উত্তর কাতারের একটি উপকূলীয় শহর আল খোর (Al Khor) যা রাজধানী দোহা থেকে প্রায় ৫৭ কিলো দূরে অবস্থিত। কাতার (Qatar) এর বৃহত্তম শহরগুলোর মধ্যে একটি হল আল খোর। এই শহরের মূল ভিত্তি মূলত একটি ছোট খাঁড়ির উপর। আর আল খোর নামের অর্থ “ছোট খাঁড়ি”, আর এখান থেকেই এই শহরের নামের প্রকৃত সার্থকতা। দোহার কাছেই অল্প সময়ের দূরত্বে অবস্থিত আল খোর শহরে প্রায় সকল পর্যটক ঘুরতে যেতে পছন্দ করে।

আল খোরের দর্শনীয় স্থান

মুক্তোর জন্য বিখ্যাত আল খোরে দেখার মতো রয়েছে অনেক জায়গা। পাহাড়ের চূড়ার মাঝে আকর্ষণীয় রাস্তা, ছোট ছোট জাহাজের বন্দর ও মাছের কেনা-বেচার জন্য বেশ প্রসিদ্ধ এই শহর। রয়েছে বেশ কিছু ওয়াচ টাওয়ার যা নতুন ভাবে সংস্কার করা হয়েছে। আবার একই সাথে রয়েছে ম্যানগ্রোভ বন যেখানে অসংখ্য পাখির দেখা মিলবে।

আল খোর আইল্যান্ড (Al Khor Island) : কাতারের উত্তর-পুর্ব উপকূলে আল খোর শহরের মধ্যে এই দ্বীপ অবস্থিত। শহরের মধ্যে একমাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক জায়গা যেখানে খ্রিষ্টপূর্বের দ্বিতীয় সহস্রাব্দের বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে। এই দ্বীপ পার্পল আইল্যান্ড বা বেগুনি দ্বীপ নামেও বেশ পরিচিত। ম্যানগ্রোভ, ছোট ছোট পাহাড় ও গুহা দিয়ে ঘেরা এই দ্বীপ পর্যটকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। ক্যানেলের পাশ দিয়ে হেঁটে এই দ্বীপের ভিতরে যেতে হয়। অনেকের কাছে কষ্টসাধ্য মনে হলেও এখানে গেলে এক ধরনের এডভেঞ্চারের অভিজ্ঞতা হবে। তবে বর্তমানে পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য ব্রিজের কাজ করা হচ্ছে। এই দ্বীপের চারপাশ দিয়ে হেঁটে বেড়ানোর সাথে সাথে আসে পাশের সুন্দর দৃশ্য ভালো লাগার মতো। বিশেষ করে এখান থেকে সূর্যাস্ত দেখার এক অভূতপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়বে। আবার এখানে মাছ ও কাঁকড়া ধরার ও সুযোগ আছে। আবার বাইরে বার-বি-কিউ করার জন্যও অনেকে এখানে চলে আসে। আর এখানে যাওয়ার জন্য নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাস সবচেয়ে ভালো সময়। তবে ছোট বাচ্চা নিয়ে এখানে না যাওয়াই ভালো।

আল খোর বীচ (Al Khor Beach) : কাতারের মধ্যে বেশ গুছালো একটি বীচ যা কাতার পর্যটন কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রন করে। পুরো বছর জুড়ে এখানের আবহাওয়া বেশ সুন্দর থাকে তাই পর্যটকরা যেকোনো সময় এখানে আসতে পছন্দ করে। এখানে বাচ্চাদের খেলার জন্য সুন্দর জায়গা আছে।

