবেশ টিকেট পাওয়া যায় এবং সেক্ষেত্রে লাইনে দাড়িয়ে অপেক্ষা করার সময় বাচাতে পারবেন।
  • ৩০ দিন আগে থেকেই অনালাইনে অগ্রিম টিকেট বুকিং দিয়ে রাখলে খরচ কিছুটা কম হয়।
  • বুর্জ খলিফাতে কখন যাবেন ও কোন অবজারভেশন ডেকে ঘুরবেন তার উপর নির্ভর করে এখানে এন্ট্রি ফি কম বেশী হয়।
  • অবজারভেশন ডেকের সাথে একটি শপ আছে, ইচ্ছে হলে সেখান থেকে সুভেনিয়র কিনতে পারবেন।
  • সূর্যাস্তের আগে এখানে ছবি তোলার জন্য সবচেয়ে সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়। আর তাই সূর্যাস্তের আগে এখানে পৌঁছালে গোধূলি উপভোগ করার সুযোগ হবে।

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।