আল খোর পার্ক (Al Khor Park) : আল খোর শহরের মধ্যে জনপ্রিয় একটি পার্ক। এখানে চারপাশে সবুজের সমাহার। একটি ছোট্ট চিড়িয়াখানাও রয়েছে যেখানে উঠ পাখি, ময়ূর, জেব্রা, কচ্ছপ, হরিণ ছাড়াও আরও বেশ কিছু পশু পাখি নজরে পড়বে। আর বাচ্চাদের খেলার জন্য ছাউনি দিয়ে ঢাকা বিশাল মাঠ আছে। অনেকেই পরিবার নিয়ে ছুটির দিনে এখানে পিকনিক করতে চলে আসে। বাচ্চাদের জন্য এখানের প্রবেশ মূল্য না থাকলেও বড়দের জন্য জনপ্রতি ৫ রিয়াল।

আল থাখিরা কোস্ট (Al Thakirah Coast) : সম্প্রতি সংস্কার করা এই দ্বীপ কাতারের অন্যান্য বীচের মধ্যে অন্যতম। আল খোর শহরের উপকূলে অবস্থিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ আল থাখিরা দ্বীপ যা ম্যানগ্রোভ বন ও সমুদ্র সৈকতে ঘেরা। প্রায় ২ কিলো লম্বা এই বীচে সাইকেলিং ও জগিং করতে অনেকেই চলে আসে। একই সাথে বাচ্চাদের খেলার জন্যও রয়েছে বিশাল মাঠ।

আল তাওয়াসুল ট্র্যাডিশনাল পার্ক (Al Tawasul Traditional Park) : আল খোর পার্কের মতোই আরেকটি পার্ক, তবে বেশ ছোট পরিসরে। প্রায় ২৮,৫০০ বর্গমিটার জায়গা জুড়ে গড়ে উঠা এই পার্কে বিনোদনের নানা আয়োজন রয়েছে। আছে বাচ্চাদের খেলার জায়গা, ফুটবল খেলার মাঠ ও এথলেটদের জন্য দৌড়ানোর রাস্তা। এই পার্কের একটি বিশেষ আকর্ষণ হল এখানের পরিবেশ, পুরো পার্ক জুড়ে নানা ধরনের গাছ- গাছালি আর এই কারনে এখানে বিভিন্ন পশু পাখির আবাসস্থল ,ময়ূরসহ দেখা মিলবে নাম না জানা অসংখ্য পাখির। ছোট ছোট বাচ্চাদের জন্য বেশ শিক্ষণীয় একটি জায়গা যেখানে সুন্দর পরিবেশে খেলার সাথে সাথে অনেক ধরনের প্রাণী দেখতে ও ওদের ব্যাপারে জানতে পারবে। একই সাথে এখানে একটি ঐতিহ্যবাহী ঝর্ণা ও রয়েছে। তাই সময় করে এখানে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসলে নিঃসন্দেহে ভালো লাগবে।

আল খোর করনিছে (Al Khor Corniche) : আল খোরের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হল এই জায়গা। সম্প্রতি সংস্কার করা এই জায়গা বর্তমানে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। আল খোর করনিছের স্থাপত্য নজরে পরার মতো। ২২,৫০০ স্কোয়ার মিটার বিস্তৃত গ্রানাইট দিয়ে নির্মাণ করা এই করনিছের ডিজাইন, আকৃতি ও রঙ অন্যান্য স্থাপত্য থেকে বেশ আলাদা। বাচ্চাদের খেলার জন্য একটি সুন্দর জায়গা সংস্কার করার পাশাপাশি এখানে আরও নতুন তিনটি ভবনের কাজ চলছে। পর্যটন স্থান হিসেবে যদিও নতুন ও এখনো অনেক কাজ চলছে তারপর ও এখানে ঘুরে আসলে ভালো লাগবে যে কারো।  

এছাড়াও যেতে পারেন আল খোর হিল পার্ক (Al Khor Hill Park) ও আল খোর মিউজিয়াম (Al Khor Museum) এর মতো জায়গায়।

কিভাবে যাবেন আল খোর

কাতারের দোহা থেকে আল খোরের দূরত্ব মাত্র ৫৭.৩ কিলো আর কিছুদিন আগেও সময় লাগতো ৫০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা। তবে সম্প্রতি ৫ লেনের রাস্তার উদ্বোধন হবার কারনে মাত্র ২০ মিনিটে দোহা থেকে আল খোরে যাওয়া যায়। তাই বাংলাদেশ থেকে বিমানে কাতরের দোহাতে পৌঁছে খুব কম সময়ে চলে যেতে পারবেন আল খোর শহরে। সেই ক্ষেত্রে যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে বাস, কার বা ট্যাক্সি ভাড়া করে যেতে পারেন।

কোথায় থাকবেন

কাতারের আল খোরে থাকার জন্য রয়েছে বেশ কিছু হোটেল, গেস্ট হাউজ ও রিসোর্ট। তবে একটা কথা আগেই বলে রাখা ভালো এখানে থাকার খরচ অন্যান্য দেশের হিসেবে অনেক বেশী। আবার এখানে বেশ কিছু এপার্টমেন্ট ও ভাড়া দেওয়া হয় পর্যটকদের জন্য। যেমন- খৌর বে রেসিডেন্সি, চ্যালেঞ্জ এপার্টমেন্টস, আল সুলতান বীচ রিসোর্টতে ৮,৫০০- ১০,০০০ টাকার মধ্যে দুই জনের জন্য থাকার রুম পেয়ে যাবেন।

ভ্রমণ খরচ

আল খোরে থাকা খাওয়া কাতারের অন্যান্য শহরের চেয়ে একটু বেশী। তাই এখানে খরচ ও বেশী হবে। যদিও টুরিস্ট স্পট গুলো ঘুরতে খুব বেশী খরচ হবে না তবে হোটেলে থাকতে ও বাংলাদেশ থেকে বিমানে যাতায়াতে বেশ খরচ হয়ে যায়। বিমানে বাংলাদেশ থেকে দোহাতে যাতায়াত খরচ সহ দোহা থেকে আল খোরে যেতে প্রায় ৪৭,০০০- ৫২,০০০ টাকা খরচ হবে। আর আল খোরে থাকা খাওয়া সহ ৪ দিন ৩ রাত থাকতে সব মিলিয়ে জন প্রতি প্রায় ১,২০,০০০-১,৫০,০০০ টাকা খরচ হবে।

কোথায় ও কি খাবেন

আল খোর শহরে খাবারের বেশ ভিন্নতা চোখে পড়বে। এখানে যেমন কাতারের স্থানীয় খাবার পাওয়া যায় তেমনি ইন্ডিয়ান খাবার ও পাওয়া যায়। যেমন-বার্ড অফ প্যারাডাইস, পার্ল অফ বেইরুট রেস্টুরেন্ট, চিলিস, তুর্কিয়ে কাবাব, শাওকাহ আফান্দি রেস্টুরেন্ট, নাইস ডে রেস্টুরেন্ট, সাঙ্গাই গার্ডেন, টেস্টি কিং রেস্টুরেন্ট, দা গার্ডেন রেস্টুরেন্টে বেশ ভালো মানের স্থানীয় খাবার খেতে পারবেন আবার রয়্যাল তান্দুর, পানর রেস্টুরেন্ট, সারাভানা ভবন, বে ক্লাব ক্যাফেটেরিয়ার মতো রেস্টুরেন্টে ইন্ডিয়ান খাবার ভালো পাওয়া যায়। আর টুরিস্ট স্পট গুলোর মধ্যে আল খোর পার্কের ভিতরে বেশ কিছু ভালো মানের রেস্টুরেন্ট রয়েছে। পার্কে ঘোরার সাথে সাথে এখানে খেতে অনেকেই পছন্দ করে। আবার এখানে পিজা হাট , ম্যাক ডোনাল্ড ও কে এফ সি এর মতো চেইন শপ ও খুঁজে পাবেন। আর আল খোরের বিশেষ খাবারের মধ্যে মাছবোস (বিভিন্ন মশলা দেওয়া রাইস সাথে মাংস ও সী ফুড থাকে, এটা মূলত কাতারের প্রধান খাবার), হারেস (গম, মাংস ও বাটার দিয়ে বানানো ঝাল খাবার), থারেড (এক ধরনের স্টু), বালালেট (সুজি, দারচিনি, স্যাফ্রন দিয়ে বানানো এক ধরনের মিষ্টি ও নোনতা খাবারের সাথে ডিমের অমলেট), মারগং (বিভিন্ন সবজি ও মাংস দিয়ে তৈরি ঝাল খাবার), লাকাইমাট (এক ধরনের মিষ্টি খাবার), গুযি (আস্ত খাসির রোস্ট) এর মতো খাবার গুলো টেস্ট করে দেখতে পারেন। একটু ভিন্ন স্বাদ হলেও খেতে ভালো লাগবে। 

কোথায় ও কি কিনবেন

আল খোর মলে ও তার আসে পাশে অসংখ্য মার্কেট আছে যেমন- আনসার গ্যালারি, বুনো চকলেটস এন্ড ফ্লাওয়ার, স্টারবাকস ও রেড ট্যাগের মতো দোকান গুলো থেকে কাতারের স্থানীয় অনেক জিনিস কিনতে পারবেন। এই মলে দুবাইয়ের বিখ্যাত মালাবার গোল্ড এন্ড ডায়মন্ডসের দোকানও আছে তাই ইচ্ছে হলে গোল্ড ও ডায়মন্ডের গহনাও কিনতে পারেন। 

কিছু টিপস

  • আল খোর আইল্যান্ডে যাওয়ার জন্য সকালের ৪-৬ টা বা বিকালের ৪-৬ টা সময় সবচেয়ে ভালো। আর এই দ্বীপের আসে পাশে ওভাবে ভালো কোনও রেস্টুরেন্ট নেই তাই সাথে খাবার নিয়ে যাওয়া ভালো। আর জোয়ারের সময় অবশ্যই সাবধানে থাকতে হবে।
  • বীচের যাওয়ার ক্ষেত্রে জিনস ও টপস পড়লে সবচেয়ে ভালো আর এখানের বীচগুলো প্রায়ই কাদা কাদা হয়ে থাকে তাই ভালো ভাবে হাঁটার জন্য অবশ্যই ভালো মানের স্লিপার সাথে নিবেন।
  • কাঁকড়া সহ আরও অনেক ধরনের ছোট ছোট পোকা মাকড় থাকে বীচের বালিতে তাই বীচে খালি পায়ে হাঁটবেন না।
  • এখানে সবাই আরবি ভাষায় কথা বলে তাই কিছু আরবি জানা থাকলে ভালো।

ফিচার ইমেজ : iloveqatar.net

শেয়ার করুন সবার সাথে

ভ্রমণ গাইড টিম সব সময় চেষ্টা করছে আপনাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করতে। যদি কোন তথ্যগত ভুল কিংবা স্থান সম্পর্কে আপনার কোন পরামর্শ থাকে মন্তব্যের ঘরে জানান অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ পাতায় যোগাযোগ করুন।
দৃষ্টি আকর্ষণ : যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।
সতর্কতাঃ হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় তাই ভ্রমণ গাইডে প্রকাশিত তথ্য বর্তমানের সাথে মিল না থাকতে পারে। তাই অনুগ্রহ করে আপনি কোথায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বর্তমান ভাড়া ও খরচের তথ্য জেনে পরিকল্পনা করবেন। এছাড়া আপনাদের সুবিধার জন্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হোটেল, রিসোর্ট, যানবাহন ও নানা রকম যোগাযোগ এর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়। এসব নাম্বারে কোনরূপ আর্থিক লেনদেনের আগে যাচাই করার অনুরোধ করা হলো। কোন আর্থিক ক্ষতি বা কোন প্রকার সমস্যা হলে তার জন্যে ভ্রমণ গাইড দায়ী থাকবে না।